রিচার্জড হতে ব্রিস্টলে বাংলাদেশ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

কার্ডিফের সিটি সেন্টার ঘেঁষেই আরব অধ্যুষিত এলাকাটা। সেখানকার লেবানিজ, পাকিস্তানি আর টার্কিশ রেস্টুরেন্টগুলোতেই এশীয় দলগুলোর ক্রিকেটারদের ডিনারের সময় দেখা মেলে বেশি। পরশু ইংল্যান্ড ‘বিপর্যয়ে’র পর যেমন দেখা মিলল বাংলাদেশ দলের কয়েকজনের। বিপর্যয় বলা এ কারণেই যে শক্তিধর ইংল্যান্ডের কাছে ১০৬ রানে হারের ধাক্কায় তামিম ইকবাল, মুস্তাফিজুর রহমানদের চোখে-মুখে বিপন্নতার ছায়া যে!

টিম ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে যেন কোনো পরিস্থিতিতেই সরকারি সংবাদ সম্মেলনের বাইরে একটি বিবৃতিও না দেন ক্রিকেটাররা। তাই ক্রিকেটারদের সঙ্গে সামান্য কুশল বিনিময়ও এখন মহার্ঘ বিশ্বকাপের বাজারে। তবে ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সেই ‘কারফিউ’র আওতামুক্ত। ডিনারের পর তিনি বললেন, ‘সব ঠিক আছে। ইংল্যান্ড বিপজ্জনক দল, এটা তো আমরা জানতামই। তাই হারটা অপ্রত্যাশিত নয়। সামনে আরো ম্যাচ আছে। ইনশাআল্লাহ, দল ভালো করবে।’

ক্রিকেটে দায়িত্বশীলদের এটা-ওটা বলে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। তবে এক টেবিল পরে প্লেটে মুখ গুঁজে থাকা তামিম, মুস্তাফিজ কিংবা মোহাম্মদ মিঠুনকে দেখে পরিষ্কার পড়ে নেওয়া যায় যে তাঁরা কেউ ভালো নেই। মাহমুদ নিজে তো বিশেষ ভালো নেই, ‘দুঃখ লাগছে কী জানেন, ছেলেরাও জানে যে এর চেয়ে ভালো ক্রিকেট তারা খেলতে পারে। কিন্তু আজ (গত পরশু) কী খেললাম আমরা? বোলিং-ফিল্ডিং ভালো হয়নি। এরপর ব্যাটিংটাও ভালো হয়েছে—বলা যাবে না। দক্ষিণ আফ্রিকা এমনকি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও যে স্পিরিট দেখা গেছে, সেটা অনুপস্থিত ছিল।’

শরীরী ভাষার এ অসহায়ত্ব কি নিউজিল্যান্ড ম্যাচে হারের ধাক্কার কারণে? মাহমুদ নিশ্চিত নন, ‘সেটাই বা হবে কেন? অল্প রান করেও নিউজিল্যান্ড ম্যাচ প্রায় জিতেই গিয়েছিলাম। সেটাও তো ইতিবাচক। হতাশ হওয়ার কিছু নেই। জানি না আসলে কেন এমন হলো।’

ম্যাচের পর সাকিব অবশ্য এক লহমায় হারের কারণ জানিয়েছেন, ‘অবশ্যই হতাশ। বিশেষ করে আমাদের বোলিং নিয়ে। আগের দুই ম্যাচে আমরা দারুণ বোলিং করেছিলাম। তাতে ইংল্যান্ড ম্যাচেও ভালো বোলিংয়ের প্রত্যাশা ছিল। এটা ঠিক যে ইংলিশরাও খুব ভালো ব্যাটিং করেছে। ওপেনাররা দারুণ শুরুর পর বাটলার যে ব্যাটিংটা করেছে, আমার কাছে ওটাই ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট।’

ইংলিশদের ব্যাটিং তাণ্ডবের পথ অবশ্য তৈরি করেছেন বাংলাদেশের বোলার-ফিল্ডাররা মিলে। নিজেদের পালায় ১৪ ওভারে অন্যূন ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১৯ রান পর্যন্ত তুলেছে ইংল্যান্ড। তাতেই তো দফারফা অবস্থা বাংলাদেশের! ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা যে জোনে বল পেলেই মারেন, সেখানেই বল করে গেছেন বোলাররা। ম্যাচের পর পিচ ম্যাপে সেটি দেখানোও হয়েছে মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিনদের। তার ওপর বোলারদের ব্যর্থতার পাল্লা ভারী করেছেন ফিল্ডাররাও। আউটফিল্ডে কখনোই নিউজিল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকার মতো তুখোড় নয় বাংলাদেশ। তবে আর দশটা দিনের মতো ফিল্ডিংও কার্ডিফের ম্যাচে করতে পারেননি ফিল্ডাররা।

