রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু জ্বর

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বর্ষা মৌসুম শুরু হতে না হতেই ডেঙ্গু জ্বর মারাত্মক আকার ধারণ করছে। দু’দিনে এ রোগে ৯০ জনের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

এ বছর জুনের প্রথম সপ্তাহে রাজধানীতে গড়ে প্রতিদিন সাতজন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যে দুই রোগীর রক্ত পরীক্ষা করে সেরোটাইপ-৩-এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে সেরোটাইপ-৩-এর প্রভাব বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে জানা গেছে, এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ জুন পর্যন্ত ৭০৭ জন রোগী (নারী, পুরুষ ও শিশু) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ভর্তি রোগীদের মধ্যে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। সুস্থ হয়ে ৫৮৭ জন বাড়ি ফিরে গেছেন। শুধু জুনেই ৪৪০ জন ভর্তি হয়েছে। অর্থাৎ দিনে গড়ে ১৪ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯ ও ২০ জুন ৯১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৩৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১১৮, মার্চে ১২, এপ্রিলে ৪৪, মে-তে ১৩৯ জন ভর্তি হন। আক্রান্তদের মধ্যে দু’জন এপ্রিলে মৃত্যুবরণ করেছেন। গত বছর এ রোগে ৯ হাজার ২২৮ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং এর মধ্যে ২৪ জনের মৃত্যু ঘটে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতিমধ্যে দেশে ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হয়েছে। এবার দেশের সামগ্রিক আবহাওয়া ডেঙ্গুর যথেষ্ট উপযোগী। এ রোগ থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখতে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি সরকারিভাবে সমীক্ষা চালিয়ে ডেঙ্গুর সেরোটাইপ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।

আইইডিসিআর (ইনস্টিটিউট অব ইপিডেমিওলজি ডিজিজেস কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ) সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে রাজধানীর মুগদা হাসপাতালের একজন চিকিৎসক ও তার সন্তান ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে ওই হাসপাতালে ভর্তি হন। আইইডিসিআরে পরীক্ষায় তাদের রক্তে ডেঙ্গুর সেরোটাইপ-৩-এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের আবহাওয়া অনুযায়ী জুন-জুলাই ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার প্রজনন মৌসুম। এ সময় থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানি জমে যায়। জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার জন্ম হয়।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. একেএম শামসুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ইতঃপূর্বে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ১ ও ২নং সেরোটাইপের মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটলেও গত বছর ঘটে ৩নং সেরোটাইপের মাধ্যমে। এটা আগে থেকে জানতে পারলে রোগীদের চিকিৎসায় এবং মৃত্যুঝুঁকি রোধে বিশেষ ভূমিকা রাখা সম্ভব। জানা গেছে, এবারও ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে সোরটাইপ-৩-এর প্রভাব বেশি। তাই এ ক্ষেত্রে রোগীদের নিরাপত্তায় সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যালেরিয়া ইলুমিনেশন অ্যান্ড এটিডি কন্ট্রোল প্রোগ্রামের ডিপিএম ডা. এমএম আক্তারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ টেকনিক্যাল কারিগরি কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ ছাড়া ডেঙ্গু রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে রাজধানীর ৩৬টি বেসরকারি হাসপাতাল এবং সব সরকারি হাসপাতালের ১৪০০ চিকিৎসককে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০০ নার্সকেও এ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এবার ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবার রিপোর্টিং বেশি হচ্ছে। সামগ্রিক প্রস্তুতির কারণেই এটা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা যুগান্তরকে বলেন, ইতিমধ্যে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দ্রুত ডেঙ্গু রোগ শনাক্তকরণের বিশেষ কিট বিতরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ২০১৭ সাল থেকে নিয়মিতভাবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বছরে তিনবার এডিস মশার জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। ২০১৯ সালের ৩-১২ মার্চ পর্যন্ত চালানো জরিপে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বেশকিছু এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব পরিমাপে ব্যবহৃত সূচকের মাত্রা বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এ জরিপের ফল অনুসারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব সূচক (বিআই) সর্বোচ্চ ৮০ পাওয়া গেছে। ৪০নং ওয়ার্ডের আওতায় রয়েছে পুরান ঢাকার দয়াগঞ্জ, নারিন্দা, স্বামীবাগ, গেণ্ডারিয়াসহ আশপাশের এলাকা। এ এলাকায় এবার বৃহত্তর ঢাকা মহানগরীর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত হয়েছে। এরপর ১২নং ওয়ার্ডে বিআই ৭০, ১৭নং ওয়ার্ডে ৪০ এবং ৪ ও ৩৯নং ওয়ার্ডে ৩০, ৬নং (দক্ষিণ মুগদাপাড়া ও বাসাব) ওয়ার্ড, ৭নং (মানিকনগর বিশ্বরোড) ওয়ার্ড, ১৪নং (শেরেবাংলা রোড ও হাজারীবাগ), ১৯নং (মগবাজার ও রমনা), ২০নং (সেগুনবাগিচা), ২১নং (শাহবাগ), ২২নং (হাজারীবাগ), ৪৩নং (ফরাশগঞ্জ), ৪৭নং (শ্যামপুর, উত্তর যাত্রাবাড়ী) ও ৪৮নং ওয়ার্ডে ২০ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে ৩৫নং ওয়ার্ডে (তেজগাঁও)। সেখানে লার্ভার ঘনত্ব সূচক (বিআই) সর্বোচ্চ ৪০ পাওয়া গেছে। এরপরই ১নং (তুরাগ), ৪নং (পল্লবী) ও ১৯নং ওয়ার্ডে (বনানী, গুলশান, বারিধারা) বিআই ৩০ পাওয়া গেছে।

