রাজধানী উন্নয়নেও মরণফাঁদ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বর্তমান সরকারের অধিনেই হচ্ছে রাজধানী ঢাকার সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন। একের পর এক প্রকল্প ও কর্মকৌশলে এগিয়ে যাচ্ছে রাস্তা সংস্কার ও উন্নয়নের কাজ। বিশেষ করে মেট্রোরেলের উন্নয়নকাজ চলছে মহানগর জুড়ে।

মেট্রোরেলের কাজের জন্য রাজধানীর মূল সড়কগুলোর অধিকাংশ স্থানে গর্ত তৈরি করা হয়েছে। একদিকে রাস্তা সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি অন্যদিকে প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টি। বৃষ্টির ফলে সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর সড়কগুলো বিভিন্ন এলাকাতে তৈরি হচ্ছে মরণ ফাঁদ।

জানা যায়, রাজধানী ঢাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে দ্রুত এগিয়ে চলছে মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, র‌্যাপিড ট্রানজিট বাস সার্ভিস প্রকল্পের কাজ।এই তিন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থা একদিকে যেমন সহজ হবে, অন্যদিকে দুঃসহ যানজট থেকেও নগরবাসী মুক্তি পাবে।

বদলে যাবে রাজধানীর সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা। কিন্তু এসব উন্নয়নকাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করতে পারছেন না কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন কারণে কাজগুলোতে দেখা দিয়েছে ধীরগতি।গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সকাল ১০টা থেকে টানা বৃষ্টিতে ভেসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা।

বৃষ্টির পানিতে ভেসে যায় নগরীর রাস্তা ও এলাকা। জলাবদ্ধতার পর যে সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করেছে সেটি হলো— সড়কের বিদ্ধস্ত অবস্থা। নগরীর সবকটি প্রধান ও উপ-সড়কের অবস্থা খুবই শোচনীয়। অতিবৃষ্টির কারণে সড়কগুলোর মরণদশা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বৃষ্টি পানিতে ব্যাপক ক্ষতিতে জনদুর্ভোগের মাধ্যমে নগরবাসীকে যে সমস্যা ভুগতে হচ্ছে তা হলো সড়কের বিড়ম্বনা। নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তরিক নয়। কারণ ‘জলাবদ্ধতাকে পুঁজি করে বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হয় আর লোপাটের সুযোগ নেয়। নতুন প্রকল্প গ্রহণের পর জলাবদ্ধতা আরও বাড়ে।

‘বর্ষায় ঢাকায় জলাবদ্ধতা থাকবে না’— ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর ‘মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।

কিন্তু নগরবাসী সেই আশার অপেক্ষায় থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এর উল্টো চিত্র। উন্নয়নের নামে সংস্কার কাজের ধীরগতি থাকায় গত বছরের তুলনায় এবার খানাখন্দের মাত্রা বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে জনদুর্ভোগ ও যানজট।

গতকাল বৃহস্পতিবার বৃষ্টিতে বরাবরের মতো জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোড, চকবাজার রোড (কারা অধিদপ্তরের সামনের অংশ), উমেশ দত্ত রোডসহ বিভিন্ন সড়ক।

ডুবে থাকতে দেখা যায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ২ নাম্বার গেট, পানি নিষ্কাশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ঢাকা ওয়াসার সামনের সড়ক, কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার, এফডিসি ও পেট্রোবাংলার সামনের সড়ক এবং সোনারগাঁও হোটেলের মোড় এলাকা। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয় রাজধানীর বেহাল সড়ক।

জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এ. কে. এম. মমিনুল হক সাঈদ আমার সংবাদকে বলেন, ডিএসসিসির আওতাধীন এলাকার ড্রেন ও রাস্তাঘাট নির্মাণে জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব না থাকায় জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হচ্ছে না।

কারণ একজন প্রতিনিধিই জানেন তার এলাকায় কোথায় কোথায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। কীভাবে নিরসন করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে জনগণের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। পলিথিন ও শক্ত ময়লা-আবর্জনা ড্রেন ও রাস্তাঘাটে না ফেলে ডাস্টবিনে ফেলতে পারেন। কিন্তু সেটি করা হচ্ছে না। প্রতিনিয়ত পলিথিন রাস্তায় ফেলায় সেটি ড্রেনে চলে যাচ্ছে। পলিথিন পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে।

