লজ্জাগুলো কোথায় রাখি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

‘ছেলেধরা’ গুজব এখনো বন্ধ হয়নি। গুজবকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনে অন্তত ১০ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অর্ধশয়েরও বেশি। গতকালও পাঁচ জেলায় অন্তত ১৯ জন গণপিটুনির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ৩, কুষ্টিয়ায় ১, ঢাকার সাভারে ২, রাজশাহীতে ৫ ও নীলফামারীতে ৪ এবং বগুড়ায় ৪ জন রয়েছেন। গণপিটুনির শিকার অধিকাংশই নারী, মানসিক ভারসাম্যহীন ও প্রতিবন্ধী।

গত কয়েক দিনে একাধিক গণপিটুনির ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে ইন্টারনেটে। সেসব দেখে রীতিমতো শিউরে উঠেছেন সাধারণ মানুষ। সাত-পাঁচ না ভেবে, কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করে ক্ষুব্ধ লোকজন কেবল সন্দেহের বশে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করছে নিরীহ মানুষকে। পুলিশের তরফ থেকে বারবার আইন হাতে না নিতে অনুরোধ জানানো হলেও ক্ষুব্ধ লোকজন সেসব অনুরোধ বা নির্দেশ মানছেন না। গুজবের জের ধরে চলমান ঘটনাগুলোকে পরিকল্পিত হত্যা বলেও মনে করছেন অনেকে। এসব হত্যাকাণ্ড এতটাই অমানবিক ও বর্বরোচিত যে, সভ্য বলে গর্ব করা যে কোনো দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। এমন লজ্জা যে তা লুকোনোর জায়গাও নেই।

গুজবের ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ছেলেধরা সন্দেহে হত্যা বন্ধে পুলিশের সব ইউনিটকে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক টহল, গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, জনসচেতনতা তৈরিতে প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মনিটরিং ও মিডিয়ায় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। এছাড়া, গতকাল সোমবার এক তথ্য বিবরণীতে গুজব ও গণপিটুনি নিয়ে এই সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক গুজব ছড়িয়ে ছেলেধরা সন্দেহে নিরীহ মানুষ পিটিয়ে হতাহত করা হচ্ছে। ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যে কোনো ধরনের গুজব ছড়ানো ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া প্রচলিত আইনের পরিপন্থী ও গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। এ অবস্থায় কোনো বিষয়ে কাউকে সন্দেহজনক মনে হলে নিজের হাতে আইন তুলে না নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ৯৯৯-এ কল করে দ্রুত পুলিশের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ।

এসব গুজব ও হত্যাকাণ্ডের পিছনে বিএনপি-জামায়াতের যোগসাজশ রয়েছে বলে সন্দেহ করছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি গতকাল বলেছেন, ‘গণপিটুনি, ধর্ষণ, বিল্ডিংয়ে আগুন লাগার ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা নয়। এক স্থানে এসব হলে ১০ স্থানে হয়। এসব বিএনপি-জামায়াতের নিখুঁত কাজের উদাহরণ।’ গতকাল নেত্রকোণা জেলা আইনজীবী সমিতির পাঁচতলা ভবন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি। বলেন, ‘পদ্মা সেতুতে মাথা লাগবে দেশে এ ধরনের একটি গুজব ছড়িয়েছিল। আর এই গুজবের কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গণপিটুনিতে হতাহতের ঘটনা ঘটছে।’

হঠাৎ গুজবনৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়া এবং গণপিটুনির ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কারণ খুঁজছেন সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধ বিশ্লেষক ও মনোবিজ্ঞানীরা। তাদের মধ্যে মনোরোগবিদ মেহতাব খানম এই গণপিটুনির মানসিক প্রবণতাকে ‘মব সাইকোলজি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, যখন একটি সমাজে নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নিয়ে আতঙ্ক বা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয় তখন তারা এক ধরনের মানসিক অবসাদে ভোগে। সেই থেকেই মানুষের মধ্যে এ ধরনের সহিংসতা দেখা দেয়। মব সাইকোলজির বৈশিষ্ট্য হলো, যারা গণপিটুনি দেয়, তাদের উচিত-অনুচিত বোঝার মতো বিবেক কাজ করে না। কেউ সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করে না। তারা জানতেও চায় না কি কারণে মারামারি হচ্ছে। তারা তাৎক্ষণিক সেখানে অংশ নিয়ে তাদের ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদের মতে, পরিবেশ, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা এখন খুব অস্থির সময়ের মধ্যে বাস করছি। বেকারত্ব, সুস্থ বিনোদনের অভাব, সহনশীলতার অভাব মানুষকে অস্থির করে তুলছে। আর এ কারণেই গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই অসহনশীলতা মানুষকে নানা অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত করে। তখনই মানুষ অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে।

