রিফাতের পরিবারে সন্দেহ ঢুকিয়েছে পুলিশই

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বরগুনায় আলোচিত শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী ধরনের পরিকল্পনা এবং ষড়যন্ত্র ছিল তা এখনো বুঝতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা, মা ও বোন। প্রায় দুই বছর ধরে রিফাতের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের পর আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির আচরণে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ঘরের বউ করেন তাঁরা। মিন্নির মধ্যে খারাপ কোনো কিছু দেখেননি, আর রিফাতের সঙ্গে তাঁর কোনো বিরোধও চোখে পড়েনি তাঁদের। এ কারণে রিফাত খুনের পর মিন্নিকে সন্দেহের চোখে দেখেননি তাঁরা। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ঘটনার দ্বিতীয় ভিডিও এবং মিন্নির বিরুদ্ধে একটি পক্ষের প্রচারের কারণে তাঁদের সন্দেহ হয়। এরপর মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ডের সঙ্গে কথিত বিয়ের বিষয়টি প্রচারে আসায় মিন্নির প্রতি তাঁদের বিরূপ ধারণা জন্মে। একপর্যায়ে পুলিশ নয়নের সঙ্গে মিন্নির সম্পর্ক এবং হত্যায় জড়িত থাকার পক্ষে কিছু ‘তথ্য’ রিফাতের স্বজনদের দেখায়। এরপরই মিন্নির গ্রেপ্তার চেয়েছেন বলে জানান তাঁরা।

পরিবারের একমাত্র ছেলে রিফাতকে হারিয়ে শোকে কাতর তাঁর মা ডেইজি বেগম, বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ ও একমাত্র বোন ইসরাত জাহান মৌর সঙ্গে গত বুধবার এ প্রতিবেদকের কথা হয়।

গত ২৬ জুন সকালে রিফাত শরীফকে বরগুনা সরকারি কলেজ এলাকায় শত শত মানুষের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই দিনই ঘটনার একটি ভিডিও ভাইরাল হলে সারা দেশে ব্যাপক আলোচিত হয়। রিফাতের বাবা ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরো চার-পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন। এতে এক নম্বর সাক্ষী করা হয় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মিন্নিকে। এর মধ্যে প্রধান আসামি নয়ন বন্ড গত ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। গত ১৩ জুলাই রিফাতের বাবা পুত্রবধূর গ্রেপ্তার দাবি করলে আলোচনা নতুন মোড় নেয়। পরদিন একই দাবিতে মানববন্ধন হয়, যেখানে বক্তব্য দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে সুনাম দেবনাথ। এরপর মিন্নিকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ডের তিন দিনের মাথায় মিন্নিকে আদালতে হাজির করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়। ঘটনার ধারাবাহিকতায় এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মিন্নিকে সাক্ষী থেকে আসামি করার বিষয়টি ‘শম্ভুবাবুর খেলা’ বলে দাবি করেন মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হক কিশোর। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর মেয়েকে নির্যাতন করে পুলিশ তাদের শিখিয়ে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী আদালতে জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে।

রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি কখনো এককভাবে মিন্নির বিচার চাইনি। আমার ছেলের খুনের পেছনে যারা আছে তাদের সবারই বিচার চাই। যারা কুপিয়ে মারল—এই গ্যাংয়ের পেছনে বা হত্যাকারীদের পেছনে আরো লোক থাকতে পারে। সবই বের হওয়া দরকার।’ তিনি আরো বলেন, ‘এমন ঘটনা ঘটতে পারে হত্যাকাণ্ডের আগে তার কোনো আলামত জানতে পারিনি। পরে একটার পর একটা বিষয় সামনে আসে। যেটা দেখছি আমরা সেটাই বলছি। তদন্তকারীরা এসব দেখবে।’

বরগুনা সদরের বুড়িরচর ইউনিয়নের বড় লবণগোলা গ্রামে রিফাতদের বাড়িতে কথা হয় তাঁর মা ডেইজি বেগমের সঙ্গে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এখন শুনতাছি মিন্নিই মোর ছেলেরে মারাইছে! এইটা কেন? ক্যামনে—তা বুঝতাছি না।’ তিনি জানান, ঘটনার আগে টানা দশ দিন রিফাত শ্বশুরবাড়িতে (মিন্নিদের বাড়ি) ছিল। আগের দিন ২৫ জুন বাড়িতে ছিল। তখন কোনো সমস্যার কথা বলেনি রিফাত।

