লেভেল ক্রসিংয়ে মৃত্যুফাঁদ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজশাহী থেকে ঢাকামুখি পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনের গতিবেগ ছিল তখন ৬০ কিলোমিটারের উপরে। সামনে একটা বাঁক পেরিয়ে অরক্ষিত লেভেলক্রসিং। এ কারণে সামনে তেমন কিছুই দেখা যায় না। বাঁক পেরিয়ে ট্রেনের চালক হঠাৎ সামনে দেখেন একটি মাইক্রেবাস লেভেল ক্রসিংয়ের রাস্তা ধরে সামনের দিকে আসছে। চালক হর্ন বাজিয়ে চলছেন। ভাবলেন, মাইক্রোবাসটি হয়তো দাঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু লেভেলক্রসিং থেকে কিছুদূরে থাকতে বুঝলেন মাইক্রেবাসটি দাঁড়ায় নি। গতি নিয়েই পারাপারের চেষ্টা করছে। এক পর্যায়ে ট্রেনটি মাইক্রেবাসটিকে ধাক্কা দেয়। ইঞ্জিনের সামনে অংশে আটকে যায় হাইয়েস ব্রান্ডের মাইক্রোবাসটি। চালক তখন ইমারজেন্সী ব্রেক কষে ট্রেনটি থামানোর চেষ্টা করেন। এরই মধ্যে ট্রেনটি বেশ কিছুদুর এগিয়ে যায়। ট্রেনটি যখন দাঁড়ায় ততোক্ষণে সব শেষ। মাইক্রোবাসের ভেতরে দলিত হয়ে বর-কনেসহ বরযাত্রীদের সবাই রক্তাক্ত। কারো কারো নিথর দেহ জানালা ভেঙ্গে বাইরে ঝুলে গেছে। ছুটে আসেন আশপাশের লোকজন। উদ্ধার করেন মাইক্রোবাসের যাত্রীদের। ট্রেন চালকের সাথে কথা বলে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে গত ১৫ জুলাই সোমবার ভয়াবহ দুর্ঘটনার এভাবেই বর্ণনা দিয়েছেন একজন। ওই দুর্ঘটনায় নবদম্পতিসহ প্রাণ হারান মাইক্রোবাসের ১২ জন আরোহী। নিমিষেই বিয়ের সব আনন্দ ¤øান হয়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। মাস দুয়েক আগেও একই লেভেলক্রসিংয়ে ঢাকা-কলকাতার মৈত্রী এক্সপ্রেসের ধাক্কায় নিহত হয় দুজন। সাথে দুটি গরুও মারা যায়।

গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের বারইয়ারহাট এলাকায় বাসের সঙ্গে ট্রেনের ধাক্কায় মারা যান দুজন। তারও আগে ২০১৪ সালের ১ আগস্ট ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে লেভেলক্রসিং পার হওয়ার সময় বরযাত্রীবাহী একটি বাসের সঙ্গে ট্রেনের ধাক্কা লেগে প্রাণ হারান ১১ জন। রেলওয়ের তথ্য থেকে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অরক্ষিত অবস্থায় থাকা লেভেলক্রসিংগুলোতে প্রায়ই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রতি বছর রেল দুর্ঘটনায় যত প্রাণহানি ঘটে, তার সিংহভাগই অবৈধ লেভেলক্রসিংয়ে।

সারা দেশে এ ধরনের লেভেলক্রসিং আছে ১ হাজার ৮৫টি। এর কোনোটিতেই গেটকিপার নেই। শুধু পারাপারের পথে ‘ঝুঁকিপূর্ণ লেভেলক্রসিং’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলানো থাকে। সেদিকে অবশ্য কেউ খেয়াল করে না। এ কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। ঝরছে প্রাণ। অবশ্য ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিংগুলো ঝুঁকিমুক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে জানান রেলওয়ের কর্মকর্তারা। তারা জানান, জনবলের অভাবে অনেক বৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে গেটকিপার রাখাও সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য স্বয়ংক্রিয় লেভেল ক্রসিং ব্যবহারের পরিকল্পনা চলছে। বৈধ-অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, বৈধ-অবৈধ লেভেল ক্রসিং পুনর্বাসনে রেলওয়ের দুটি জোনে পৃথকভাবে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় পূর্বাঞ্চলে ৩২৮টি অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া চলমান। এগুলোর মধ্যে বৈধ লেভেল ক্রসিং আছে ১৮২টি, বাকি ১৪৬টি অবৈধ। এ পর্যন্ত ৮১৭ জন গেটকিপার নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যাদের ২৮৬টি লেভেল ক্রসিংয়ে পদায়ন করা হয়েছে। আরো ২২১ জনকে নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া চলমান।

অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলে ৩২৬টি অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য ৮৫১ জন গেটকিপার নিয়োগ দেয়া হচ্ছে, যার মধ্যে ৬৩৯ জনের পদায়নও হয়ে গেছে। বাকি পদগুলোতেও নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া চলমান আছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, সারা দেশে সহ¯্রাধিক অবৈধ লেভেল ক্রসিং গড়ে উঠেছে। এগুলো বানিয়েছে এলজিইডি, সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর। রেললাইনে লেভেল ক্রসিং বানাতে হলে রেলওয়ের অনুমোদন লাগে। এছাড়া নির্দিষ্টহারে ‘ডিপোজিট মানি’ জমা দিতে হয়। কিন্তু এসব সরকারি সংস্থা নিজেদের ইচ্ছামতো রেলওয়েকে না জানিয়েই অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো বানিয়েছে।

রেলের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আইন অনুযায়ী আমরা তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারি। কিন্তু বেশির ভাগই যেহেতু সরকারি সংস্থা, সেহেতু মামলার ঝামেলায় আমরা জড়াতে চাই না। এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের আসলে তেমন কিছু করারও নেই।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূসম্পত্তি শাখার তথ্য বলছে, রেলপথে সবচেয়ে বেশি অবৈধ লেভেল ক্রসিং বানিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। সারা দেশে ৪৫২টি অবৈধ লেভেল ক্রসিং আছে তাদের। একইভাবে ইউনিয়ন পরিষদের ৩৬৩, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ১১, পৌরসভার ৭৯, সিটি করপোরেশনের ৩৪, জেলা পরিষদের ১৩, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ৩, বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের ১, জয়পুরহাট চিনিকলের ১, ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের ৩, অন্যান্য ৯২ এবং রেলওয়ে মালিকানা জানতে পারেনি এমন অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা আরো ৩৩টি। অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলোর সিংহভাগই গড়ে উঠেছে রেলের পূর্বাঞ্চলে। এ সংখ্যা ৮১১।

অন্যদিকে, জনবলের অভাবে অনেক বৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে। রেলওয়ের দুই জোনে (পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল) বৈধ লেভেল ক্রসিং আছে ১ হাজার ৪১২টি। এর মধ্যে গেটকিপার আছে মাত্র ৪৫৬টিতে। বাকিগুলোয় ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে যানবাহন। বৈধ, কিন্তু গেটকিপার নেই, এমন লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা পশ্চিমাঞ্চল (রাজশাহী) রেলওয়েতে বেশি। ৯৭৮টি বৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে গেটকিপার আছে মাত্র ২২১টিতে। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলে (চট্টগ্রাম) ৪৩৪টির মধ্যে গেটকিপার আছে ২৪৫টি লেভেল ক্রসিংয়ে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments