সদরঘাটে নদী পারাপারে বছরে ৩০ জনের মৃত্যু

আলোকিত সকাল ডেস্ক

‘নৌকার ধাক্কা লাগে শিপের লগে, লঞ্চের লগে। নদীতে নৌকা চললে একসিডিন (দুর্ঘটনা) অইবো। এইড বেশি অইতাছে সদরঘাটের দিকে। মানুষও মরতাছে। ওইহানে কামাই বেশি, রিস্কও বেশি। আমরা দিনে কামাই ৩শ’ টাকা, ওরা কামায় হাজার-বারোশো টাকা।’

এ কথাগুলো বলছিল সদরঘাটের খেয়া ঘাটে নৌকা পারাপারের কিশোর মাঝি সোহেল। একবার ঘাটওয়ালা সরকারি লোকেরা নৌকা চলাচল বন্ধ কইরা দিছিলো। নৌকার সকল মাঝি ও মিনতিরা মিছিল কইরা ঘাট বন্ধ কইরা দিলে আবার ঘাটে নৌকা চলাচল শুরু হয়।

জানা গেছে, পুরনো ঢাকার প্রধান নদীবন্দর সদরঘাটের খেয়াঘাটে নৌকা পারাপারের ক্ষেত্রে নৌযান দুর্ঘটনায় প্রতি বছর ৩০ জনেরও বেশি লোকের অকাল মৃত্যু ঘটছে। এ পারাপার ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বৃহত্তর কেরানীগঞ্জের সিংহভাগ বাসিন্দারাই এ বিষয়টি উপেক্ষা করে চলেছে। এ বিষয়ে সরকার দলীয় নেতা কর্মীদের প্রভাবে বিআইডব্লিউটিএর প্রশাসন তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে পারছে না। অথচ লঞ্চের ধাক্কায় প্রায়ই ঘটছে নৌকাডুবি, হচ্ছে প্রাণহানি।

সদরঘাট দিয়ে ঢাকা ছাড়েন এবং ঢাকায় আসেন দক্ষিণবঙ্গের মানুষদের একটি বড় অংশ। আশপাশে কেবল নৌকা চলাচলের জন্য রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক ঘাট। এসব ঘাট থেকে নৌকার মাধ্যমে নদী পারাপার হচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষ। এরমধ্যে নৌ বন্দরের বুক চিড়ে যেসব নৌকা অপর পারে যায়, ঝুঁকিতে বেশি তারাই।

জানা গেছে, গত মে মাসে বুড়িগঙ্গায় নৌকাডুবিতে একই পরিবারের ৫ সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিখোঁজ ছিলেন অপর একজন। শরীয়তপুরের তারাবুনিয়ার জামসেদার পরিবারের সদস্যরা যাচ্ছিলেন চাচাতো বোনের বিয়ের উৎসবে। ছোট বোন খাদিজার বিয়ের উৎসবে আর যোগ দেয়ার সুযোগ হয়নি জামসেদার। বুড়িগঙ্গায় নৌকা ডুবির ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি। শুধু জামসেদাই নয়, একই পরিণতির শিকার হতে হয়েছে স্বামী দেলোয়ার, ছেলে জোনায়েদ, ভাইয়ের বৌ রাশিদা ও তার দুই শিশু সন্তান মীম ও মাহিকেও।

মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা মুহূর্তেই উৎসবমুখর বাড়িকে শোকের বাড়িতে পরিণত করেছিল। স্থগিত হয়েছিল বিয়ের অনুষ্ঠান। দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের শনাক্ত করে শাস্তির দাবি জানিয়েছে শোকাহত এ পরিবার। এ দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যান জামসেদার ভাই শাহজালাল। তবে লঞ্চের প্রপেলারে কাটা পড়ে তার দুটি পা। বর্তমানে ঢাকার অর্থোপেডিক হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

অপরদিকে গত বৃহস্পতিবারেও লঞ্চের ঢেউয়ের ধাক্কায় আরেকটি নৌকা ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণ হারায় দুটি শিশু। স্থানীয়রা বলছেন, এমন দুর্ঘটনা বিরল নয়, হরহামেশাই ঘটছে।