প্রসঙ্গত স্বাস্থ্য অধিদতরের হেলথ্ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে ডেঙ্গু রোগীর তথ্য নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে। ২০১৯ সালের ২০ জুন পর্যন্ত মোট রোগীর সংখ্যা ৭০৭ জন এবং মৃতের সংখ্যা ২ (দুই) জন। ২০১৮ সালের একই সময় পর্যন্ত মোট রোগীর সংখ্যা ছিল ১৩৩ জন, তবে কোনো রোগীর মৃত্যু ঘটেনি। এ ছাড়া ২০১৯ সালে ডেঙ্গু ডিজিজ সার্ভিলেন্স জোরদারের অংশ হিসেবে ঢাকা শহরের অনেক নতুন সরকারি/বেসরকারি হাসপাতাল থেকে রিপোর্ট সংগ্রহ করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে বর্ধিত মোট রোগীর (১১৬) প্রায় ৪৩ শতাংশ ও মৃত্যুর ১০০ শতাংশ উক্ত নতুন হাসপাতালসমূহ থেকে রিপোর্ট করা হয়েছে। ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. একেএম শামসুজ্জামান। তিনি জানান, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে জ্বরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ বেড়ে যায়। জ্বর ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। তবে, তরুণ ও শিশুদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পরও উপসর্গ দেখা যায় খুবই সামান্য। কখনও বা একেবারেই উপসর্গহীন। তবে ডেঙ্গুর ভাইরাসবাহী মশা কামড়ানোর চার থেকে সাত দিন পর এসব উপসর্গ স্পষ্টভাবে লক্ষণীয় হয়। এ রোগের কিছু সাধারণ উপসর্গ হল- বিরামহীন মাথাব্যথা, হাঁড়, হাঁড়ের জোড় ও পেশিতে ব্যথা, বমিভাব ও বমি হওয়া, গ্রন্থি ফুলে যাওয়া, সারা শরীরের ফুসকুড়ি দেখা দেয়া, চোখের পেছনে ব্যথা হওয়া ইত্যাদি। এ সময় পর্যন্ত স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং প্রচুর পরিমাণে তরল গ্র্রহণ করার মাধ্যমে দ্রুত রোগমুক্ত হওয়া যায়। এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ডেঙ্গু সচরাচর সেরে যায়। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়তে পারে। মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের উপসর্গ হল- শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হওয়া কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া। ত্বক শীতল হয়ে যাওয়া। অবিরাম অস্বস্তি, ত্বকের ভেতরের অংশে রক্তক্ষরণের কারণে ত্বকের উপরের অংশে লাল ছোপ সৃষ্টি হওয়া। বমি, মল কিংবা প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, প্রচণ্ড পেটব্যথা ও অনবরত বমি হওয়া, নাক ও দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ ও অবসাদ। এ উপসর্গগুলো চোখে পড়লে আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box