এতে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। শতাব্দী ট্রান্সপোর্ট লিমিটেডের একটি বাস থেকে বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে কারওয়ান বাজারে নামেন আক্তারুজ্জামান নামের এক যাত্রী।

তিনি বলেন, পুরো সড়কেই যানজট। কামারপাড়া থেকে কারওয়ান বাজার পৌঁছতে ৪ ঘণ্টা সময় লেগেছে। বিজয় সরণির সিগন্যালেই প্রায় আধাঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়েছে। গুলিস্তান ও ধানমন্ডি সড়কে কোমরপানি জমে। ফুটপাতেও ছিল হাঁটুপানি।

এতে অনেক দোকানপাট ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে যায়। ইঞ্জিনে পানি ঢুকে কয়েকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল বন্ধ হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। রায়না আফরোজ নামে এক শিক্ষিকা জানান, বৃহস্পতিবার সপ্তাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মদিবস। চাইলেও কেউ ঘরে থাকতে পারে না।

মৌচাক থেকে আবুল হোটেলের সড়কের একপাশে সামান্য পানি জমেছে। অথচ বাসে ২০০ মিটারের এ সড়ক পার হতে সময় লাগলো ৪০ মিনিট। রামপুরা থেকে আবুল হোটেলের সড়কেও একই অবস্থা।

রাজধানীর মিরপুর-১, ৬ ও ১০ নম্বর আল-হেলাল হাসপাতালের পাশের সড়ক, মিরপুর ১২ ও ১৩ নম্বর, কালশী রোড, পূরবী, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মেইন গেট থেকে ডি-ব্লক পর্যন্ত এবং ধানমন্ডির সড়কগুলোতে বৃষ্টির পানি জমে আছে।

এছাড়াও পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোড, সাতরাওজা, নাজিরা বাজার, বংশালসহ বিভিন্ন সড়কেও পানি জমেছে। এদিকে সড়কে জলজটের কারণে যানজটে পড়েছে রাজধানীবাসী। রাজধানীর মতিঝিল, গুলিস্তান, জিরো পয়েন্ট, বাংলা একাডেমি, শাহবাগ, মিন্টু রোড, হাতিরঝিল, গুলশান-১, মহাখালী, মালিবাগ রেলগেট থেকে আবুল হোটেল, নীলখেত থেকে গাবতলী ও মিরপুরে প্রচণ্ডযানজট দেখা গেছে।

সিগন্যাল ছাড়াও বিভিন্ন সড়কের মোড়ে কমপক্ষে ১৫ মিনিট থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বসে থাকতে হচ্ছে অফিস ও স্কুলগামীদের। ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে গত একবছরে আড়াইশ কিলোমিটার নালা তৈরির কথা জানিয়েছে ডিএনসিসি।

আর বিশেষ কার্যক্রম হিসেবে শান্তিনগর এলাকায় ১১ দশমিক ৭২ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ করেছে ডিএসসিসি। এছাড়া নাজিমুদ্দিন রোডসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে এসব ড্রেনের পানি যে খালে গিয়ে পড়ে, সেসব খাল উদ্ধার বা পরিষ্কারের কাজ এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি।

প্রসঙ্গত, রাজধানীর এ জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব নিয়ে ওয়াসা এবং সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে আছে রশি টানাটানি। ১৯৮৯ সালে ওয়াসাকে পানি নিষ্কাশনের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি এ কাজে যুক্ত হয় ঢাকা সিটি কর্পোরেশনসহ আরও কয়েকটি সংস্থা।

ওয়াসা ২০১৪ সালের আগস্টে স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, জলাবদ্ধতার দায় ওয়াসা নেবে না। কারণ, পানি নিষ্কাশনের কাজ ঢাকা ওয়াসার ওপর ন্যস্ত করা হলেও ওয়াসার চেয়ে সিটি কর্পোরেশনের পাইপলাইনের সংখ্যা বেশি। বার্ষিক ক্লিনিংয়ের ব্যাপারেও দুটি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নেই। এজন্য সামান্য বৃষ্টিতেই জলজট দেখা দেয়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box