লুঙ্গি কিনেছেন তো! অতি প্রয়োজনীয়, দেশীর কদর বাইরেও…

আলোকিত সকাল ডেস্ক

লুঙ্গি কিনেছেন তো! ঈদের কেনাকাটা তো সাঙ্গই হলো। লুঙ্গি তো লাগবেই। এখন নাড়ির টানে ঘরমুখী। ঈদের আগে এই ক’টা দিন ছুটোছুটি। ঈদের পরেও কর্মস্থলে ফেরার ছুটোছুটি। যানবাহনের টিকেট পাওয়ার বিড়ম্বনায় কি যে ঘাম ঝরে। ঘরে ফেরার ঝক্কিও কম নয়। ঈদের জিনিসপত্র গুছিয়ে বাক্সপেটরা ভরানো কি চাট্টিখানি কথা। তাও বাক্স কমাতে হবে। তবু কি কমে! কোনটা ছেড়ে কোনটা নেয়া। শেষে কিছু বাদ পড়লে তো আরেক সমস্যা। নিজের শহরে ও গ্রামে যাচ্ছেন। লুঙ্গি ঠিকমতো আছে তো! ভরসার এই লুঙ্গিই এখন শেষ বেলার কেনাকাটা।

টুকিটাকি অনেক কিছুই হয়তো বাদ পড়েছে। যাক সেগুলো। শহর, উপজেলা ও গ্রামে এখন সবই মেলে। তবে বাঙালী পুরুষের ক্যাজুয়াল পোশাকে লুঙ্গির বিকল্প নেই। ঘরে তো আর প্যান্ট পাজামা পরে থাকা যায় না। রাতে ওগুলো পরে ঘুমানোও যায় না। যদিও আজকাল উঠতি বড় লোকের ফ্যাশনে কেউ স্লিপিং গাউন পরে। আপনি পরে দেখুন তো স্বাচ্ছন্দ্য পান কিনা! লুঙ্গির স্বাচ্ছন্দ্যই আলাদা। গ্রামে আজও কৃষককে মালকোচা পরে কাজ করতে দেখা যায়। লুঙ্গি ছাড়া যাপিত জীবন কি চলে! পুরুষ লুঙ্গি ছাড়া গোসল করতে পারে না। তাও এ সময় দুটি লুঙ্গি দরকার। একটি পরনে ভিজে যায়। গোসল সেরে আরেকটা পরতে হয়। তারপর লুঙ্গি রোদে শুকাতে হয়। বাইরে থেকে ঘরে ফিরে প্রথম যা প্রয়োজন তা হলো লুঙ্গি। প্রকৃতির বড় চাপ এলে চটজলদি লুঙ্গি ছাড়া কোন গতি নেই। আরেবাপু কমোড আর ক’জন ব্যবহার করতে পারে।

ঈদের সময়ে ঘরে ফিরে লুঙ্গি যদি না থাকে তাহলে তো স্বজনের কাছে থেকে লুঙ্গি নিতে হবে। তিনিও কত সময় এই লুঙ্গি দিয়ে রাখবেন। তারও তো প্রয়োজন। বাড়িতে অনেক সময় ছেঁড়াফাটা লুঙ্গি রাখা হয়। সেই লুঙ্গি না দেখে পরলে মহাবিপদ। ছেঁড়া অংশ কখন কোন জায়গায় গিয়ে ঠেকে। গ্রামে এই ছেঁড়া লুঙ্গি কাঁথা সেলাইয়ের জন্য রাখা হয়। লুঙ্গির গুণের কথা ফুরোবে না।

লুঙ্গির ইতিহাস কিন্তু দীর্ঘ কালের নয়। প্রাচীন যুগে পুরুষ ও নারী উভয়েরই পোশাক ছিল ধুতি। তবে পরার ধরন ছিল আলাদা। খেটে খাওয়া সাধারণ লোকেরা মূলত যে খাটো লুঙ্গি পরতেন তা ধুতির আরেক ধরন। কুচি দেয়া লম্বা ধুতি পরতেন বনেদী অবস্থাসম্পন্নরা। মধ্যযুগে মুসলিমদের পোশাকে কিছুটা পরিবর্তন আসে। চাপকান, কুর্তা, ফতুয়া, চুড়িদার পাজামা, মাথায় পাগড়ি, পায়ে শুঁড় তোলা নাগরা এসব তখন পরতেন অভিজাত শ্রেণীর মানুষ। প্যান্ট শার্ট স্যুট টাই পরার চল শুরু ইংরেজ শাসনামলে।

