সংস্কার ইস্যুতে সরব হবেন শরিকরা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

মতের অমিল, শরিক হিসেবে সঠিক মূল্যায়ন না পাওয়া ও রাজনীতির মাঠে নিষ্ক্রিয়তার কারণে ধীরে ধীরে ক্ষয় হচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। একে একে ছেড়ে যাচ্ছে জোটের শরিকরা। সর্বশেষ গত সপ্তাহে দীর্ঘদিনের শরিক বিজেপিও বিএনপি নেতৃত্বাধীন এ জোট থেকে বের হয়ে যায়। আর নামসর্বস্ব হলেও অনিবন্ধনহীন লেবার পার্টিও আরও কয়েকটি নামকাওয়াস্তে রাজনৈতিক দল নিয়ে জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে বিএনপিকে। এসব বিবেচনায় সোমবার (১৩ মে) বিকালে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে জোটের বৈঠক ডেকেছে বিএনপি। আজকের বৈঠক জোটের অন্যান্য বৈঠকের চেয়ে কিছুটা গুরুত্ববহ হবে বলে জোট সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, ভাঙনের কারণে ২০ দলীয় জোট এখন নাম সর্বস্ব জোটে পরিণত হয়েছে। আর সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিধি ঠিক রাখতে বিএনপিও নামসর্বস্ব ও রাজনীতির ‘টোকাই’দের দিয়ে জোটের পরিসর ঠিক রেখে চলেছে। কেউ বা কোনো দল জোট ছেড়ে চলে গেলেই তার রিপ্লেস হিসেবে ওই দলের বা অন্য দলের মাঠপর্যায়ের কর্মী দিয়ে একই নামে নতুন দল তৈরি করে ২০ দলকে ২০ দল হিসেবে টিকিয়ে রাখে বিএনপি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন এ জোটে অর্ধেকেরও বেশি দলে কোনো কোনোটিতে হয় শুধু চেয়ারম্যান আছে যার কোনো মহাসচিব বা সাধারণ সম্পাদক নেই। আবার কোনোটিতে শুধু মহাসচিব আছে, যার চেয়ারম্যান নেই। অন্যান্য পদে নেতা বা মাঠপর্যায়ে কর্মীর তো বালাই নেই। বিএনপি নেতৃত্বাধীন এ জোটটিকে ২০ দলীয় জোট বলা হলেও প্রকৃত পক্ষে এ জোটে বিভিন্ন ভগ্নাংশসহ মোট দলের সংখ্যা এখন ২৪টি।

জোট সূত্র জানায়, সোমবারের বৈঠকে নামসর্বস্ব ও নিবন্ধনহীন তথাকথিত রাজনৈতিক দলগুলোকে বাদ দিয়ে নতুন নামে ও নতুন আঙ্গিকে জোটের পুনর্গঠনের পক্ষে সোচ্চার হবে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে তারা বিএনপিকে চাপ প্রয়োগ করবে।

শুরুতে বিএনপি জোটের নাম ছিল চারদলীয় জোট। পরে তা সম্প্রসারিত হয়ে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল ১৮ দলীয় জোটে পরিণত হয়। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, লিবারেল ডেমোক্রেটি পার্টি (এলডিপি), ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), খেলাফত মজলিস, দুটি আলাদা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ মুসলীম লীগ, ইসলামিক পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, পিপলস পার্টি (পিএল), ডেমোক্রেটিক লীগ (ডিএল) ও ন্যাপ ভাসানী— এই ১৮টি দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৪ সালে একতরফা দশম জাতীয় নির্বাচনের পর ১৮ দলীয় জোটে জাতীয় পার্টির ভগ্নাংশ (কাজী জাফর) এবং বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল নামে এক ব্যক্তির একদল যোগ দিয়ে তা ২০ দলীয় জোটে পরিণত হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদার বাংলাদেশ জাতীয় দল, পিপলস পার্টি অব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ মাইনরিটি পার্টিও এ জোটে যোগ দেয়। ২০ দল হয় ২৪ দল। কিন্তু পরিচিতি তাদের ২০ দল হিসেবেই।

