শরিকদের থেকে দূরে দূরে বিএনপি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

দুই দশক পর জোটের লাভ-ক্ষতি নিয়ে হিসাব কষতে শুরু করেছে বিএনপি। ছোট শরিকরা বোঝা কি না, এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আর এ থেকেই আপাতত তাদের বাদ দিয়ে একলা চলতে চাইছে বিএনপি।

তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, জোট করে ২০০১ সালে ক্ষমতায় এলেও পরে সঙ্গীরা বিএনপির জন্য বোঝা বলে প্রমাণ হয়েছে। আর তাদের মাত্রাতিরিক্ত ছাড় দিতে গিয়ে বিএনপি নিজের ক্ষতি করেছে। বিনিময়ে বিএনপির জন্য নানা সমালোচনা ছাড়া তেমন কিছু পায়নি। আর আন্দোলন-সংগ্রামেও সহযোগীরা কথামালা ছাড়া আর কিছু করতে পারেনি।

১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি, গোলাম আযমের জামায়াতে ইসলামী এবং আজিজুল হকের ইসলামী ঐক্যজোটের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয় বিএনপি। তখন নাম হয় চারদলীয় জোট। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে এরশাদ জোট ছেড়ে গেলেও তার দলের একটি অংশ নাজিউর রহমান মঞ্জুরের নেতৃত্বে থেকে যায় জোটে।

২০০১ সালে এই জোট ভীষণ কার্যকর প্রমাণ হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোট প্রায় সমান থাকলেও নৌকার তুলনায় তিন গুণের বেশি আসনে জিতে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। কিন্তু ’৭১ সালের খুনি বাহিনী আলবদরের দুই নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদকে মন্ত্রিত্ব দিয়ে সমালোচিত হন বেগম খালেদা জিয়া।

এরপর ২০০৭ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠলে বিএনপিকে স্বাধীনতাবিরোধীদের রক্ষক বলে আক্রমণ করতে থাকে আওয়ামী লীগ। আর ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ভরাডুবি হয় বিএনপি। এর ফাঁকে বিএনপি চারদলীয় জোটকে সম্প্রসারণ করে প্রথমে ১৮ দল ও পরে ২০ দলীয় জোটে পরিণত করে।

আবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই জোটের পাশাপাশি কামাল হোসেনের গণফোরামের নেতৃত্বে আরেকটি জোট করে বিএনপি। নিজেরা জোটের সবচেয়ে বড় দল হলেও বিএনপির তুলনায় গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য আর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের নেতারাই বেশি কথা বলতে থাকেন। কিন্তু এই জোটের প্রবীণ নেতারা হুংকার দিলেও রাজপথে নামেননি।

এই দুই জোট করে কী লাভ হলো- এমন প্রশ্ন এখন বিএনপির নেতারা তুলছেন প্রকাশ্যেই। আর এর মধ্যে শরিকদের বাদ দিয়ে কারাবন্দি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে তাদের একলা কর্মসূচির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে দুই জোটে।

২০১৫ সালে সরকার পতনের আন্দোলনে নেমে খালি হাতে ফেরার পর থেকে রাজপথের কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিল না বিএনপি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এবং ভোটে কারচুপির অভিযোগে পরে কর্মসূচি দেওয়ার হুমকি দিলেও মাঠে সক্রিয় ছিল না তারা।

তবে সম্প্রতি দলীয়প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে মাঠে নেমেছে দলটি। সমাবেশ থেকে নতুন নির্বাচনেরও দাবি করছেন নেতারা। কিন্তু গত দুই দশকের মধ্যে এবার বিএনপি তাদের শরিকদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে না। দুটি জোট সমান্তরালে চললেও বৈঠকও নেই। নেতারা প্রকাশ্যেই জোটের বদলে একা চলার কথা বলছেন।

নেতারা বলছেন, এই একলা চলার সিদ্ধান্ত হুট করে হয়নি। ভেবেচিন্তে নেয়া সিদ্ধান্তেই শরিকদের এড়িয়ে চলা হচ্ছে। এ নিয়ে শরিকদের কারো কারো মধ্যে চাপা ক্ষোভ থাকলেও বিষয়টিকে খুব বেশি আমলেও নিচ্ছে না বিএনপি।

বিশেষ করে ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে আর আগাতে চাইছেন না বিএনপির নেতারা। তারা বলছেন, নির্বাচনের আগে প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা হয়েছিল। আপাতত এখন এর খুব বেশি প্রয়োজন নেই। আর ২০ দলের শরিকদের কারো কারো বাড়াবাড়ি এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আপত্তিতে এই সিদ্ধান্ত।