ইতিহাসবিদগণ মনে করেন ঘরোয়া পোশাক হিসেবে লুঙ্গির সংযোজন বিশ শতকের গোড়ার দিকে। গোলাম মুরশিদ তার হাজার বছরের বাঙালী সংস্কৃতি বইতে লিখেছেন “উনিশ শতক শেষ হওয়ার আগেই ইংরেজী জানা অভিজাত শিক্ষিতদের মধ্যে পশ্চিমা পোশাকের অনুপ্রবেশ ঘটে। তা বাঙালী সমাজে বহাল থাকে। এই সনাতনী পোশাক হলো ধুতি, পাঞ্জাবি আর চাদর। ধুতি তখন সকলেই পরতেন। একটা পর্যায়ে ইংরেজরা বাঙালী হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ধুতি ও লুঙ্গির ব্যবচ্ছেদ করে ফেলে।

এখন তো লুঙ্গির ব্যবহার সার্বজনীন। সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা ঈদের সময়ে লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি পরে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বাঙালীর লুঙ্গিকে সম্মান দেখিয়েছেন। ছেলে বুড়ো সকলেরই ক্যাজুয়াল ব্যবহারে লুঙ্গি না হলেই নয়। লুঙ্গি জাতীয় পোশাকের তকমা পায়নি ঠিকই তবে লুঙ্গির জয়জয়কার প্রতিটি স্থানেই। বাংলাদেশ ছাপিয়ে লুঙ্গি পৌঁছে গিয়েছে ভারতে। ঈদের বাজারে লুঙ্গির বেচাকেনা শেষ বেলায় তুঙ্গে ওঠে। বড় দোকানগুলোতে খোঁজ খবর করে জানা যায়, সাধারণ সময়ে প্রতিদিন যত লুঙ্গি বিক্রি হয় ঈদের সময় তা ছয় থেকে দশগুণ বেড়ে যায়। ফুটপাথ থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অভিজাত বিপণি কোথায় নেই লুঙ্গি। কাঁধে লুঙ্গির গাঁট নিয়ে ঘুরে বড়াতে দেখা যায় ভ্রাম্যমাণ দোকানিদের।

লুঙ্গি মানেই যে সস্তা দামের পোশাক এই ধারণা ভুল। লুঙ্গির ঘেরের মাপও এখন বেড়েছে। উন্নতমানের একটি লুঙ্গির দাম আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে। লুঙ্গির নক্সা ও কাপড়ে বিবর্তন এসেছে। বগুড়া নিউমার্কেটের এক দোকানি জানালেন, অন্য সময় প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০টি লুঙ্গি বিক্রি হয়। ঈদের আগের সময়ে তা বেড়ে ৭০০ থেকে কখনও হাজারেও পৌঁছে। বড় কোম্পানির লুঙ্গির পাশাপাশি পাবনা, কুষ্টিয়া ও টাঙ্গাইলের লুঙ্গি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অনেকেই জাকাত দেয়ার জন্য লুঙ্গি কেনে। মাঝারি মানের লুঙ্গি প্রতিটি ৫শ’ টাকা থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে মিলছে। দামী লুঙ্গি প্রতিটির দাম দেড় থেকে তিন হাজার টাকা। কখনও তারও ওপরে। এগুলো বনেদী খানদানি লুঙ্গি হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। ধনী পরিবারের সদস্যদের বিয়েতে, ঈদে উচ্চবিত্তদের মধ্যে এই লুঙ্গির কদর বেশি।

বাংলাদেশের লুঙ্গির চাহিদা ভারতেও আছে। কলকাতা থেকে ঈদের কেনাকাটা সেরে দেশে ফিরে জুবায়ের দম্পতি জানালেন, কলকাতার ধর্মতলা, নিউমার্কেট, পার্কসার্কাস, হাজী মুহম্মদ মহসীন স্কোয়ার গড়িয়াহাটায় বাংলাদেশের লুঙ্গির চাহিদা অনেক। তারা কয়েক দোকানির সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন, কলকাতায় ভারতীয় লুঙ্গির চেয়ে বাংলাদেশের লুঙ্গির কদর বেশি। জয়তু লুঙ্গি।

আস/এসআইসু

Facebook Comments