গত ৬ মে ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর এই মুহূর্তে ২০ দলীয় জোটে শরিক দলের সংখ্যা ২৩। এই ২৩টি দলের মধ্যে ১৩টি দলের নিবন্ধন নেই। ৯টি দলের মূল অংশ জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর জোটের সংখ্যাতাত্ত্বিক নাম ঠিক রাখার জন্য দলগুলোর ভগ্নাংশ দিয়ে বিকল্প দল গঠন করে রেখেছে বিএনপি। আর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০ দলীয় জোটে যোগ দেয়া তিনটি দল শুধুই নামসর্বস্ব— এমনটিই অভিযোগ বিএনপি জোটের পুরনো শরিকদের!

জোট শরিকদের ভাষ্যমতে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করায় ওই বছর আগস্ট মাসে জোট থেকে বেরিয়ে যান ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান প্রয়াত শেখ শওকত হোসেন নীলু, ন্যাপ ভাসানীর চেয়ারম্যান প্রয়াত শেখ আনোয়ারুল হক, মুসলীম লীগের মহাসচিব আতিকুল ইসলাম, ইসলামিক পার্টির মহাসচিব আব্দুর রশীদ প্রধান এবং এনডিপির মহাসচিব আলমগীর মজুমদার।

ওই সময় এনপিপির মহাসচিব ফরিদুজ্জামান ফরহাদকে দিয়ে এনপিপি, গাইবান্ধা জেলা কল্যাণ পার্টির সহ-সভাপতি অ্যাড. আজহারুল ইসলামকে দিয়ে ন্যাপ ভাসানী গঠন করে জোটে দলের সংখ্যা, তথা জোটের সংখ্যাতাত্ত্বিক নাম ঠিক রাখে বিএনপি। আর এনডিপি, মুসলীম লীগ ও ইসলামিক পার্টির মহাসচিব/সাধারণ সম্পাদকের পদে নতুন লোক বসানো হয়।

২০১৬ সালের ৭ জানুয়ারি বিএনপি জোটের তৃতীয় বৃহৎ শক্তি ইসলামী ঐক্যজোট জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে ২০ দল ছাড়ার ঘোষণা দেয়। দলটির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ নেজামী, মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ, নায়েবে আমীর মাওলানা হাসানাত আমিনীসহ শীর্ষ নেতাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ২০ দল ত্যাগ করে ইসলামী ঐক্যজোট।
ওই দিনই নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি অ্যাড. মাওলানা আব্দুর রকিবকে সভাপতি ও মাওলানা আব্দুল করীমকে মহাসচিব করে বিকল্প ইসলামী ঐক্যজোট গঠন করা হয়। রাতে গুলশান কার্যালয়ে এই নতুন দলকে স্বাগত জানানোর সময় জোটের অন্যতম প্রধান শরিক জাগপার প্রয়াত সভাপতি শফিউল আলম প্রধান জোটনেত্রী খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেন, ‘নেত্রী, ম্যানুফেকচারড দল কারও জন্য শুভ হবে না।’

গত বছর ১৬ অক্টোবর বিএনপি জোট থেকে বেরিয়ে যায় জেবেল রহমান গানির নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাপ এবং খন্দকার গোলাম মোর্ত্তোজার নেতৃত্বাধীন এনডিপি। সদলবলে বেরিয়ে যাওয়া এই দুই নেতা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন মহাজোটে যোগ দেন। তাদের শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য ঢাকা মহানগর ন্যাপের সম্পাদকীয় পদের শাওন সাদেকীকে দিয়ে ‘বিকল্প’ বাংলাদেশ ন্যাপ গঠন করা হয়। একইসঙ্গে এনডিপির সহসভাপতি ক্বারী আবু তাহেরকে দিয়ে ‘বিকল্প’ এনডিপি গঠন করে বিএনপি— এমনটিই অভিযোগ জোট শরিকদের।

