সংঘবদ্ধ চক্রে উধাও সড়কের গাছ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলায় সরকারি গাছ কাটছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। সেই সংঘবদ্ধ গাছকাটা চক্রের হাতে দিনে দিনে উধাও হচ্ছে দুটি সড়কের ১২ কিলোমিটার এলাকার গাছ। স্থানীয় এবং সচেতন মহলের অভিযোগ রয়েছে গত ৬/৭ বছর ধরে এই চক্র প্রায় কয়েক কোটি টাকার সরকারি গাছ কেটে সাবার করেছেন। চক্রের সদস্যরা হচ্ছে একই এলাকার অসাধু কাঠ ব্যবসায়ী, করাত কল মালিক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ প্রভাবশালীরা জড়িত রয়েছে বলে জানান এলাকাবাসী।

নানা অজুহাতে সরকারি গাছ হরিলুট করার জন্য এলাকার বখাটে ও কিছু স্থানীয় জনপ্রতিনিধির যোগসাজেসে তৈরি হয়েছে একটি সিন্ডিকেট। গাছকাটা এই সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে এলাকায় একদিকে ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ অন্যদিকে সড়কের দুপাশে সারি সারি গাছে পূর্ণ সড়ক দুটি এখন গাছ শূন্য হওয়ার পথে।

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরদিঘী ইউনিয়নের ফুলবাড়ি বাজার থেকে দক্ষিণে সলিমনগর পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার পর্যন্ত এবং পশ্চিমে বিনতের মোড় হয়ে বাহাদুর বাজার পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার সড়কটির দিকে তাকালেই চোখে পড়বে গাছ শূন্যতার চিত্র। ৬ থেকে ৭ বছর আগেও সড়ক দুটির দুপাশে ছিল বিভিন্ন প্রজাতির সারি সারি গাছ। বেশি ছিল কড়ই ও আকাশমনি গাছ। রাস্তার দুপাশের গাছে মনোরম শ্যামল ছায়া নিতে ভিড় করতো প্রকৃতিপ্রেমিরা। এখন তার ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় কিছু অসাধু কাঠ ব্যবসায়ী, করাত কল মালিক ও স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধির সংঘবদ্ধ গাছ কাটা চক্রের কবলে পড়ে সড়ক দুটি এখন গাছ শূন্য হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, এই চক্রের মূল হোতা সুন্দরদিঘী ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নোবেল আলী। তার সাথে রয়েছেন গাছ ব্যবসায়ী শহীদ আলী, স্থানীয় প্রভাবশালী হাশেম আলী, রমিজ উদ্দিন, হাবিব, আবুল হোসেন। ঝড়ের সময় অন্যরা যখন ঘরের ভেতরে আশ্রয় নেয় ঠিক তখনই গাছকাটা চক্র বেরিয়ে পড়ে গাছ কাটার জন্য। একটি গাছ ঝড়ে পড়লে তার পাশের ভাল আরও ১০টি গাছও কেটে নেয়া হয়। দু-একটি গাছ নামমাত্র নিলামের জন্য রেখে বাকিটা বিক্রি করে টাকা ভাগ বাটোয়ারা করে নেন তারা।

তারা আরও জানান, ইউপি সদস্য নোবেল আলী এই সিন্ডিকেটের টাকা দিয়ে বড় মার্কেট গড়ে তুলেছেন। সেখানে ফার্নিচারের দোকানও আছে। অভিযোগ রয়েছে তার ফার্নিচারের দোকানের মালামাল সরবরাহ হয় রাস্তার গাছ থেকেই। এভাবে গাছ কাটতে কাটতে এখন রোদে পথিকের ছায়া নেবার মতো জায়না নেই সড়ক দুটিতে। ঝড়ে পড়ার নাম করে নিধন করা হয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সড়ক দুটির গাছগুলো। তবে এলজিইডি বলছে সড়ক তাদের হলেও সড়কের গাছের মালিকানা জেলা পরিষদের।

