রূপপুর প্রকল্পে বেঁকে বসলো মন্ত্রণালয়

আলোকিত সকাল ডেস্ক

আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এ প্রকল্পে আর্থিক হরিলুটের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এর ফলে দুর্নীতির কারণে নড়েচড়ে বসেছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

২০১৭ সালের নভেম্বরে এর মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়। যদিও প্রকল্পটির ব্যয় নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। সম্প্রতি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের আসবাবপত্র কেনা ও ফ্ল্যাটে তোলায় হরিলুটের চিত্র গণমাধ্যমে উঠে আসে। বিশিষ্টজনেরা বিষয়টিকে ইতিহাসের বিশ্ব রেকর্ড বলে আখ্যায়িত করেছেন।

এদিকে আবাসন খাতে আর্থিক লুটপাটের বিষয় উঠে আশায় স্থানীয় ঠিকাদারি বিল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। গতকাল গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আমার সংবাদকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে আলাদা আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের লেনদেন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটি প্রকল্পের ১১০ ফ্ল্যাটের জন্য ‘স্বাধীন কনস্ট্রাকশন’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের কাজ দেয়া হয়। ফ্ল্যাটের জন্য বিভিন্ন জিনিসপত্র কিনতে আর ফ্ল্যাটে তা তুলতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যে খরচ দেখিয়েছে, তা বিশ্ব রেকর্ড করার মতো বলে অনেকেরই অভিমত।

এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, প্রতিটি বালিশ কেনায় খরচ পড়েছে পাঁচ হাজার ৯৫৭ টাকা। আর প্রতিটি বালিশ ফ্ল্যাটে ওঠাতে খরচ হয়েছে ৭৬০ টাকা। প্রতিটি বিছানা কেনায় ব্যয় দেখানো হয়েছে পাঁচ হাজার ৯৮৬ টাকা। আর ওঠানোর ব্যয় দেখানো হয়েছে ৯৩১ টাকা।

চাদর ও বালিশ কেনা হয়েছে ৩৩০টি করে। খাট প্রতি কেনায় খরচ হয়েছে ৪৩ হাজার ৩৫৭ টাকা। আর ওঠানোর ব্যয় ১০ হাজার ৭৭৩ টাকা। খাট কেনা হয়েছে ১১০টি।

একটি বৈদ্যুতিক চুলা কেনার খরচ পড়েছে সাত হাজার ৭৪৭ টাকা। আর ওই চুলা ওঠাতে ব্যয় হয়েছে ছয় হাজার ৬৫০ টাকা। প্রতিটি বৈদ্যুতিক কেটলি কিনতে খরচ দেখানো হয়েছে পাঁচ হাজার ৩১৩ টাকা, আর ওঠানোর খরচ দুই হাজার ৯৪৫ টাকা।

রুম পরিষ্কারের একটি মেশিন কিনতে সংশ্লিষ্টরা খরচ দেখিয়েছেন ১২ হাজার ১৮ টাকা, আর ওঠাতে খরচ দেখিয়েছেন ছয় হাজার ৬৫০ টাকা। প্রতিটি ইলেকট্রিক আয়রন কিনতে খরচ পড়েছে চার হাজার ১৫৪ টাকা, আর ওঠানোর খরচ দুই হাজার ৯৪৫ টাকা। টেলিভিশন প্রতিটির দাম ৮৬ হাজার ৯৬০ টাকা, আর ওঠানোর খরচ সাত হাজার ৬৩৮ টাকা।

টেলিভিশন কেনা হয়েছে ১১০টি। সেগুলো রাখার জন্য আবার কেবিনেট ক্রয় করা হয়েছে ৫২ হাজার ৩৭৮ টাকা করে। ফ্রিজের দাম দেখানো হয়েছে প্রতিটি ৯৪ হাজার ২৫০ টাকা, আর ওঠাতে খরচ পড়েছে ১২ হাজার ৫২১ টাকা। ওয়ারড্রোব প্রতিটি কেনায় খরচ দেখানো হয়েছে ৫৯ হাজার ৮৫৮ টাকা। ওঠাতে খরচ পড়েছে ১৭ হাজার ৪৯৯ টাকা।

মাইক্রোওয়েভ প্রতিটি কেনায় ব্যয় ৩৮ হাজার ২৭৪ টাকা। খরচ হয়েছে ছয় হাজার ৮৪০ টাকা। প্রতিটি সোফা কেনা হয়েছে ৭৪ হাজার ৫০৯ টাকায়, ভবনে ওঠাতে খরচ হয়েছে ২৪ হাজার ২৪৪ টাকা করে।