ছেলেধরা সন্দেহে যেসব স্থানে গণপিটুনির মতো নির্মম ঘটনা ঘটেছে তার খবর :

চট্টগ্র্রাম : চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ছেলেধরা সন্দেহে তিনজন গণপিটুনির শিকার হয়েছেন তিনজন। ছাগল কিনতে এসে সোমবার দুপুরে উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা গ্রামে গিয়ে গণপিটুনির শিকার হন তারা। পুলিশ জানিয়েছে, গতকাল দুপুরে তিন যুবক ইলশা গ্রামে ছাগল কিনতে যায়। এ সময় স্থানীয় লোকজন তাদের ছেলেধরা সন্দেহে মারধর করে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনকে উদ্ধার করে পুলিশ। পিটুনিতে আহতরা হলেন- জনি, সোহেল ও হৃদয়। তাদের বয়স ৩০ থেকে ৩৫-এর মধ্যে।

কুষ্টিয়া : কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে পিটুনি দিয়েছে স্থানীয়রা। দৌলতপুর থানার ওসি আজম খান জানান, উপজেলার শিতলাইপাড়া গ্রামে সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। আহত হাসিনা খাতুনের (৬০) বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়। তাকে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

ওই নারীর মেয়ের জামাই রনি বলেন, তার শাশুড়ি মানসিক ভারসাম্যহীন। গত রোজার ঈদের আগে শাশুড়ি তার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। তিনি বাড়ি থেকে বের হলে রাস্তা-ঘাট ঠিক চিনতে পারে না। আজ সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে বাইরে এসে পথ ভুলে যায়। এরপর স্থানীয়রা ছেলেধরা সন্দেহে তাকে মারধর করেছে।

ওসি বলেন, স্থানীয়রা ছেলেধরা সন্দেহে এক নারীকে পিটিয়ে আহত করেছে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

সাভার : ছেলেধরা সন্দেহে ভাড়াটিয়া দম্পতিকে মারধর করে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয়রা। পরে পুলিশ তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আটক করে। আটকরা হলেন রনি মিয়া (২৩) ও তার স্ত্রী (২০)। তাদের বাড়ি রাজবাড়ী জেলার গোদাগাড়ী থানার সাহেব বাজার গ্রামে। তারা সাভার পৌর এলাকার রাজাবাড়ি মহল্লার আমিনুর রহমানের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। গতকাল দুপুরে সাভার পৌর এলাকার রাজাবাড়ি মহল্লায় এ ঘটনা ঘটে।

রাজশাহী : রাজশাহীর চারঘাটে ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনিতে আহত হয়েছেন পাঁচ এনজিওকর্মী। সোমবার দুপুরে উপজেলার রাওথা এলাকা থেকে পুলিশ ওই পাঁচজনকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নেয়। আটকরা নিজেদের আদ-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার নামের একটি এনজিওর কর্মী দাবি করেছেন বলে চারঘাট থানার ওসি নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন।

ওসি বলেন, চারঘাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাওথা এলাকায় অপরিচিত পাঁচ ব্যক্তি সমিতির নাম করে সদস্য সংগ্রহ করছিলেন। এ সময় সন্দেহ হলে স্থানীয় লোকজন তাদের সমিতির নাম জানতে চেয়ে কাগজপত্র ও পরিচয়পত্র দেখতে চায়। তবে তারা কোনো কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হলে ছেলেধরা সন্দেহ পাঁচজনকে ধরে পিটুনি দিয়ে আটকে রেখে থানায় খবর দেয় স্থানীয় লোকজন। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।

আটকরা হলেন গোপালগঞ্জ জেলার মকসুদপুর উপজেলার ঝাকরপুর গ্রামের মসলেম উদ্দিনের ছেলে হাফিজুর রহমান (৪২), একই এলাকার আখতারুজ্জামানের ছেলে আবুল হোসেন (৪০), একই এলাকার লুৎফর রহমানের ছেলে রেজাউল করিম (৩৮), ঢাকা দক্ষিণের লালবাগ থানার আব্দুল মজিদের ছেলে কাইয়ুম আলী (৩৯) ও একই এলাকার আবুল কালাম (৩৬)।

নীলফামারী : নীলফামারীর সৈয়দপুরে ছেলেধরা সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন চারজনকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয় জনতা। গত রোববার রাত ও সোমবার দুপুর পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন এলাকায় এসব মানসিক ভারসাম্যহীন নারী-পুরুষ উদ্দেশ্যহীন ও সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করায় তাদের আটক করে ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনি দেয় এলাকাবাসী। আটকরা হলেন দিনাজপুরের আব্দুল মালেক (৫০), গাইবান্ধার আব্দুল গফুর (৫৬), নীলফামারীর হেলাল হোসেন (৪০) ও বরিশালের মেরিয়ান (৪০)।

আস/এসআইসু

Facebook Comments