রাজধানীর অন্যরূপ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ঈদের দীর্ঘ ছুটির পর আজ শুরু হচ্ছে কর্মদিবস। ঈদের ছুটি শেষ হলেও রাজধানী ঢাকা এখনও ফাঁকা রয়েছে। চিরচেনা যানজট ও মানুষের কোলাহলমুখর প্রাণ ফিরে ফেতে আরো দু-একদিন সময় লাগতে পারে। মানুষের ভারে ন্যুব্জ রাজধানী ঢাকা ঈদের ছুটিতে বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। বৃষ্টিতে ঝকঝক করছে রাস্তাঘাট। রাজধানীর প্রকৃতিও সেজেছে নতুন রূপে। গাছে গাছে ফুটেছে ফুল। গোলাপ, বকুল, বেলি, টগর, জবা প্রভৃতি ফুল সুগন্ধি ছড়াচ্ছে। পাতাতেও সবুজের ঝলকানি। চার পাশ ফুলের গন্ধে একাকার। আর আম, জাম, জামরুল, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, লিচু, তরমুজ, আমড়াসহ সুস্বাদু ফলের সমারোহ সর্বত্র।

রাজধানী ঢাকায় কিছু বেবিট্যাক্সি, অটোরিকশা, ইজিবাইক, ট্যাক্সিক্যাব, মাইক্রোবাস, জিপ, পিকআপ, কার, টেম্পো ও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন যন্ত্রচালিত যানবাহন দেখা গেলেও কার্যত শহর ফাঁকা। লোক সমাগম খুবই কম। রাজধানীর ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, বনানী, মহাখালী, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, শ্যামলী, কল্যাণপুর, গাবতলী, মিরপুর, খিলক্ষেত, বসুন্ধরা ঘুরে দেখা যায় অভিন্ন চিত্র। তবে প্রাইভেট কার ও সিএনজি দেখা গেলেও রাস্তার ফুটপাথে লোকজন নেই। তবে কলাবাগান, মতিঝিল, আরামবাগ, কমলাপুর, কল্যাণপুর, শ্যামলী, গামতলী রাস্তার দুই পাশে সারি সারি দাঁড়িয়ে রয়েছে দূরপাল্লার সব বাস। এসব গাড়ি অপেক্ষা করছে ঈদে ঘরেফেরা মানুষের জন্য। এদিকে রাজধানীর সংসদ ভবন, ধানমন্ডির ২৭, ৩০-এ রাস্তার ওপর, বনানী মোড় থেকে চেয়ারম্যান বাড়ি সড়কে দেখা গেল স্থানীয় কয়েকজন শিশু ও কিশোররা দল বেঁধে রাস্তায় সাইকেল চালাচ্ছে। আবার ধানমন্ডি লেকে, কলাবাগান রাস্তার পাশেই অনেকে খেলছে ক্রিকেট। কোথাও কোথাও রোড ডিভাইডারে দেখা গেল বিভিন্ন ফুল গাছে ফুল ফুটেছে; ফুলের সৌরভ ছড়াচ্ছে চার দিক। আনোয়ার হোসেন নামের এক পথচারী বলেন, ঢাকার রাস্তা বেশ ফাঁকা। মানুষই নেই। কোথাও কোনো শব্দদূষণ নেই। রাজধানীর সিটি কলেজ থেকে কুড়িল বিশ্বরোড আসতে অন্য সময় ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে সিগন্যাল ও যানজটের কারণে প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। গতকাল ১৫ মিনিটেই মালিবাগ থেকে কুড়িল বিশ্বরোডে পৌঁছে বাস। রাজধানীর পান্থপথ থেকে ধানমন্ডি-৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের দিকে যেতে রাস্তা-বিভাজন (রোড ডিভাইডার) অংশে বেড়ে উঠেছে বকুল, বটসহ বেশ কিছু গাছপালা। রাজপথে বকুলের আধিক্যই বেশি। গতকাল শনিবার ৮ জুন শমরিতা হাসপাতালের কাছে এ রাস্তায় উঠতেই নাকে আসে বকুলের সুবাস। অথচ এর আগে কখনও বকুলের সুবাস মেলেনি। যানবাহনের ধোঁয়া, দূষিত বায়ু, শব্দ ও কার্বন-ডাই অক্সাইডের আধিক্য ভেদ করে হয়তো বকুলের সুবাস পৌঁছতে পারত না। দেখা গেল এই রাস্তা-বিভাজনের প্রায় পুরো অংশজুড়েই যে রয়েছে বকুল গাছের ছড়াছড়ি, তা কর্মব্যস্ততার কারণে হয়তো মানুষ এই ফুলের সমারোহের দিকে তাকিয়ে দেখে না। ইনকিলাবের পাশেই ইত্তেফাক মোড় হিসেবে পরিচিত বঙ্গভবনের দক্ষিণে মসজিদের পাশেই বিভিন্ন ফুলের সৌরভ দেখা যায়। বর্ষার আকাশে কখনও মেঘ, কখনও রোদের দেখা মিলছে। মাথার ওপরে থাকা সূর্যে রাস্তার মাঝখান পর্যন্ত এসে পড়ছে বকুলের ছায়া। তবে রাস্তার মাঝখান পর্যন্ত নেই বকুলের পাতা, ফুল ও ফুলের বোঁটা। রাজধানীর কয়েকটি এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেল রোড ডিভাইডারে অনেক গাছে ফুল ফুটেছে। মানুষ কম, রাস্তায় বাসও কম, নেই পুরনো কোলাহল যানজট।