কেন? এই কেন-এর উত্তর কারো কাছে মেলেনি। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা দলের ভেতরও সেভাবে হয়নি। বাংলাদেশের ইংলিশ কোচ শুধু নিপাট ভদ্রলোকই নন, পেশাদারও। তাই তিনি সম্ভবত মনে করেন যে ক্রিকেটাররাও পেশাদারি দিয়ে জেনে নেবে কার কী করণীয়। শিষ্যরা যখন নিজে থেকেই জেনে নেয়, তখন শিক্ষকের করণীয় খুব বেশি কিছু থাকে কি? প্র্যাকটিসের শিডিউল বাড়িয়ে দেওয়া ছাড়া স্টিভ রোডসেরও হয়তো আর কিছু করার নেই!

এত বড় হারের পরও বকাঝকা যিনি দেনটেন না, তাঁকে তো ক্রিকেটারদের খুবই পছন্দ হওয়ার কথা। কিন্তু শুনছি উল্টোটা। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের ভেন্যু সম্পর্কে কোচের অভিমত ধর্তব্যে নিয়ে তিনবারই ধোঁকা খেয়েছেন ক্রিকেটাররা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওভালের উইকেট একটু ধীরগতির হবে, মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন ক্রিকেটাররা। এ উইকেটেই যে ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচটা হয়েছিল। কিন্তু কোচ খোঁজ নিয়ে জানান যে উইকেটে ঘাস আছে, নিচে ময়শ্চারও আছে। তাই টস জিতলে ফিল্ডিংয়েই নামতেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। ভাগ্য ভালো যে সেদিন টস জিতেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা!

ওভালের দ্বিতীয় ম্যাচের আগে কোচ পূর্বাভাস দিয়েছিলেন এ উইকেটে রান আছে। তাই ৩২৫-৩৩০ করতেই হবে। সে মতে ছুটে ২৪৪ রানে আটকে পড়ে বাংলাদেশ দল। পরশু ব্যাটিং নেওয়ার পেছনেও সেই উইকেট সম্পর্কে ভুল পূর্বাভাস, বল সুইং করবে। যদিও টসের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এককভাবে কোচ কিংবা অধিনায়কের নয়। তবে রোডস যেহেতু ইংল্যান্ডে খেলে বেড়ে উঠে এখন কোচের চাকরি করছেন, সেহেতু তাঁর অভিমত অগ্রাধিকার পাচ্ছে। আর বিসিবিও তো তাঁকে চাকরি দিয়েছিল ইংল্যান্ড কন্ডিশন সম্পর্কে বাড়তি ‘ইনপুট’ দিতে পারবেন বলে!

যাক, টুর্নামেন্টের মাঝপথে সব ভুলভ্রান্তি নিয়ে গবেষণায় সুফল মেলার কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং যা আবহ দেখা যাচ্ছে, তাতে ভুলগুলো নিজ উদ্যোগেই শুধরে নিতে হবে ক্রিকেটারদের। বিশ্বকাপজনিত চাপ থেকে মুক্তির পথ খুঁজে নিতে হবে তামিম ইকবালকে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওই রকম ব্যাটিং যে টিম গেমের সহায়ক নয়, সেটি এত দিনে না বুঝতে পারার কথা নয় মাহমুদ উল্লাহর মতো সিনিয়র ক্রিকেটারের। সব জেনে-বুঝেও প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানের পছন্দের জোনে বল ফেললে কী হবে, সেটিও অজানা নয় বোলারদের। ফিল্ডাররাও জানেন তাঁদের শরীরী ভাষার মূল্য অনেক। দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড ম্যাচেই সেসব দেখা গিয়েছিল।

আগামীকাল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে বিশ্বকাপ শুরুর মেজাজটা ফিরবে তো বাংলাদেশ দলে? এক হারেই তো জামানত বাজেয়াপ্ত হয়নি মাশরাফি বিন মর্তুজাদের। এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ খোলা আছে বাংলাদেশের সামনে। তবে বিশ্বকাপের অঙ্ক বলছে, শ্রীলঙ্কা ম্যাচটা মাশরাফিদের জন্য পাওয়ার ব্যাংক, রিচার্জড হতেই হবে যে! গতকাল দুপুরেই দল এসে পড়েছে ব্রিস্টলে, যেখানে ২০১০ সালে ইংল্যান্ডকে প্রথমবারের মতো ওয়ানডেতে হারিয়েছিল বাংলাদেশ।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box