লক্ষ্মীপুরে অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে নিন্মাঞ্চল প্লাবিত,ভোগান্তিতে উপকূলের লাখ বাসিন্দা

 

লক্ষ্মীপুর লক্ষ্মীপুর :
মেঘনা নদীর অস্বাভাবিক জোয়ারে লক্ষ্মীপুরের নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছে জেলার রামগতি, কমলনগর, রায়পুর ও সদর উপজেলার মেঘনার উপকূল সংলগ্ন লক্ষাধিক বাসিন্দা। জেয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে ওইসব এলাকার মাছের খামার, ফসলি জমি, বসত বাড়ি, ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জোয়ারের পানিতে ডুবে মারা গেছে একটি পোল্টি খামারের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মুরগী।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, বুধবারের (৫ আগষ্ট) জোয়ারে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় এক মিটারের বেশি পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। আর জেলার কমলনগর ও রামগতি উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় ৩৩ কি. মি বেড়ি বাঁধ না থাকায় খুব সহজেই জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে।
এদিকে, অতিরিক্ত পানির চাপে জেলার সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর হাটের ফেরীঘাট সংলগ্ন সড়ক বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এতে বন্ধ রয়েছে ফেরী ঘাটের যান চলাচল।
সরেজমিনে দেখো গেছে, জেলার সদর উপজেলা চর রমনী মোহন ইউনিয়নের বুড়ির ঘাট সংলগ্ন এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধটি বিধ্বস্ত থাকায় জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে নিন্মাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়ে গেছে। এতে ওই এলাকার বিস্তীর্ণ আমন ধানের ক্ষেত তলিয়ে যায়। মাছের খামারগুলোতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মাছ বের হয়ে গেছে। গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছে ওই এলাকার লোকজন। একই অবস্থা দেখা গেছে ওই ইউনিয়নের চর আলী হাসান গ্রামে।
ওই এলাকার বাসিন্দা নুরুল অমিন হাওলাদার জানান, প্রতিদিন সকাল এবং বিকেলে তাদের এলাকায় জোয়ারের পানি ঢুকে। এত তাদের এলাকার বসতবাড়ি, ফসলি জমিসহ মাছের ঘেরগুলো তলিয়ে গেছে। ফলে একদিকে চরম ভোগান্তি এবং অন্যদিকে ব্যাপক লোকসানের মধ্যে পড়েছেন তারা।
তিনি জানান, তাদের গ্রামের পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়ি বাঁধটি গত ৫-৬ বছরের বেশি সময় ধরে বিধ্বস্ত হয়ে আছে। এটি মেরামত না করায় জোয়ারের পানি তাদের এলাকায় ঢুকে পড়েছে।
বুধবার বিকেলে কমলনগর উপজেলার চর ফলকন, চরমার্টিন ও চর লরেঞ্চ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জোয়ারের পানি বসতবাড়িসহ ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ায় সাধারণ লোকজনের ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। বাসিন্দারা বসতঘর ফেলে পাশ^বর্তী সড়কে আশ্রয় নিয়েছে। চরম বিপাকে পড়েছে গৃহপালিত হাঁস, মুরগী, গরু, ছাগলসহ গবাদি পশু নিয়ে। চরলরেন্স ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে তাজ পোল্ট্রি খামারের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মুরগী জোয়ারের পানিতে ডুবে মারা গেছে। নষ্ট হয়ে গেছে মুরগির খাবার। এতে প্রায় ৩০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান খামারের মালিক মো. ওসমান। তিনি বলেন, জোয়ারের পানিতে আমার খামারের মুরগিগুলো মরে গেছে। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। ঋণ নিয়ে খামারটি করেছি। ঋণের টাকা এখনো পরিশোধ করতে পারিনি।
কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন বলেন, পানি বন্দিদেরকে আশ্রয়ণ কেন্দ্রে যেতে বলা হয়েছে। এছাড়া সবাইকে শুকনো খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এদিকে রায়পুর উপজেলার চর আবাবিলসহ কয়েকটি গ্রামের অন্তত ৩ হাজার পানের বরজ কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। পান নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা করছেন চাষীরা।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরীন চৌধুরী জানান, জোয়ারের কারণে বেশ কিছু কাঁচা, আধাপাকা ঘরবাড়ি ও সড়কের গাছসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শন করেছি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে কাজ চলছে।
অন্যদিকে জেলার রামগতি উপজেলার মেঘনা নদী বেষ্টিত বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চর অবদুল্যাতে জোয়ারের পানি বসত ঘরে ঢুকে পড়েছে। বুধবার দুপুরের দিকে জোয়ারের পানি নামার সময় ৬-৭ টি বসত ঘর নদীতে নিয়ে যায় বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ বলেন, জেলার রামগতি উপজেলার রমিগতি মাছঘাট থেকে কমলনগর উপজেলার কাদির পন্ডিতের হাট পর্যন্ত মেঘনার উপকূলে ৩৩ কিলো মিটার এলাকায় বেড়ি বাঁধ না থাকায় জোয়ারে পানি খুব সহজে ঢুকে পড়ে। ওই এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। বাঁধটি নির্মাণ হলে জোয়ারের পানি থেকে উপকূলীয় এলাকাগুলো রক্ষা করা যাবে।
সদর উপজেলার চর রমনী মোহনের বিধ্বস্ত বাঁধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক বছর আগে বাঁধটি সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু ব্লক দিয়ে সংকার না করায় বাঁধটি পুনরায় ভেঙে গেছে। নতুন করে বাঁধ মেরামতের প্রকল্প আসলে সেটি মেরামত করা হবে।

Facebook Comments Box