এ ছাড়া বিএনপি জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকিদাতা বর্তমানে দুই ভাগে বিভক্ত বাংলাদেশ লেবার পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) থেকে মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন। মুসলিম লীগের মহাসচিব শেখ জুলফিকার বুলবুলের স্বাক্ষরে মুসলিম লীগ থেকে মনোনয়ন নেন ইরান। সেই মনোনয়ন ফরম নিয়ে তিনি সেদিন দুপুরের আগে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আপনারা (বিএনপি) নমিনেশন না দিলেও আমি মুসলিম লীগ থেকে নমিনেশন নিয়েছি। নির্বাচন আমি করবোই এবং আগামীকাল সাংবাদিক সম্মেলন করে আরও কয়েকটি দলকে সঙ্গে নিয়ে জোট থেকে বেরিয়ে যাব। এরপরই বিএনপি মহাসচিব তাকে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রেখে গভীর রাতে তাকে ধানের শীষের মনোনয়ন দেন। লেবার পার্টির অপর অংশের চেয়ারম্যান হামদুল্লাহ আল মেহেদী নির্বাচনের আগে সাবেক বিএনপি নেতা বি চৌধুরীর নতুন জোট যুক্তফ্রন্টে যোগ দেন।

অন্যদিকে মনোনয়ন না পেয়ে ডেমোক্রেটিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সাঈফুদ্দিন আহমেদ মণি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ তোলেন। শুধু তাই নয়, জোটের শরিক দল হওয়া সত্ত্বেও আরেকটি দলের প্রতীক ও ব্যানার নিয়ে নির্বাচন করেন তিনি।

এদিকে, আন্দালিব রহমান পার্থ জোট ছাড়ার পরপরই বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বিএনপিকে আলটিমেটাম দেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে ছেড়ে না এলে বাংলাদেশ লেবার পার্টি নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জোটের সংখ্যাতাত্ত্বিক নাম ঠিক রাখার জন্য জোট ত্যাগ করা শরিক দলগুলোর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী দিয়ে নতুন দল গঠন, আরেক দলের তৃণমূল নেতাকে দিয়ে বিকল্প দল তৈরি, জোটের সঙ্গে থেকে জোটবিরোধী অবস্থানের পরও কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নেয়া, নামসর্বস্ব শরিক দলের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, জোটের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ বিএনপি জোটের অপেক্ষাকৃত পুরনো ও বড় দলগুলো। তাই তারা জোটের পুনর্গঠন দাবি করবেন আজকের বৈঠকে।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘২০ দলীয় জোটে এমন কিছু শরিক দল আছে, যারা শুধু নামসর্বস্ব দল। অনেকের চেয়ারম্যান থাকলে মহাসচিব নেই, আবার মহাসচিব থাকলে চেয়ারম্যান নেই- এমন দলও আমাদের এ জোটে আছে। আমরা চাই এসব নামসর্বস্বদের বাদ দিয়ে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী দলের সমন্বয়ে জোট পুনর্গঠন হোক। যারা প্রত্যেকেই মর্যাদার সঙ্গে জোটে অবস্থান করবে।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের সভাপতি সৈয়দ এহসানুল হুদা দৈনিক জাগরণকে বলেন, জোট নিয়ে অনেকেই অনেক ধরনের কথা বলেন। যাদের নিবন্ধন আছে তারা মনে করেন তাদের দল খুব বড় ও শক্তিশালী। কিন্তু আমাদের এ জোটের সর্বশেষ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে প্রতিটি দল মানববন্ধন করবে। আজ পর্যন্ত একটি দলও এ কর্মসূচি পালন করেনি। শুধুমাত্র আমার দল ছাড়া। তাই জোটের অভিভাবক বিএনপিকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা জোটকে কতটা কার্যকরী ও সমন্বয় করবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box