রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খাদ্যপণ্য সরবরাহে দুর্নীতিতে বিব্রত সৌদি দাতা সংস্থা

কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খাদ্যপণ্য সরবরাহে অনিয়ম দুর্নীতির খবরে চরম বিব্রতবোধ করছে সৌদি দাতা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক রিলিফ অর্গনাইজেশন (আইআইআরও)। বিশেষ করে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অভিযানে শনিবার (২৫ মে) ভেজাল খাদ্যপণ্যসহ ট্রাক জব্দ করার ঘটনায় তোলপাড় চলছে। সংস্থাটির উর্ধ্বতন মহল সরবরাহকারীর প্রতি চটেছেন বলে জানা গেছে।

সুত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইআইআরওর খাদ্যপণ্য সরবরাহ কার্যক্রমের প্রধান হিসেবে রয়েছেন আনোয়ার হোসেন নামক এক ব্যক্তি। সব ধরণের অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল হুতা তিনিই। সিন্ডিকেট করে সরবরাহ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তারা।

সংশ্লিষ্ট সুত্রগুলো জানিয়েছে, শুরু থেকে রোহিঙ্গাদের খাদ্য সরবাহের নিয়োজিত রয়েছে সৌদি ভিত্তিক সংস্থা-আইআইআরও। শেল্টারহোমও তৈরী করে দেয় সংস্থাটি। লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা বেশিরভাগ খাদ্যপণ্য সরবরাহ করে থাকে।

আনোয়ার হোসেনের সিন্ডিকেট এ পর্যন্ত ৩ বার খাদ্যপণ্য সরবরাহ করেছে। কিন্তু এতদিন তাদের দুই নাম্বারী ধরা না পড়লেও তৃতীয় বারে প্রশাসনের হাতেনাতে ধরা পড়ে। বের হয়ে আসে ভয়ংকর জালিয়াতির দুর্নীতির তথ্য। দাতা সংস্থার আদেশ-নির্দেশনা লঙ্ঘন করে ব্যক্তিগত পকেটভারির জন্য ভয়ানক অনিয়ম-দুর্নীতির পথ বেছে নেয় আনোয়ার হোসেন ও তার সিন্ডিকেট। যাতে সংস্থাটির শীর্ষ কর্তারা বেজার হয়েছে। ইতোমধ্যে দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সুত্র জানিয়েছে।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট খাদ্যপণ্য সরবরাহের এই ভয়ংকর জালিয়াতিতে জড়িত রয়েছেন। সিন্ডিকেটটি শুরুর দিকে এভাবে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকা লোপাট করেছে। পণ্য সরবরাহের জন্য খোলা টেন্ডার ঘোষণার নিয়ম থাকলেও এই সিন্ডিকেডটি অধিকাংশ প্রকল্প তারা নিজেরাই বাস্তবায়ন করেছে। এভাবে তারা প্রতি প্রকল্প থেকে এক-তৃতীয়াংশের বেশি টাকা মেরে দিয়েছেন। এতে কোটি কোটি তারা লোপাট করেছে সিন্ডিকেটটি।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সৌদি ভিত্তিক সাহায্য সংস্থা আইআইআরও এফডি-৭ অনুযায়ী সর্বশেষ ধাপে ২২ লাখ ৩৪ হাজার খাদ্যপণ্য সরবাহের অনুমতি চান। যথাযথ প্রক্রিয়া শেষে প্রশাসন সংস্থাটিকে এসব খাদ্যপণ্য সরবরাহের অনুমোদন দেন। এই ধাপে ১৫৪২ পরিবারের জন্য চালসহ নিত্য পণ্য ও রমজানের পণ্য ছিলো। পণ্যের তালিকায় রয়েছে চাল, গম আটা, মশুর ডাল, তেল, লবণ, ছোলাবুট ও চিনি। অনুমোদন আবেদনপত্রে আইআইআরও যে মানের পণ্য দেখিয়েছে প্যাকেটে দিয়েছে তার চেয়ে অধিক নিম্নমানের পণ্য। যার বাজার মূল্য অনুমোদন মূল্যের প্রায় অর্ধেক।

