সংসার করতে দিচ্ছিলো না আইন, উপায় দেখালো হাইকোর্ট

আলোকিত সকাল ডেস্ক

স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুক নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেছিলেন চট্টগ্রামের এক নারী।৭ বছর আগে ওই মামলায় তার স্বামীর ৩ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হয়। পরে রায় ও জরিমানার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি মামলা করেন দণ্ডপ্রাপ্ত স্বামী।

এদিকে এরইমধ্যে দম্পতির মধ্যে মিল হয়ে যায়। হাইকোর্টে যখন এই মামলা চলছিল, তখন এই দম্পতি একসঙ্গে ঘর-সংসারও করছিলেন। কিছুদিন আগে তাদের একটি সন্তানও হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ইউসুফ মাহমুদ মোর্শেদ দৈনিক জাগরণকে বলেছিলেন, এই দম্পতি এখন নিজেদের মধ্যে আপস করতে চাইলেও আইনে সে সুযোগ নেই। আবার দণ্ড বহাল রাখলেও তাদের মধ্যে আবার মনমালিন্য হতে পারে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আইনের ওই ধারাটি বদলানোর নির্দেশ দিয়েছিলো আদালত।

সর্বশেষ এই নিয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। রায় অনুসারে আইনটি পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারবে নিম্ন আদালত।

এই রায়ের ফলে ২০০০ সালের নারী নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ১১ (গ) ধারাটি আপসযোগ্য হওয়ার পথ খুলল। ১১ (গ) ধারায় বলা আছে, যৌতুকের কারণে ‘সাধারণ জখম করার জন্য অনধিক তিন বছর আর ন্যূনতম এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত এবং ওই দণ্ডের অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

এই বিধানের ফলে স্বামী-স্ত্রী মিলে গেলেও তারা আপস করে মামলা তুলে নিতে পারেন না। তাই ৬ মাসের মধ্যে সংসদকে আইন সংশোধন করে সংশ্লিষ্ট অপরাধকে অনাপসযোগ্য থেকে আপসযোগ্য করতে বলেছে হাইকোর্ট।

এর ফলে জাতীয় সংসদে আইনের বিষয়ে সংশোধনী আনার আগ পর্যন্ত হাইকোর্টের এই রায়ের আলোকেই নিম্ন আদালত সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন। অর্থাৎ আইনে যা নেই, সেই শূন্যতা পূরণ করার পথ খুলে দিয়েছে হাইকোর্ট।

রায়ে আদালত বলেছে, আইনের বিধান যত কঠোরই হোক না কেন তা একটি সংসার রক্ষার চাইতে বড় হতে পারে না। একটি সংসার ভেঙে গেলে তার পারিবারিক ও সামাজিক নেতিবাচক দিক সুদূরপ্রসারী। এতে শুধু সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই ঘটে না তাদের সন্তান এমনকি নিকট আত্মীয়-স্বজনের উপরেও এর গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আদালত আরও বলেন, আইনের প্রয়োগ এবং এর ব্যাখ্যা যান্ত্রিক হতে পারে না। আইনের শাসনের মূল লক্ষ্যই হলো অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা সুনিশ্চিত করা।

নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১১(গ) ধারা সংশোধনের নির্দেশ দিয়ে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের দেয়া রায়ে এমন পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়েছে।

আদালত রায়ে আরও বলেছে, এটা বাস্তবতা ও সত্য যে আইনের ১১(গ) ধারার আওতায় সংঘটিত অপরাধ আপসযোগ্য নয় এবং তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু যৌতুক নিরোধ আইনে ৩ ও ৪ ধারার অপরাধ সংঘটনের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছরের শাস্তির বিধান থাকলেও তা আপোষযোগ্য করা হয়েছে। তাছাড়া দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩২৪ ও ৩২৫ ধারায় সংঘটিত অপরাধের জন্য যথাক্রমে এক বছর, তিন বছর ও সাত বছরের শাস্তির বিধান রয়েছে। এই তিনটি ধারাই আপসযোগ্য। সেজন্য এসব ধারার অপরাধসমূহের প্রকৃতি ও গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা ও শান্তি সুনিশ্চিতের পাশাপাশি মামলা জট নিরসনের স্বার্থে ১১(২) ধারার অপরাধটি অনতিবিলম্বে আপসযোগ্য করার জন্য সংশ্লিষ্ট আইনটি সংশোধন করা প্রয়োজন।

রায়ে বলা হয়, পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও মনোমালিন্য অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। যৌতুকের দাবিসহ যে কোনো অজুহাতে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর ওপর শারীরিক নির্যাতন নিঃসন্দেহে নিন্দনীয় ও গর্হিত অপরাধ। এ অপরাধের পরেও যদি স্বামী-স্ত্রী নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে দাম্পত্য জীবন অব্যাহত রাখার সংকল্প করে সেক্ষেত্রে আইনের বিধান যত কঠোর হোক তা বাধা হতে পারে না।

গত ১০ এপ্রিল ঘোষিত এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ১২ মে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

প্রসঙ্গত, চার লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী লাভলী আক্তার তার স্বামী মো.শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২০১২ সালে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় ২০১৪ সালের ১০ জুলাই চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল শফিকুল ইসলামকে ৩ বছরের কারাদণ্ডসহ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছিলেন। দণ্ডিত স্বামী ওই রায় বাতিলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ (ক) ধারার আওতায় হাইকোর্টে মামলা করেন।

২০১২ সালে করা মামলায় লাভলী আক্তার উল্লেখ করেন, নৌবাহিনীর ঈসা খাঁ ঘাঁটিতে কর্মরত স্বামী তিনি গর্ভবতী থাকা অবস্থায় চার লাখ টাকা যৌতুক দাবিতে তলপেটে লাথি মারেন। এতে তিনি গুরুতর জখম হন। তার অকাল গর্ভপাত ঘটে। এরপরও নির্যাতন অব্যাহত রাখেন। এই মামলায় স্বামী দোষী সাব্যস্ত হন।

দণ্ডিত শফিকুল ২০১৬ সালে প্রথমে ট্রাইব্যুনালে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন এবং পরে হাইকোর্টে আসেন। হাইকোর্টের রুল জারির পর স্বামী-স্ত্রী যৌথভাবে হলফনামা দেন যে, ‘তাদের মধ্যে সকল ভুল-বোঝাবুঝির অবসান’ হয়েছে। এখন তারা সুখে জীবনযাপন করতে চান। আড়াই বছর বয়সী এক পুত্রসন্তান আছে তাদের।

হাইকোর্ট চট্টগ্রামের ট্রাইব্যুনালের ওই রায় বাতিল করে বলেছেন, আইনের প্রয়োগ ও এর ব্যাখ্যা যান্ত্রিক হতে পারে না। পারিবারিক বা দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য ও ভুল-বোঝাবুঝি অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়।

ওই সাজা বাতিল চেয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ (ক) ধারায় হাইকোর্টে আবেদন করেন শফিকুল। ওই আবেদন নিষ্পত্তি করে গত ১০ এপ্রিল হাইকোর্ট সাজা বাতিলের রায় ঘোষণা করেন। ১২ মে হাইকোর্ট এর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে। রায়ে ওই আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত এই নির্দেশনার আলোকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১ (গ) ধারার অপরাধ আপসমূলে নিষ্পত্তিতে ট্রাইব্যুনাল সম্পূর্ণরূপে এখতিয়ার সম্পন্ন হবে বলে রায়ে উল্লেখ করে হাইকোর্ট।

আস/এসআইসু

Facebook Comments