রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/আপনাকে তুই বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ/তোর সোনাদানা, বালাখানা সব রাহে লিলস্নাহ দে যাকাত/মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ/ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে/যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ/ রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ….. সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামের এ গানের সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে বিলিয়ে দিতে উন্মুখ ধর্মপ্রাণ মোমিন মুসলমান। এখন প্রতীক্ষা শুধু এক ফালি বাঁকা চাঁদের। আজ সন্ধ্যায় শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে কাল ঈদ। বুধবার সারাদেশে যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল ফিতর। তবে আজ চাঁদ দেখা না গেলে ৩০ রোজা পূর্ণ হবে। ঈদ হবে বৃহস্পতিবার। তবে বুধবার ঈদ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়া সালস্নাম বলেছেন, চাঁদ দেখে রোজা পালন করবে এবং চাঁদ দেখে ঈদ উদযাপন করবে। তিনি বলেছেন, ‘চান্দ্র মাস ২৯ দিনেও হয় আবার ৩০ দিনেও হয়। যদি আকাশে মেঘ থাকায় চাঁদ দেখা না যায় তবে ৩০ দিনের গণনা পূর্ণ করবে।’

তাই আজ সন্ধ্যায় অগণিত মানুষ উৎসুক নয়নে পশ্চিম আকাশে খুঁজবে এক ফালি বাঁকা চাঁদ। তবে ক’দিন ধরে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় এবার খালি চোখে ঈদের চাঁদ দেখার আশা অনেকটা ক্ষীণ। তবে উন্নত প্রযুক্তির যুগে এ নিয়ে দুঃশ্চিন্তার কিছু নেই। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি শাওয়াল মাসের চাঁদ খুঁজতে ব্যবহার করবে সর্বোচ্চ প্রযুক্তি। তবে এরপরও অধীর আগ্রহে সাধারণ মানুষ খালি চোখেই খুঁজবে সে আনন্দের ঝিলিক। কারণ সে দর্শনে আনন্দ যেমন আছে, তেমনি আছে পুণ্যও। চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে এক মাস ধরে সংযম সাধনার ইতি ঘটবে।

ঈদুল ফিতরের দিনটিই শুরু হবে ঈদের নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে। বিভিন্ন ঈদগাহে সে জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। প্রস্তুত রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ প্রাঙ্গণ। এবার গ্রীষ্মকালে হচ্ছে ঈদ। তাই বৃষ্টি বা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া সেখানে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড় হতে পারে। সে জন্য অবশ্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে।

নামাজের পরপরই ঈদগাহগুলোতে চিরচেনা এবং কাঙ্ক্ষিত দৃশ্যের অবতারণা হবে। প্রত্যেক মুসলমান একে অপরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করবেন। শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণ-বয়সনির্বিশেষে হবে সেই আলিঙ্গন। ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের এ এক মধুর বহিঃপ্রকাশ।

এ ঈদের একটি বড় অনুষঙ্গ নতুন পোশাক। মাসজুড়ে বা অনেকে এর আগে থেকেই এর প্রস্তুতি শুরু করেন। এ বছর রাজধানীসহ বিপণিবিতানগুলোতে প্রতিবারের মতোই ভিড় দেখা গেছে। ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ অবশ্য মন্দাভাবের কথা বলেছেন। তারপরও কেনাকাটার যে কমতি ছিল না, রাজধানী বা দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর রাস্তার তীব্র জট বা বিপণিবিতানের কষ্ট-দেয়া ভিড় তার প্রমাণ। নতুন কেনা পোশাক-জুতা বা অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে শিশুদের আনন্দই বেশি। বড়রাও কম যান না। পোশাকগুলো ইতোমধ্যেই হয়তো দেরাজ খুলে অনেকবারই দেখা হয়ে গেছে। ঈদের দিন হবে ভাঁজ ভাঙা।

ঈদ এলে রাজধানী থেকে গ্রামের বাড়ি ফেরার বিষয়টি অনেকেরই ভাবনার বড় অংশজুড়ে থাকে। দুটি কারণে এখানে ভাবনা শব্দটি যোগ হলো। এক, বাস-ট্রেন-লঞ্চ-উড়োজাহাজ; যাতেই যাওয়া হোক না কেন, সেসবের কাঙ্ক্ষিত টিকিট মিলবে কি না, তা নিয়ে একটা ভাবনা থাকে। আরেক ভাবনা হলো বাড়ি ফেরার পথটি কতটা সুগম হবে। চার ঘণ্টার যাত্রা ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা হয়েছে, এমন অভিজ্ঞতা তো কমবেশি অনেকেরই আছে। তবে এবার যাত্রাপথ, অন্তত সড়কপথের যাত্রা অন্যবারের চেয়ে ভালো। তাই এ পথে যাত্রাও অপেক্ষাকৃত স্বস্তিদায়ক হয়েছে। ঘাটগুলোতে কিছু কিছু জায়গায় বাড়তি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ ছিল। তবে নৌযাত্রাপথও ভালো ছিল। ট্রেনে শুরু থেকে শিডিউল বিপর্যয় থাকলেও এ পথে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবে ঈদে বাড়ি ফেরার আনন্দের মুহূর্তে বিষাদের ছায়া ফেলেছে সড়ক পথে।

এদিকে আজ সন্ধ্যায় শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে কাল বুধবার যাতে সারাদেশে যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করা যায় সে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে সবাই। ছোট বড় প্রতিটি ঈদগাহে সামিয়ানা টাঙানোর জন্য আগেই বাঁশ-খুঁটি পুঁতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঈদের কেনাকাটাসহ আনুষঙ্গিক সব প্রস্তুতিও দুপুর গড়ানোর আগেই গুটিয়ে নেবে সর্বস্তরের মানুষ।

‘সেমাইয়ের ঈদ’ নামে প্রচলিত এই ঈদে নানা রকম সেমাইয়ের সঙ্গে থাকবে ফিরনি, পিঠা, পায়েস, পোলাও, কোরমাসহ সুস্বাদু খাবারের আয়োজন। বিশেষ আয়োজন থেকে বাদ যাবে না রোগী, বন্দী বা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত কর্মীরাও। প্রথাগতভাবে রোগীদের জন্য হাসপাতালে, এতিমদের জন্য এতিমখানায় ও বন্দীদের জন্য কারাগারগুলোতে উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা থাকবে। সরকারি শিশুসদন, ছোটমণি নিবাস, সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্র, আশ্রয়কেন্দ্র, বৃদ্ধাশ্রম, ভবঘুরে কল্যাণকেন্দ্র ও দুস্থ কল্যাণকেন্দ্রেও থাকবে খাবার ও বিনোদনের বিশেষ ব্যবস্থা।

ঈদ উপলক্ষে বড় শহর ও রাজধানীর বিনোদনকেন্দ্রগুলোও সাজছে উৎসবের রূপে। রাজধানীতে বনানী থেকে বঙ্গভবন পর্যন্ত প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলো জাতীয় পতাকা এবং বাংলা ও আরবিতে ঈদ মোবারক-খচিত ব্যানার দিয়ে সাজানো হবে। ঈদের দিবাগত রাতে নির্দিষ্ট সরকারি ভবনগুলোতেও আলোকসজ্জা করা হবে।

এদিকে ঈদ উপলক্ষে পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন-বেতারসহ বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিও স্টেশনগুলো ৫ থেকে ৭ দিনের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্র্রচার করবে। দেশের জাতীয় দৈনিক ও সাময়িক পত্রিকাগুলো ইতোমধ্যে ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। নগরীর প্রধান প্রধান সড়কদ্বীপে শোভা পাচ্ছে বাংলা ও আরবিতে ‘ঈদ মোবারক’ খচিত পতাকা। সরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হবে। এতিমখানা, ভবঘুরেকেন্দ্র্র, হাসপাতাল ও কারাগারে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে।

মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সংগতিশীল ডকুমেন্টারি ফিল্ম/চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হবে। ডকুমেন্টরি ফিল্ম তৈরির ক্ষেত্রে অন্যান্য মুসলিম দেশের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি, রীতি ও রেওয়াজকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন আঙ্গিকে নতুন ধারার অনুষ্ঠানমালা তৈরির অগ্রাধিকার দেয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়।

ঈদের দিন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনা টিকেটে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন সকল শিশু পার্কে প্রবেশ এবং বিনোদনের ব্যবস্থা করা হবে।

শিশুদের মধ্যে চকোলেট/চিপস বিতরণের বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কিছু আর্থিক অনুদান প্রদান করবে। ঈদের দিন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনা টিকিটে ঢাকা জাদুঘর, আহসান মঞ্জিল, লালবাগের কেলস্নাসহ দর্শনীয় স্থান প্রবেশ এবং তা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে শিশুদের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

দেশের প্রধান ঈদের জামাত হবে সকাল সাড়ে ৮টায় হাইকোর্টসংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বিদেশি কূটনীতিক, ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এতে অংশ নেবেন। তবে ঈদের দিন বৃদ্ধি হলে সকাল ৯টায় বায়তুল মোকাররমে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর ৩ শতাধিক মসজিদ, মাঠ ও ঈদগাহে ঈদের জামাতের আয়োজন করেছে। সারাদেশের সর্ববৃহৎ ঈদ জামাতটি অনুষ্ঠিত হবে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায়।

এদিকে কোনো ধরনের হামলার আশঙ্কা না থাকলেও এবার জাতীয় ঈদগাহসহ ছোট বড় প্রতিটি ঈদের জামাতের্ যাব-পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। ঈদের জামাত শুরুর আগেও প্রতিটি ঈদগাহে বিশেষ তলস্নাশি অভিযান চালানো হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box