পুত্রবধূ প্রসঙ্গে ডেইজি বেগম বলেন, ‘মিন্নিকে ছাড়া আমি কিছুই বুঝতাম না। বিয়ের আগে বাড়ি আসত। বিয়ের পরেও আসত। তবে রাতে থাকত না কখনো। নয়নের লগে বিয়ের বিষয়ে কোনো কিছুই আগে টের পাইনি। রিফাতও টের পায়নি।’

নয়নের সঙ্গে মিন্নির কথিত বিয়ে নিয়ে ইসরাত জাহান মৌ জানান, রিফাত যদি বিষয়টি জানতেন তাহলে বিয়ে করতেন না। তাঁর ভাই ও ভাবির মধ্যে আগে থেকে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। দুজনের মধ্যে ছোটখাটো বিষয়ে মান-অভিমান হতো জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘দেখতাম আবার সব ঠিক হয়ে গেছে।’

বরগুনা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে সেখানেই স্নাতক (অনার্স) শ্রেণিতে পড়েন মৌ। ওই কলেজেরই স্নাতক (পাস) শ্রেণির ছাত্রী মিন্নি। কলেজের সামনে রিফাতের ওপর হামলা হয়। মৌ বলেন, ‘কলেজে কখনো কিছু দেখিনি। শুনিও নাই। ভাইয়াই তাকে (মিন্নি) কলেজে দিয়ে আসত এবং পরে নিয়ে আসত। এখন শুনতেছি দিয়ে আসার পরে নাকি সে নয়নের কাছে যেত।’

মিন্নির একাধিক ফোন ও নয়নের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যাপারে আগে কখনোই কিছু জানা ছিল না বলে জানান রিফাতের মা ও বোন।

আদালতে দেওয়া মিন্নির জবানবন্দির বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, হেলাল নামে একজনের মোবাইল ফোন নিয়ে বিরোধ হয় রিফাত ও মিন্নির। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মৌ বলেন, ‘না এমন কিছু শুনিনি।’

হামলার ঘটনার আগে রিফাতের সঙ্গে মিন্নির না যাওয়ার বিষয়টি হত্যা পরিকল্পনার অংশ বলে দাবি করছে একটি মহল। তবে মিন্নি ও তাঁর বাবা দাবি করেছেন, রিফাত কলেজে গিয়ে দুষ্টামির ছলে মিন্নিকে বলেন যে গেটে তাঁর শ্বশুর (রিফাতের বাবা) এসেছেন। তাঁদের মোবাইল ফোন সেট কিনে দেবেন। মিন্নি বের হয়ে শ্বশুরকে না দেখে রাগ করে আবার কলেজে ভেতর ফিরে যাচ্ছিলেন। তখন রিফাত হেসে দিয়ে মিন্নিকে বাইরে রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে বলেন। কিন্তু মিন্নি পরীক্ষার রুটিন না নিয়ে বের হবেন না জানিয়ে চলে যান। এ নিয়ে নিজেদের সন্দেহের কথা জানিয়েছেন রিফাতের মা ও বোন। তাঁরা বলছেন, ক্লোজড সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে মিন্নি ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে চলে গেছেন। তবে তাঁকে কোনো কথা বলতে দেখা যায়নি। আইনের লোক এ ভিডিও প্রকাশ করেছে। তারাই এটা সঠিক কি না প্রমাণ করবে।

রিফাতের স্বজনরা বলছেন, রিফাতের সঙ্গে মিন্নি না থাকলে চলে যেতে পারতেন নয়নের কাছে। কিন্তু সেটা না করে কেন এমন খুনের পরিকল্পনা করবেন সেটা তাঁদেরও মাথায় আসছে না।

রিফাত শরীফের সঙ্গে বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রীর কথা-কাটাকাটির ঘটনার কারণে রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীর আক্রোশের বিষয়টিও আগে জানত না বলে দাবি করেছে রিফাতের পরিবার।

আস/এসআইসু

Facebook Comments