আইআইআরও’ অনুমোদন আবেদনপত্রে চালের দাম দেখিয়েছে কেজি প্রতি ৪৫ টাকা। কিন্তু জেলা প্রশাসনের যাচাইয়ে ওই সংস্থার দেয়া চালের বাজার দর পাওয়া গেছে কেজি প্রতি ২৫ টাকা। একইভাবে গম আটার দাম দেখানো হয় ৪০ টাকা কিন্তু প্যাকেটে দেয়া আটার বাজার দর ২৮ টাকা, মশুর ডালের দাম দেখনো হয় ৯৫ টাকা কিন্তু প্যাকেটে দেয়া ডালের মানের বাজার দর ৫০ টাকা, ভোজ্য তেলের দাম দেখানো হয় ১০০ টাকা কিন্তু প্যাকেটে দেয়া তেলের বাজার দর ৬২ টাকা, লবণের দাম দেখানো হয় ৩৩ টাকা কিন্তু প্যাকেটে দেয়া লবণের বাজার দর ১৫ টাকা, ছোলাবুটের দাম দেখানো হয় ৯০ টাকা কিন্তু প্যাকেটে দেয়া ছোলাবুটের বাজার দর ৬৮ টাকা এবং চিনির দাম দেখানো হয় ৬২ টাকা কিন্তু প্যাকেটে দেয়া চিনির বাজার দর ৫১ টাকা।

হিসাব করে দেখা গেছে, আইআইআরও’ প্রতি প্যাকেট খাদ্যপণ্যের দাম দেখায় ১৪৪৯ টাকা। কিন্তু প্রতি প্যাকেটে পণ্য দিয়েছেন মাত্র ৮৮৭ টাকার পণ্য। হিসেবে প্রতি প্যাকেট থেকে ৫৬২ টাকা মেরে দেয়া হয়েছে। সে হিসাবে ১৫৪২ প্যাকেট থেকে ৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা লোপাট করা হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আশরাফুল আবছার জানান, নিয়ম মতে রোহিঙ্গাদের জন্য সরবরাহ করা সব ধরণের পণ্য তদারকি করা হয়।

সে মতে, আইআইআরও’র অনুমোদন পাওয়া ১৫৪২ প্যাকেট খাদ্যপণ্যও তদারকি করা হয়। এসময় প্যাকেট খুলে দেখা যায়, অনুমোদন আবেদনপত্রে যে মানের পণ্য দেখানো হয় তা প্যাকেটে দেয়া হয়নি। দেয়া হয়েছে অতি নিম্নমানের পণ্য। বিষয়টি অধিকতর যাচাইয়ের জন্য ওই প্যাকেটের প্রতিটি পণ্য বাজারে গিয়ে যাচাই করা হয়। এতে ধরা পড়ে চরম অনিয়ম। কেননা অনুমোদন আবেদনপত্রে উল্লেখ করা মূল্যের সাথে প্যাকেটে দেয়া পণ্যের বাজারমূল্যের বিরাট ব্যবধান।তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ সরবরাহে কোন ধরণের অনিয়ম দুর্নীতি সহ্য করা হবেনা। নেয়া হবে আইনগত ব্যবস্থা।

সুত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইআইআরওর রমজানের খাদ্য সরবরাহ দেওয়ার ঠিকাদারী নেয় আনোয়ার। রোহিঙ্গাদের খাদ্য দেয় কার্যক্রম চালানোর সময় চরম দুর্নীতি করেছে, যা দাদা সংস্থা আইআইআরও অবগত ছিলনা। এই দুর্নীতির মূল হুতা আনোয়ার সিন্ডিকেট ততীয় বার খাদ্য দিতে গিয়ে কক্সবাজার জেলাপ্রসাশনের হাতে তার দুর্নীতি নিয়ে ধরা পড়ে। এতে তার সিন্ডিকেটের সকল দুর্নীতি সৌদি দাতা সংস্থাও অবগত হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অভিযানে এই ভয়ানক দুর্নীতি হাতেনাতে ধরা পড়ায় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছে আইআইআরও কর্তৃপক্ষ।

শেষ হতে দুর্নীতিবাজ সরবরাহকারীকে বাদ দেয়াসহ তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেনের মুঠোফোনে চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি।

ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক রিলিফ অর্গনাইজেশন (আইআইআরও)-এর দেশীয় কর্মকর্তা মাওলানা শফিকুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে বলেন, সৌদি সাহায্য সংস্থা আইআইআরও এই যাবত অনেক খাদ্য দিয়েছে। তাতে কোন অনিয়ম ছিল না। তারা কক্সবাজারের সমতি পাড়া, জোয়ারিয়ানালাসহ অনেক জায়গায় গরিবদের খাদ্য দিয়েছে। তিনি বলেন, কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালেও অনেক সহযোগিতা করেছে। সংস্থাটির কর্মকাণ্ডে কোন ধরনের অনিয়ম তাদের কাজে কোন দুর্নীতি নেই।

আরো বলেন, আইআইআরও এর পিছনে কিছু অসৎ লোক কৌশলে খাদ্য দেওয়ার টিকাদারী নেয়। তারা মূলতঃ এই সনামধন্য সংস্থাটির বদনাম ছড়ানোর জন্য এই খাদ্য কিনে দুর্নীতি শুরু করে। এদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান মাওলানা শফিকুর রহমান। এজন্য তিনি স্থানীয় প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেছেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments