সঞ্চয়পত্র কেনায় বিভ্রান্তি কাটেনি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

এখন থেকে সঞ্চয়পত্র কিনতে ও মুনাফা তুলতে জাতীয় পরিচয়পত্র, ট্যাক্স আইডেনটিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন) ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। যা গত অর্থবছরে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এটি গত ১লা জুলাই থেকে কার্যকর করা হয়েছে। তবে কত টাকা পর্যন্ত টিআইএন লাগবে না, তা নিয়ে এখনো বিভ্রান্তিতে আছেন গ্রাহকরা। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ভবনে সঞ্চয়পত্র কিনতে আসা গ্রাহকরা এই বিভ্রান্তির কথা জানান। অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক গ্রাহকদের সচেতনা সৃষ্টির জন্য ভবনের নিচেই বেশ কয়েকটি ব্যানার টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে লেখা নগদে মাত্র ১ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য টিআইএন লাগবে না। ১ লাখ টাকার বেশি হলে টিআইএন লাগবে।

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সঞ্চয় অধিদপ্তর প্রজ্ঞাপন জারি করে বলেছে, অনলাইন পদ্ধতির বাইরে আর সঞ্চয়পত্রের লেনদেন করা যাবে না। আসল ও মুনাফা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে চলে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে একটি কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। সে কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা হচ্ছে, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, এখন থেকে সঞ্চয়পত্র কেনা ও মুনাফা নেয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র, টিআইএন ও একটি ব্যাংক হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে নগদে মাত্র ১ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনা না। এর জন্য টিআইএন লাগবে না।

যাত্রাবাড়ী থেকে আসা আরজিনা বানু বলেন, কত টাকা পর্যন্ত টিআইএন লাগবে না তা নিয়ে অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তির মাঝে ছিলাম। এখানে এসে বিষয়টি স্পষ্ট হলাম। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সম্প্রতি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে উৎসে কর কমানো হয়েছে। এটি অন্যায্য করা হয়েছে। তাদের জন্য করা হলে আমারা কি দোষ করলাম? তার মতে, সরকারের কাছে সবার জন্য সমান সুবিধা দেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।

এদিকে সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিরূপ সমালোচনা এবং ক্ষুদ্র আয়ের মানুষের উদ্বেগ উপেক্ষা করে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশের প্রস্তাব বহাল রেখেই গত ২৯শে জুন অর্থবিল, ২০১৯ পাস হয়। ইতিমধ্যে উৎসে কর ১০ শতাংশ হার কাটাও শুরু হয়েছে। উৎসে কর বাড়ানোর ফলে এ খাত থেকে বছরে সরকারের ৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় হবে বলে আশা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রশ্ন ওঠে, এতদিন ৫ শতাংশ উৎসে কর দিয়ে যারা মুনাফা পাচ্ছিলেন; কিন্তু মুনাফা তোলেননি, তাদের কত শতাংশ কর দিতে হবে? সরকারের পক্ষ থেকে এখনো তা স্পষ্ট করা হয়নি। তাই বিভ্রান্তিও কাটেনি।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, অস্পষ্ট প্রজ্ঞাপনগুলোর কারণে গ্রাহকরা বিভ্রান্তিতে পড়ে। অথচ দু’টি লাইন বাড়িয়ে লিখলেই স্পষ্ট প্রজ্ঞাপন জারি করা সম্ভব।

অন্যদিকে বাজেট পাসের পর জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ ব্যাংক প্রজ্ঞাপন জারি করে জানায়, নতুন-পুরনো সব সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর বহাল। অর্থাৎ নতুন-পুরনো সবার জন্যই ১লা জুলাই থেকে ১০ শতাংশ উৎসে কর চালু করা হলো। যারা মুনাফার টাকা তোলেননি তাদের ক্ষেত্রে কী নিয়ম হবে। এমন প্রশ্নে অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, সবার জন্যই ১০ শতাংশ উৎসে কর দিতে হবে। এটিকে অনেকেই অন্যায্য বলে উল্লেখ্য করেছেন। কারণ ৩০শে জুনের মধ্যে টাকা তুলতে আসতে পারেননি, শুধু এ কারণে তিনি টাকা কম পাবেন, সরকারের এই আচরণ অযৌক্তিক মনে করেন অনেক গ্রাহক।

এনবিআর সূত্র বলছে, এতদিন এ খাত থেকে আয় হতো ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সেটা এখন বেড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। তবে যদি সঞ্চয়পত্র বিক্রি কম বা বেশি হয়, তাহলে এ খাতে সরকারের সুদ পরিশোধের পরিমাণ বেশি বা কম হতে পারে। তখন এ খাতে সরকারের আয়ও কম বা বেশি হতে পারে। আসল হিসাব অর্থবছরের শেষে পাওয়া যাবে।
এদিকে গেল অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ২৬ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। গত কয়েকটি অর্থবছরের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। মূলত রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে থাকায় বিপুল অঙ্কের ঋণ নেয়ার দরকার হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মূল বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে সমপ্রতি অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মচারীদের পেনশনের সঞ্চয়পত্রে কিছুটা কর ছাড় দিয়েছে সরকার। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য এবং মৃত চাকরিজীবীর পারিবারিক পেনশন সুবিধাভোগী স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানেরাই এ সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন। চলতি মাসে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংক আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করে বলেছে, পেনশনার সঞ্চয়পত্রে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ থাকলে উৎসে কর দিতে হবে না। বিনিয়োগ ৫ লাখ টাকার বেশি থাকলেই উৎসে কর ১০ শতাংশ। এখানেও পুরো ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়নি।

সঞ্চয় অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, পেনশনার সঞ্চয়পত্রে ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ হলেই কর দিতে হবে ১০ শতাংশ হারেই। আর ৫ লাখ টাকার কম হলে কোনো উৎসে কর দিতে হবে না।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ বছরে সরকারকে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের সুদ দিতে হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, যে সুদের বড় অংশেরই সুবিধাভোগী অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা। এমনকি বেশ কয়েকজন সাংসদ যে সঞ্চয়পত্রে বিপুল অর্থ খাটিয়েছেন, এ তথ্য গত সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামাতেই রয়েছে। অথচ জনগণকে সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করা, স্বল্প আয়ের মানুষ, সামরিক ও বেসামরিক অবসরভোগী, নারী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, প্রবাসী বাংলাদেশি ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় আনাই হচ্ছে সঞ্চয়পত্র চালুর উদ্দেশ্য।

আস/এসআইসু

Facebook Comments