রোজায় যানজট ও তীব্র গরমে অতিষ্ঠ নগরবাসী

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা ঠিক ২টা। কাকরাইল থেকে পুরানা পল্টন যাওয়ার রাস্তাটি কানায় কানায় পূর্ণ। প্রায় আধা ঘণ্টা একই স্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে গাড়িগুলো। কোনও নড়াচড়া নেই। শুধু কাকরাইল-পল্টন সড়কই নয়, পুরো রাজধানীতেই রোজার শুরু থেকেই যানজটে অসহায় জরুরি প্রয়োজনে পথে বের হওয়া নগরবাসী। দুপুর ১২টার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। তার সাথে তীব্র ভ্যাপসা গরম। বিকেলে ৫টার দিকে হাজার হাজার মানুষকে গাড়ি ছেড়ে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে যেতে দেখা গেছে। ইফতারির ঠিক আগ মুহূর্তে রাস্তাঘাট কিছুটা ফাঁকা হলেও যানজট কমেনি। সন্ধ্যার পরে সেই যানজট আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ট্রাফিক পুলিশকেই অসহায় দেখা যায়। স্থবির হয়ে পড়ে গোটা রাস্তার গাড়ি চলাচল। ট্রাফিক পুলিশও তখন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন।

যানজটের শহর হিসেবে বিশ্বে প্রথম স্থানে ঢাকা শহর। শুধু তাই নয়, সময় অপচয় ও ট্রাফিক অদক্ষতা সূচকেও শীর্ষে রয়েছে ঢাকা। গত ফেব্রুয়ারিতে বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নামবিও’র প্রকাশ করা ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্স-২০১৯তে এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৮ ও ২০১৭ সালে যানজটে ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়।

গতকাল শনিবার ছুটির দিন থাকা সত্ত্বেও ইফতারের আগে রাজধানীর শাহবাগ থেকে বিমানবন্দর, গাবতলী থেকে আজিমপুর, মালিবাগ থেকে প্রগতি সরণি, তেজগাঁও থেকে কাকরাইল প্রধান সড়ক ছাড়াও অলিগলিতেও ছড়িয়েছিল গাড়িজট। অনেকে জটে দাঁড়িয়ে থাকা বাস থেকে নেমে পথেই ইফতার সেরে নেন।

রবিবার (১২ মে) ভরদুপুরেও রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোয় যানজটে অবরুদ্ধ ছিল যাত্রীরা। মেট্রো রেল ছাড়াও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং ওয়াসার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সড়কে চলাচলের অংশ কমে যাওয়ায় স্বাভাবিক সময়েই যানজট তীব্র হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা জানান, এর ওপর ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে গাড়ি চলাচল বেড়ে যাওয়ায় অবস্থা আরো বেগতিক হয়েছে।

এ দিকে যানজটে বিকেলের দিকে পরিবহন সঙ্কটও তীব্র আকার ধারণ করে। এ সময় হাজার হাজার মানুষকে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তীব্র যানজটে আটকে পড়ে অনেককে রাস্তায়ই ইফতার সাড়তে হয়।

রোজার শুরু থেকেই রাজধানীতে শুরু হয়েছে তীব্র যানজট। রোজার আগে থেকেই এ আশঙ্কা করা হচ্ছিল। এর মধ্যে গত শুক্রবার যানজট তেমনটা ছিল না। কিন্তু গতকাল শনিবার তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। শনিবার সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মারাত্মক যানজটের সৃষ্টি হয়। সময় যত বাড়তে থাকে যানজটও তত বেড়ে যায়। বেলা ১০টার পর থেকেই যানজট অসহীয় রূপ নেয়। আর ১২টার পর থেকেই কোনো কোনো এলাকা স্থবির হয়ে পড়ে।

দুপুরের পর থেকে তেজগাঁওয়ের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণির দুই পাশ স্থবির হয়ে ছিল। কাকলীর যানজটের প্রভাবে গাড়ির জটলা মহাখালী-নাবিস্কো হয়ে চলে যায় সাতরাস্তা পর্যন্ত। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে গাড়ি বের হওয়ায় চাপ বেড়ে যায়।

সাতরাস্তা এলাকায় একটি বাসে অনেকক্ষণ বসে থেকে বাধ্য হয়েই নেমে হাঁটা শুরু করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সোহেল রানা।

তিনি ব্রেকিংনিউজকে বলেন, যতক্ষণ এখানে বসে থাকব, ততক্ষণে হেঁটেই মহাখালী চলে যাব।

খানাখন্দের কারণে যাত্রাবাড়ি মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তায় সারাদিনই গাড়ির জট লেগে থাকে বলে ব্রেকিংনিউজকে জানান ঢাকা মহানগর (ট্রাফিক) ডেমরা অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ সহকারি কমিশনার মো. আলমগীর হোসেন।