প্রায় ৫০ লাখ লোকের ধারণ ক্ষমতার ঢাকায় প্রায় আড়াই কোটি মানুষ বসবাস করে। ঈদুল ফিতরের আগে প্রায় অর্ধ কোটিরও বেশি মানুষ রাজধানী ছেড়েছে। তারা প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ উৎসব করতে গ্রামে গেছেন। ফলে কমেছে মানুষ, যানবাহন ও দূষণ। অনুপস্থিত অস্থির কর্মব্যস্ততা। বায়ুদূষণের শীর্ষে থাকা বসবাসের বাস অযোগ্য ঢাকা তিন থেকে চার দিনের জন্য যেন হয়ে উঠেছিল বাসযোগ্য একটি শহর।

কংক্রিটের এই রাজধানী ঢাকা শহরের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, গুলশান লেক পাড়, ধানমন্ডি লেক, বলধা গার্ডেন, বোটানিক্যাল গার্ডেন, সংসদ এলাকায় প্রচুর গাছগাছালি দেখা যায়। রাস্তা-বিভাজনে, রাস্তার পাশে, বাসার পাশে, বাসার ছাদে, ফাঁকা জায়গায়, বিনোদন কেন্দ্রে গাছপালার সংখ্যা কিন্তু একেবারে কম নয়। তবে এ শহরের যানবাহন ও মানুষের তুলনায় তা নিতান্তই কম। মানুষ ও যানবাহন কমে যাওয়ায় সেসব গাছের অক্সিজেন দেয়া যেন কিছুটা টের পাওয়া যায়। ফুল, লতাপাতার সুবাস পাওয়া যাচ্ছিল। পুরান ঢাকার লালবাগের কেল্লায় ফুল সৌরভ ছড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টি গাছপালাকে দিয়েছে আরো সজীবতা। ঈদের ছুটির এ ক’টা দিন যেন গাছ, লতাপাতা, অক্সিজেন আর বৃষ্টির দখলে ছিল ঢাকা।

রাজধানী ঢাকার দৃশ্য গতকাল দেখে মনে হলো চারশ’ বছরের পুরনো শহর ঢাকা মানুষের বাসযোগ্যই রয়েছে। প্রতিটি রাস্তায় সীমিত যানবাহন। পায়ে হেঁটে চলা মানুষের সংখ্যা কম। সুনসান নীরবতা। ঈদ উদযাপনের পর ইতোমধ্যে রাজধানীতে ফিরতে শুরু করেছেন নাড়ির টানে গ্রামের বাড়ি যাওয়া মানুষের অনেকেই। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে যারা চাকরি করেন তাদের অনেকেই শনিবার অফিসও করেছেন। আজ রোববার সচিবালয়সহ সরকারি অফিস চালু হবে। চলতি সপ্তাহের মাঝামাঝি হয়তো পুরোদমে অফিস শুরু হয়ে যাবে। রাজধানীতে বেড়ে যাবে মানুষ, যানবাহনের উপস্থিতি ও দূষণ; বেড়ে যাবে চিরচেনা যানজট আর মানুষের ভোগান্তি। সেই সঙ্গে ঢাকা ক্রমান্বয়ে হারাবে বর্তমান প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-স্নিগ্ধতা।

শনিবার রাজধানীর কয়েকটি এলাকার রাস্তায় পায়ে হেঁটে দেখা যায় বিপণি বিতান ও মার্কেটগুলো বন্ধ। তবে কিছু কিছু দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে। বসুন্ধরা শপিংমলের অপর পাশের ফার্নিচারের দোকানগুলোও খোলা। তবে কারওয়ান বাজারের ওই এলাকাতেই বেশ কিছু দোকানপাট বন্ধ দেখা যায়। ফুটপাথের কিছু কিছু দোকানপাটও খুলতে দেখা গেছে। যাত্রবাড়ীতে দেখা গেল অধিকাংশ দোকানপাট খুলেছে। টিকাটুলিসহ পুরান ঢাকার একই চিত্র। সদরঘাটের ভিড় যেন বাংলা বাজারের বন্ধ দোকানগুলোকে মুখরিত করে তুলেছে।

শনির আখড়ার চা দোকানি জহির ঢাকায় ঈদ করেছেন। বললেন, ঈদের দিন না খুললেও পরের দিন থেকে তিনি নিয়মিত দোকান খুলছেন এবং চা বিক্রি করছেন। পাশের আরেক চা বিক্রেতা ঈদের দিনও দোকানে চা বিক্রি করেছেন বলে জানান। কাঁঠালবাগানের মুদি দোকানি মো. মমিনুল হক ঈদের মধ্যেও ঢাকাতেই ছিলেন। তিনি বলেন, ঈদের পর এলাকায় লোক সমাগম এখনও সে রকম হয়নি। রোববার থেকে হয়তো লোকজন বেড়ে যাবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত লোকজন আইতে দেখছি, কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। রোববার হয়তো তাদের দেখা মিলবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box