কেরানীগঞ্জের কালিগঞ্জের বাসিন্দা শাহজাহান জানান, পুরনো ঢাকার সদরঘাট থেকে ওয়াইজ ঘাট। প্রতিদিন এই পয়েন্টে যাতায়াত করে কয়েক হাজার মানুষ। যাত্রীবাহী বড় বড় লঞ্চ ও পণ্যবাহী নৌযানকে পাশ কাটিয়ে তাদের পার হতে হয় খেয়া নৌকায়।
নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রতিনিয়ত খেয়া নৌকা নিয়ে মাঝ নদীর লঞ্চে ওঠের যাত্রীরা। প্রায়ই এ সময় দুর্ঘটনা ঘটে।

নৌ-পুলিশ বলছে, মাত্র ১৫ জন সদস্য দিয়ে নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না। এই খেয়াঘাটটি প্রতি বছর ইজারা দেয় বিআইডব্লিউটিএ। অথচ খেয়া নৌকা নিয়ন্ত্রণে তাদেরও কোনো উদ্যোগ নেই ।

বুড়িগঙ্গা নদীর কুড়া ঘাট, নলগলা মসজিদ ঘাট, রাজার ঘাট, ইমানঞ্জ ঘাট, পান ঘাট, ছোট কাটারা ঘাট, চাম্পা তলি ঘাট, মাছ ঘাট, সোয়ারি ঘাট, বালু ঘাটসহ প্রায় সকল ঘাটেই অবাধে নৌকা চলাচল দেখা গেছে।

নদীতে নৌকা চালানো মাঝিদের মতে, সদরঘাটের মূল অংশের বাহিরে নৌকা চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ নয়। জাকির হোসেন নামের একজন মাঝি জানান, তিনি ৭ বছর ধরে এখানে নৌকা চালান। কখনও দুর্ঘটনার শিকার হননি।

তবে কামরাঙ্গীরচর কুড়াঘাট এলাকার বাসিন্দা নুর হোসেন জানান, নদীতে নৌকা পারাপার ঝুঁকিমুক্ত এ তথ্য ভুল। প্রতিদিনই এখানে ছোট বড় দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে

তিনি বলেন, নৌকায় ইচ্ছামতো যাত্রী উঠায়, ডুইবা যায়। সিপে ধাক্কা দেয়, টলারের ঢেউ লাইগা নৌকা থিকা পইড়া যায়। এগুলা তো প্রতিদিনই দেখি। কে কয় একসিডেন্ট নাই?

অর্থ বাঁচাতে এ অঞ্চলের মানুষ নিয়মিত জিবনের ঝুঁকি নিচ্ছে বলে মনে করেন জবির শিক্ষার্থী ইমন। তিনি বলেন, এদিকে অনেক অল্প আয়ের মানুষ আছে। গাড়িতে গেলে খরচ বেশি, তাই তারা নৌকায়, ট্রলারে যায়।

এ বিষয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর সদরঘাট অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌ পুলিশের সার্বক্ষণিক নজরদারি আছে বলে জানান, সদরঘাট নৌ পুলিশের উপ পরিদর্শক (এসআই) রেজাউল করিম।

তিনি বলেন, নদীতে নিরাপত্তার পাশাপাশি নদীর ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণেও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। নৌকা চলাচল নিরাপদ করতেও আমরা চেষ্টা করছি। ওয়াইজ ঘাটটি নৌকার জন্য অনিরাপদ হওয়ায় এর আগে আমরা সেটি বন্ধের চেষ্টা করেছিলাম। তখন ঘাট শ্রমিক, গার্মেন্টসের লোকজন দিয়ে এসে আন্দোলন শুরু করেছিল। এই ঘাটটি বন্ধ করতে পারলে সদরঘাট এলাকায় দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে বলেন নৌ পুলিশের এই কর্মকর্তা।

আস/এসআইসু

Facebook Comments