স্থানীয় অধিবাসী গোলাম মোস্তফা বলেন, ঝড়ের সময় মানুষ যখন ঘরের ভিতর থাকে তখন এই সিন্ডিকেটের সদস্য গাছ কাটায় ব্যস্ত থাকে। বড় বড় কড়ই ও আকাশমনি গাছ কেটে কেটে শেষ করে ফেলেছে। একটু ছায়াতে দাঁড়াবেন এমন অবস্থাও নেই।

আবুল কালাম নামে যুবলীগ নেতা বলেন, স্থানীয় ইউপি সদস্য গাছ কাটায় জড়িত এটা আমরা মেনে নিতে পারি না। যাদের কাছে সড়কের গাছ সুরক্ষা পাবে তারাই কাটছে। তারা গাছ কাটার পর গোড়ালিও তুলে নিয়ে যায় যাতে প্রমাণ না থাকে। এদের ছাড় দেয়া উচিত না।

সম্প্রতি ঝড়ো বৃষ্টির সময় ওই চক্র আবারও গাছ কাটলে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। গাছ বিক্রির সময় হাতে নাতে আটক করেন স্থানীয়রা। এ সময় গাছকাটা সিন্ডিকেটের সাথে স্থানীয়দের হাতাহাতিও হয়। তাদের হামলায় সুন্দরদিঘি ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সিদ্দিকুর রহমান আহত হন। পরে তাকে দেবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হয়। খবর পেয়ে ৪১টি গাছ এলজিইডি জব্দ করে। স্থানীয়দের অভিযোগ ওই সিন্ডিকেটে ঝড়ে পড়া গাছ কাটার নাম করে অন্তত ৪০/৫০ টি গাছ কেটে কালাম নামে এক ব্যক্তির সো-মিলের সামনে ফেলে রাখেন। এ নিয়ে ওই এলাকায় বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

ইউপি সদস্য আবু সিদ্দিক বলেন, নোবেল আলী, শহীদ, হাশেম আলী, রমিজ উদ্দিন, হাবিব, আবুল হোসেন এরা সিন্ডিকেট করে বছরের পর বছর অবৈধভাবে রাস্তার গাছ নিধন করছে। নোবেল মেম্বার সেই টাকায় মার্কেট গড়ে তুলেছে। রাস্তার গাছ কেটে তার ফার্নিচারের দোকানের জিনিসপত্র বানানো হয়। এই ঝড়ো বৃষ্টিতে তারা গাছ বিক্রির চেষ্টা করলে স্থানীয়রা আটক করে আমাকে খবর দেয়। আমি সেখানে গেলে তারা আমাকে মারধর করে। ওরা এতোটাই প্রভাবশালী। কেউ কিছু বলতে পারে না।

পঞ্চগড় জেলা পরিষদের সদস্য হারুন উর রশিদ বলেন, এখানকার মানুষরা দরিদ্র। তারপরও তারা একটা গাছের পাতা নাড়েনি। আর কিছু ইউপি সদস্য ও গাছ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে রাস্তার গাছগুলো কেটে শেষ করছে। এদের কঠোর শাস্তি হওয়া দরকার।

ফুলবাড়ি বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল বারিক খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই একটি সিন্ডিকেট আমাদের সামনেই সড়ক দুটির গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা তাদের চিনি কিন্তু বলতে পারি না। প্রশাসনও এ বিষয়ে তেমন নজর দেয় না।

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক হুমায়ুন কবীর বলেন, রাস্তার দুপাশের নয়ানাভিরাম গাছ গুলো কেটে নিয়ে যাচ্ছে একটি চক্র। এটি আমাদের পরিবেশের জন্য হুমকি।

সুন্দরদিঘি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পরেশ চন্দ্র সরকার জানান, আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে একটি গাছও অবৈধভাবে কাটা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এবার ঝড়ে ৫টি গাছ পড়েছিল রাস্তার উপর সেগুলো আমিই কাটার জন্য বলেছিলাম।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মোমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা খবর পেয়ে ৪১টি গাছের লগ জব্দ করেছি। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে। পরবর্তী ব্যবস্থা তিনি নিবেন।

দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রত্যয় হাসান জানান, সড়কের গাছ কাটার বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। উপজেলা প্রকৌশলী গাছগুলো জব্দ করেছেন। অবৈধভাবে কেউ সড়কের গাছ কেটে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments