শ্রীনগরে মৌমাছি লালন পালনে ব্যস্ত মধু চাষীরা

আরিফুল ইসলাম শ্যামল

মৌমাছি লালন পালন ও সংরক্ষণে ব্যস্ত সময় পার করছেন মধু চাষীরা। মৌমাছির বংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যে টাঙ্গাইল, মধুপুর, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থান থেকে এ সময়ে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে আসেন অনেক মধু চাষী। এঅঞ্চলে এসে তারা মৌমাছির পরির্চযা ও লালন পালন করেন। মৌমাছি সংরক্ষণের জন্য যুগ উপযোগী জায়গা হিসেবে উপজেলার বিবন্দী, টুনিয়ামান্দ্রা, তন্তর, রুসদী, বীরতারা, আটপাড়া এলাকায় এমন কয়েকটি অস্থায়ীভাবে মৌমাছি সংরক্ষণাগার গড়ে তুলেছেন মধু চাষীরা। বছরের জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এখানে থেকে মৌমাছির বংশ বৃদ্ধি করাবেন তারা। আবার সেক্টেম্বর বা নভেম্বর মাসে মৌমাছি নিয়ে চলে যাবেন দেশের বিভিন্নস্থানে খাঁটি মধু সংগ্রহের জন্য। চাষীরা বছরের ৬ মাস এই মৌমাছির দল দিয়ে মধু সংগ্রহ করবেন।

আদিকাল থেকে মৌমাছি মানুষের নিকট অতি পরিচিত একপ্রকার ক্ষুদ্র পরিশ্রমী ও উপকারী পতঙ্গ। দলবদ্ধভাবে এরা বসবাস করে থাকে বলে এদেরকে সামাজিক পতঙ্গ বলা হয়। পৃথিবীতে মূলত পাঁচ প্রজাতির মৌমাছি রয়েছে। মৌমাছিরা ফুলের পরাগায়ণ ঘটিয়ে ফসলের বৃদ্ধি ঘটায়।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, চাষীরা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে তাদের পরিত্যাক্ত জায়গা ও বাগানবাড়ি গুলো কয়েক মাসের জন্য এগ্রিমেন্ট নিয়েছেন। একেকটি স্থানে প্রায় এক থেকে দেড় শতাধিক মৌমাছির বাক্স রয়েছে। বাগানে বাক্সগুলো সাড়িবদ্ধভাবে বিছানো রয়েছে। প্রত্যোকটি বাক্সের মধ্যে মৌমাছির দল যে যারমতে বাক্সের চারপাশে উড়ছে। বর্তমানে দেশে এপিস মেলিফেরা নামক প্রজাতির মৌমাছি চাষ বেশী হচ্ছে। মূলত এটি ইউরোপিয়ান জাত, আকারে বড় ও অধিক মধু সংগ্রহের জন্য এই প্রজাতির মৌমাছি সর্ব উত্তম। লক্ষ করা গেছে, প্রত্যোটি বাক্সের মধ্যে একটি করে রানী মৌমাছি রাখা হয়েছে বংশ বৃদ্ধির জন্য। প্রতিদিন একটি রানী প্রায় তিন হাজার ডিম দিয়ে থাকে। রানী মৌমাছি বছরে এক বারই মিলন করে থাকে এবং ওই বাক্সে বংশ বৃদ্ধি করতে থাকে। বাক্সের মধ্যে কয়েক হাজার মৌমাছির মধ্যে রানী ব্যতিত বাকি মৌমাছিরা শ্রমিক হিসেবে রানীকেই ঘিরে বসবাস করে থাকে। সাধারণ শ্রমিক মৌমাছির গড় আয়ু মাত্র দেড় থেকে তিন মাস হলেও রানী মৌমাছির গড় আয়ু প্রায় তিন বছর। এসময় মৌমাছির খাবার হিসেবে চিনির ঘন রস বা সিরাপ দেয়া হয় বাক্সে। মৌমাছি লালন পালনে প্রতিমাসে একশত বাক্স হিসাব অনুযায়ী ৫০ কেজি ওজনের ৬-৭ বস্তা চিনির প্রয়োজন হয় একজন চাষীর।

উপজেলার বিবন্দী এলাকার মৌ চাষী জাহিদ মিয়া বলেন, কয়েক মাসের জন্য মৌমাছি লালন পালনে ঠান্ডা, শুস্ক ও জনবিহীন বাগান গুলো সর্ব উত্তম। আগামী সিজনে মধু সংগ্রহের জন্য মৌমাছির বংশ বৃদ্ধি করানোর জন্য এখানে এসেছি। এসময় এখানে বর্ষাকাল জমিতে কোন ফসল নেই। তাই কৃষদের জমিতে কীটনাষক ব্যবহার করতে হয়না। মৌমাছির বংশ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই বাগনটি নিরাপদ। টুনিয়ামান্দ্রায় মোঃ সামছুল হক ও তন্তরে আসা মধু চাষী রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা মধুপুর থেকে এখানে এসে মৌমাছি লালন পালন করছি। কয়েক মাস পরে মধু সংগ্রহের জন্য অন্যত্র চলে যাব। এ সময়টা মৌমাছি লালন পালনে জন্য কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে। শুধুই খরচ। কারণ হিসেবে তারা বলেন, মৌমাছি সংরক্ষণে আমাদের কয়েক মাস এখানে শ্রমিক নিয়ে থাকতে হয়। এখন মৌমাছি থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়না। প্রতিদিন মৌমাছির খাবার হিসেবে চিনির রস দিতে হয়। সব খরচার জন্য হিমসিম খেতে হয় তাদের। সিজনে একশত টন মধু উৎপাদ করেন তারা। মধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের জন্য মধু ঠিকমত বাজারজাত করতে পারেননা তারা। খোলা বাজারে এতো মধু তাদের বিক্রি করা সম্ভব না। সরকারের কাছ থেকেও কোন সুযোগ সুবিধা তারা পাননা। দেশের খাঁটি মধু বিদেশেও ব্যাপক চাহিদা থাকা সর্ত্বেও আমরা আন্তর্জাতিকভাবে বাজারজাত করতে পারছিনা। মধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট মহলের জন্য আমাদের উৎপাদিত ন্যার্য দামে কিনেন না। মধু নিয়ে আমাদের বেকায়দায় পরতে হয়। সরকার যদি মধু চাষীদের দিকে একটু সুদৃষ্টি রাখেন তাহলে সঠিক উপায়ে দেশের মধু বিদেশে বাজারজাত করার মাধ্যমে সরকারও অনেক লাভবান হতো। মধু চাষে চাষীদের আগ্রহ আরো কয়েকগুন বাড়তো। শতশত বেকার যুবকের কর্মসংস্থানও হতো।

আস/এসআইসু

Facebook Comments