বিএনপির একজন সাংগঠনিক সম্পাদক ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘কর্মসূচি সফল করতে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাই তো যথেষ্ট। অন্যদের খুব বেশি হেল্প সত্যিকার অর্থে লাগে না। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক জায়গায় নেতাকর্মীদের জোটের লোকজনের বিষয়ে আপত্তিও আছে। তাই দেশব্যাপী সমাবেশে তাদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না।’

কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে বরিশাল, চট্টগ্রামে সমাবেশ করেছে বিএনপি। রাজশাহী ও খুলনার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। ঈদুল আজহার আগে বিভাগীয় পর্যায়ের সমাবেশ শেষ করতে চায় দলটি। সবশেষ ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার চিন্তা আছে বিএনপির।

নানা শর্তে অল্প সময়ের জন্য অনুমতি পেলেও চট্টগ্রাম ও বরিশালে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর সমাগম হয়। নেতারা আশা করছেন, বাকি কর্মসূচিও সফল হবে।

সবশেষ একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ৩০ সেপ্টেম্বর বিএনপি এককভাবে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করে। পরে নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বেশ কয়েকটি জেলায় সমাবেশ করে। এতে দুই জোটের নেতারা বক্তব্য দেন।

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সংগঠন গোছাতে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে বিএনপির হাইকমান্ড। এসব বৈঠকে লন্ডন থেকে স্কাইপে যুক্ত হন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে নেতারা জোটের শরিকদের রেখে নিজেদের দল গুছিয়ে সামনে চলার পরামর্শ দেন। নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের পর বিএনপির তৃণমূলের নেতারা দুই জোট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা সংগঠন গোছাতে এককভাবে কর্মসূচি দেয়ার তাগিদ দেন। এমনকি দলের স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বিষয়টিতে একমত পোষণ করেন।

বিএনপি একলা চলা শুরু করল কি না- এমন প্রশ্নে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘অনেকটা সেই রকম বলতে পারেন। তবে একটা বিষয় হলো বিএনপি শক্তিশালী হলে জোট শক্তিশালী হবে। তারা নিজেরা শক্তিশালী হলে তো লাভ নেই। আমরা সেই কাজটি করছি।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ কর্মসূচি হচ্ছে বিএনপির ব্যানারে। শরিকদের নিয়ে কর্র্মসূচি করার সুযোগ তো বন্ধ হয়ে যায়নি।’

বিস্ময়কর হলো শরিকদের মধ্যে অন্তত একটি দল বিএনপির এই একলা চলা সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহদাত হোসেন সেলিম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এখন নির্বাচনও নেই, আন্দোলনও নেই। এই অবস্থায় সবাই সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। বিএনপি সেটা করছে। আমরাও চেষ্টা করছি। কারণ আমাদের সবার লক্ষ্য খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নতুন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এতে প্রমাণ হবে শরিকদের কার কতটা সাংগঠনিক শক্তি আছে।

অস্থিরতায় দুই জোট

এদিকে নির্বাচনের আগে বেশ সরগরম থাকলেও কিছুদিন ধরে দুই জোটে বিরাজ করছে অস্থিরতা। কারণ ইতিমধ্যে নানা অভিযোগ তুলে ঐক্যফ্রন্ট থেকে বের হয়ে গেছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি আবদুল কাদের সিদ্দিকী। বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে জোট ছেড়ে চলে যান আন্দালিব রহমান পার্থর বিজেপি। একে অবশ্য খুব বেশি গুরুত্ব দেয়নি বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতারা বলছেন, জোট থেকে কেউ বের হয়ে গেলে তাতে কোনো অসুবিধা নেই।

অন্যদিকে ২০ দলের প্রভাবশালী নেতা এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ নির্বাচনে অংশ নিলেও ফল প্রত্যাখান করার পর বিএনপির সংসদে যোগ দেয়ার বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপি নেতারা কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারছে না বলে অভিযোগ করেন।

এখানেই শেষ নয়, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে গত ২৭ জুন আলাদা ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চের’ ঘোষণা সাবেক এই বিএনপি নেতা। এই বিষয়টি নিয়েও তলে তলে ক্ষুব্ধ বিএনপি নেতারা। যদিও প্রকাশ্যে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন তারা।

বিএনপি ও জোট নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা না করে অলি আহমদের পৃথক প্লাটফর্ম করাকে ভালোভাবে নেয়নি দলটি। নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি নিয়ে এলডিপির সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব তৈরি হয়। এই মঞ্চ ঘোষণার পর এটি আরো প্রকাশ্যে আসছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments