রোগ-বালাই নিয়ে বসবাস

আলোকিত সকাল ডেস্ক

চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। কুতুপালং ও নোয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে, স্বল্প জায়গায় অসংখ্য মানুষ গিজগিজ করে বাস করছে। বৃক্ষ উজাড় হওয়া জনপদের বাতাসে প্রচণ্ড ধুলাবালি। চরম অস্বস্তিকর আবহাওয়ায় এখানকার মানুষ শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, পেটের পীড়াসহ নানা রোগে ভুগছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না। এমন স্বাস্থ্য সংকটের জন্য ক্যাম্পের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশকে দায়ী করছে দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলো।

২০০৯ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করছে মেডিসিন স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ)। সংস্থাটি সীমান্তবিহীন চিকিৎসক দল নামেও পরিচিত। চিকিৎসক দলের সমন্বয়ক জেসিকা পাত্তি খোলা কাগজকে জানান, শরণার্থী ক্যাম্পে রোগ-বালাইয়ের পেছনে প্রধান কারণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। এখানেই মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা।

তিনি বলেন, ‘আশ্রিতরা বাঁশ ও প্লাস্টিকের শিট দিয়ে তৈরি ছোট ঝুপড়িতে বসবাস করে। একই ঘরে পরিবারের অনেক সদস্য একসঙ্গে থাকে। এখানকার মানুষের মধ্যে সচেতনতা, পরিচ্ছনতা বোধের সঙ্গে সঙ্গে সুপেয় পানির তীব্র সংকট রয়েছে।

ডা. জান্নাতুল আন্দালিব মুশফি। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই চিকিৎসক ছয় মাস ধরে কাজ করেন কুতুপালং ক্যাম্পে। তিনি জানান, এখানে জীবাণুবাহিত রোগের প্রকোপ বেশি। ৯৯ ভাগ রোহিঙ্গা চর্মরোগে আক্রান্ত। এসব রোগ-বালাইয়ের জন্য রোহিঙ্গাদের অসচেতনতা ও ক্যাম্পের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দায়ী বলে মনে করেন মুশফি। সম্প্রতি মেডিসিন স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স-র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে রোহিঙ্গারা। রোগের প্রকোপের মধ্যে রয়েছে, শ্বাসতন্ত্রের ওপরের ও নিচের অংশের সংক্রমণ, চর্মরোগ। এছাড়া নানা অজানা কারণে হওয়া জ্বর। সংস্থাটি জানিয়েছে, পরীক্ষাগার না থাকায় জ্বরের কারণ অনুসন্ধান করা খুবই কঠিন।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার মতো সাধারণ অভ্যাস ফাঙ্গাস ও স্ক্যাবিজের মতো অনেক চর্মরোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। কিন্তু শরণার্থী শিবিরে যেখানে পানি অনেক অপ্রতুল, সেখানে সামান্য হাত ধোয়াটাও এত সহজ না।

এমএসএফ প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ এতই অনিশ্চিত যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার বেশিরভাগ মানুষ এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে যা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট। অনেকেই সহিংসতার শিকার হয়েছেন, কিংবা চোখের সামনে সহিংসতা দেখেছেন, ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও বন্ধুদের হারিয়েছেন। তাদের অনেকেই নিজ দেশে নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে চান। কিন্তু এটা বর্তমানে সম্ভব হচ্ছে না। তাই তারা হতাশায় জর্জরিত এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।

জেসিকা পাত্তি খোলা কাগজকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসা ও মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা এখনো অপ্রতুল। যখন আমরা এমন কোনো রোগী দেখি যার এ রকম দীর্ঘস্থায়ী রোগের জন্য চিকিৎসা প্রয়োজন, আমরা প্রথমে তাকে প্রাথমিক সেবা দিয়ে স্ট্যাবিলাইজ করি। পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য অন্য কোনো চিকিৎসা কেন্দ্রে রেফার করি।’

বর্তমানে সংস্থাটি রোহিঙ্গাদের সহিংসতাজনিত ঘটনার জন্যও চিকিৎসা প্রদান করছে। এদের অনেকেই যৌন সহিংসতার শিকার। এমএসএফ জানিয়েছে, ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে যৌন সহিংসতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোকাস হিসেবে আছে। ক্লিনিকগুলোতে অনেক নারী আসেন বহুদিনের উপেক্ষিত যৌনরোগের সংক্রমণ নিয়ে।

রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা সিভিল সার্জন আবদুল মতিন খোলা কাগজকে বলেন, অল্প জায়গায় অনেক মানুষ তো, তাই কোনো রোগ হলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা অনেক বেশি। তিনি বলেন, সরকারের আন্তরিকতায় রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য সংকট নিয়ন্ত্রণে আছে।

রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য সংকটের কারণে স্থানীয়রা কতটা ঝুঁকিতে আছে জানতে চাইলে আবদুল মতিন বলেন, স্থানীয়রা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন এটা সত্য। তবে বড় বিপর্যয় হতে পারে আমরা এমনটা মনে করি না।

আস/এসআইসুজন

Facebook Comments Box