ভুক্তভোগীরা জানান, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, টিকাটুলি, সদরঘাট থেকে গুলিস্তান, মতিঝিল, দৈনিক বাংলা, শাহবাগ, নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, পুরো মিরপুর রোড, সাত মসজিদ রোড, ঝিগাতলা, ধানমন্ডির বিভিন্ন রাস্তা, বাংলামোটর, ফার্মগেট, নাবিস্ক থেকে তেজগাঁও সাত রাস্তা ও মহাখালী থেকে ফার্মগেট, কাকলী থেকে এয়াপোর্টসহ রাজধানীর বেশির ভাগ রাস্তাঘাটই গতকাল অবরুদ্ধ ছিল। পুরান ঢাকার অলিগলি পর্যন্ত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। এমন অনেক এলাকা ছিল যেখানে রাস্তাঘাটে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। বেলা ২টার পর রাজধানীর প্রায় প্রতিটি রাস্তা অচল হয়ে পড়ে। এ সময় রাজধানীর বাংলামোটর সিগন্যালে দেখা যায় ট্রাফিক পুলিশও নিরুপায় দাঁড়িয়ে আছে।

বেসরকারি একটি ব্যাংকে চাকরি করেন আহসান হাবীব। তিনি ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘রমজান উপলক্ষে এমনিতেই অফিসের সময় এগিয়ে নিয়ে এসেছে। আমি সকাল সাড়ে ৭টায় মিরপুর থেকে মতিঝিল যাওয়ার উদ্দেশে রওনা দেই। কিন্তু জ্যামের কারণে অফিসে পৌঁছাতে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভ্যাপসা গরম। সব মিলিয়ে ভীষণ খারাপ অবস্থা।’

শাহবাগ মোড়ে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা সোহেল নামের এক যাত্রী ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘যেমন গরম তেমন জ্যাম। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সব সময়ই জ্যাম লেগে থাকছে। ইফতারের আগ মুহূর্তে জ্যাম কম থাকলেও ইফতারের ঘণ্টাখানেক পর আবার বাড়ে জ্যাম। রোজার আগে থেকেই জ্যাম আর গরম ছিল। তবে এখন রাস্তায় জ্যাম আগের চেয়ে বেড়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়িতে বসে থাকতে হচ্ছে জ্যামের কারণে। তাই এই গরমে হেঁটেই যাচ্ছি। তবে গরমের কারণে কিছুক্ষণ হাঁটলেই ঘেমে খারাপ অবস্থা হয়ে যাচ্ছে।’

রোকসানা আক্তার নামের এক শিক্ষার্থী ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘সিটি কলেজ থেকে বাসে উঠেছিলাম, আধা ঘণ্টা ধরে বাসে বসে থাকার পরেও খুব বেশি দূর এগোতে না পেরে বাধ্য হয়েই এখন হেঁটে যাচ্ছি। রোজা রেখে গরমে হেঁটে যেতে কষ্ট হচ্ছে। তারপরও কি আর করার, কলেজে তো যেতেই হবে।’

জানা গেছে, রোজার মাসে যানজট কমাতে গত ২৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঢাকার ট্রাফিক পুলিশ ও মেট্রো রেল নির্মাণকাজ পরিচালনাকারী ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষের বৈঠক হয়েছে। পরে গত ২৫ এপ্রিল ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার সঙ্গে পরিবহন মালিক, শ্রমিক, বিভিন্ন বিপণিবিতানের প্রতিনিধি ছাড়াও ডিএমটিসিএল ওয়াসা ও ট্রাফিক বিভাগের বিশেষ বৈঠক হয়। গত সোমবার রমজানে যানজট নিরসনে ১৪ নির্দেশনা দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। এসব নির্দেশনার বেশির ভাগই মানছে না চালক ও পথচারীরা।

যেমন ইফতারের আগে বাড়ি ফেরার মনোভাব নিয়ে উল্টো পথে গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকা, ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে গাড়ি চালানো, যানজট যাতে না হয় তা মাথায় রেখে গাড়ি চালানো, হাইড্রোলিক হর্ন ও অননুমোদিত হর্ন ব্যবহার পরিহার, নিয়ম মেনে নির্ধারিত গতিতে গাড়ি চালানো, রাস্তার পাশে যেখানে-সেখানে গাড়ি রেখে রাস্তা সংকীর্ণ করে গাড়ি চলাচলের স্বাভাবিক গতি রোধ থেকে বিরত থাকা, মার্কেট ও শপিং মলের সামনে গাড়ি পার্কিং থেকে বিরত থাকা। তবে এসব নির্দেশনা মানতে দেখা যায়নি সংশ্লিষ্টদের।

আস/এসআইসু

Facebook Comments