১৪ হাজার ৫৬১ টাকা করে কেনা সেন্টার টেবিলের প্রত্যেকটি ভবনে তুলতে লেগেছে দুই হাজার ৪৮৯ টাকা। ছয়টি চেয়ারসহ ডাইনিং টেবিলের প্রতিটি সেট কেনা হয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ৬৭৪ টাকায়। ভবনে তুলতে লেগেছে ২১ হাজার ৩৭৫ টাকা করে।

এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার আগেই এসব কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তাই খোঁজখবর না নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। যদি কোনো সমস্যা থাকে, তা তদন্ত করে দেখা হবে।

এদিকে রূপপুর প্রকল্পের আর্থিক অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রীতিমতো ট্রল শুরু হয়েছে। রুহুল আমিন নামে এক গণমাধ্যমকর্মী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন-
আর কত সহ্য করবে হে প্রিয় বাংলাদেশ? রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটি প্রকল্পে দুর্নীতির যে মহোৎসবের চিত্র বেরিয়ে এসেছে, তার আজ তদন্ত ও কঠিন পদক্ষেপ দরকার। সেখানে বিভিন্ন ফ্ল্যাটে একটি বালিশ কিনতে খরচ পড়েছে পাঁচ হাজার ৯৫৭ টাকা, আর একটি বালিশ ফ্ল্যাটে ওঠাতে খরচ পড়েছে ৭৬০ টাকা।

একেকটি বিছানার দাম পড়েছে পাঁচ হাজার ৯৮৬ টাকা, আর সেটা ওঠাতে খরচ হয়েছে ৯৩১ টাকা। …এমন হরিলুট ইতিহাসে নজিরবিহীন। প্রতিটি জিনিস কেনায় ও ওঠানোতে যে ব্যয় হয়েছে, তার তালিকা অনেক দীর্ঘ।

এতটা লিখে শেষ করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সব খানে মানুষ বলাবলি করছেন- ‘বিসিএস দেবো না, ডাক্তারও হবো না, ব্যবসাও করব না। রূপপুর গিয়ে বালিশ ওঠাব।’ এই নির্লজ্জ হরিলুটের চিত্র শুধু কি রূপপুরে, না সারা দেশে? শুধু কি গণপূর্ত বিভাগে, নাকি সব বিভাগে? এটা খতিয়ে দেখতে দুদকের কি সৎ সাহসী লোকবল আছে?

প্রসঙ্গত, দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটি প্রকল্পে ২০ ও ১৬ তলা ভবনের ১১০টি ফ্ল্যাটের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনা এবং ভবনে ওঠানোর কাজে অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে।

বালিশ ও আসবাবপত্র দুর্নীতি নিয়ে হাইকোর্টে রিট : রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে দুর্নীতি নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন গতকাল হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিটটি দায়ের করেন।

পরে সায়েদুল হক সুমন সাংবাদিকদের জানান, সোমবার বিচারপতি তারিকুল হাকিম ও বিচারপতি সোহাওয়ার্দীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে রিটটির শুনানি হতে পারে। তিনি বলেন, পত্রপত্রিকায় আমরা দেখেছি কেনাকাটায় যে অস্বাভাবিক মূল্য ধরা হয়েছে, সেই বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। সেই কমিটির প্রতি জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।

তাই আমরা বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়েছি। ব্যারিস্টার সুমন বলেন, প্রত্যেক কাজের একটা জবাবদিহিতা থাকা দরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও দুর্নীতির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছেন।

তিনি বলেন, এই প্রকল্পে যে টাকা খরচ দেখানো হয়েছে- তা এ দেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকা। তাই বিষয়টি জবাবদিহিতায় আসা উচিত।

রিটে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সচিবসহ ছয়জনকে বিবাদি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটি প্রকল্পের ১১০ ফ্ল্যাটের জন্য অস্বাভাবিক মূল্যে আসবাবপত্র কেনা ও ভবনে ওঠানোর ঘটনা অনুসন্ধানে নামছে দুদক।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে এ ঘটনা তদন্তের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমার জন্য সময় বেঁধে দেয়া হবে।

মন্ত্রণালয়ের তদন্তে দুর্নীতি প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তদন্ত প্রতিবেদন দুদককে দেয়া হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments