রক্তের সঙ্গে বাজেট খেয়ে মশা আরও দাপুটে

আলোকিত সকাল ডেস্ক

মশক নিধনে বছর বছর বরাদ্দ বাড়াচ্ছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। তবু মশার যন্ত্রণা থেকে রেহাই মিলছে না নগরবাসীর। বরং বরাদ্দ বাড়ার সঙ্গে যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মশার উপদ্রব। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।

গত কয়েক দিনে মশাবাহিত রোগ যেন অনেকটা ধারণ করেছে মহামারী আকার। এর মধ্যেই আজ মঙ্গলবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হবে। এতে মশক নিধন কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩০ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ২৬ কোটি টাকা। সেখানে খরচ হয়েছিল ১৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা। একই খাতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। যার মধ্যে খরচ হয়েছে মাত্র ১২ কোটি টাকা। বাজেট থাকার পরও কেন প্রায় প্রতিবছর তার পুরোটা খরচ হয় না এর কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। ডিএসসিসি বাজেট ঘোষণার দিন ঠিক করলেও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) চলতি বছরের বাজেট এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ডিএনসিসির বাজেটেও এবার মশক নিধনে অর্থ বাড়ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে প্রতিষ্ঠানটি ব্যয় করেছে ২১ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যা ছিল ২০ কোটি, তবে তা সংশোধিত বাজেটে ছিল ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ খাতে ডিএনসিসি বরাদ্দ দিয়েছিল ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অথচ মশা মারতে দুই সিটি করপোরেশন এমন বিপুল বাজেট রাখলেও প্রতিবছরই মশাবাহিত রোগের সংখ্যা বাড়ছে।

মশার ওষুধ নিয়ে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানীরা এক গবেষণায় জানিয়েছেন, ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশা আর প্রচলিত কীটনাশকে মরছে না। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের মার্চের মধ্যে করা গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এমন ফল পান।

আইসিডিডিআরবি জানায়, গবেষণার অংশ হিসেবে ঢাকার আজিমপুর, ধানম-ি, মোহাম্মদপুর, গুলশান, কড়াইল, মিরপুর-১, উত্তরা সেক্টর ৪, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া ও খিলগাঁও এলাকা থেকে এডিস মশার ডিম সংগ্রহ করেন গবেষকরা। পরীক্ষাগারে সেই ডিম থেকে লার্ভা ও পরে মশার জন্ম দেওয়া হয়। সেই মশাকে আনা হয় ঢাকা শহরে মশক নিধনে ব্যবহার করা হচ্ছে এমন কীটনাশকের সংস্পর্শে। তাতে দেখা যায়, সব মশা মরছে না। কীটনাশকের বিষক্রিয়া সহ্য করেও অনেক মশা বেঁচে থাকছে।

দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, নোকন নামের একটি কোম্পানির কাছ থেকে ওষুধ নেয় ডিএনসিসি। কিন্তু সম্প্রতি পরীক্ষা করতে গিয়ে ওই কোম্পানির ওষুধ মানহীন ও অকার্যকর বলে প্রমাণ মেলে। ফলে জরুরি ভিত্তিতে নতুন ওষুধ সংগ্রহ করতে কয়েক দফা সভা হলেও সমাধানে পৌঁছতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল সোমবার মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক নির্বাচন, কার্যকারিতা পরীক্ষা, ক্রয় প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা এবং কীটনাশকের কার্যকারিতা তদারকির জন্য ডিএনসিসি ১০ সদস্যবিশিষ্ট একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে। ডিএনসিসি মেয়র কমিটির সভাপতি এবং প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

গতকাল নগর ভবনে ডিএনসিসি মেয়রের সভাপতিত্বে ‘মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ব্যবহৃত অধিকতর কার্যকর কীটনাশক প্রবর্তন’ শীর্ষক এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে সভায় বিশেষজ্ঞরা পরবর্তী কীটনাশক ক্রয় না করা পর্যন্ত বর্তমানে ব্যবহৃত কীটনাশকের ঘনত্ব বাড়িয়ে ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ডিএসসিসির পক্ষ থেকেও ৬৭টি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকার ৪৭৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যকর্মীরা নানা স্থানে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেবেন। প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার জন্য হটলাইন ০৯৬১১০০০৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাসায় চলে যাবেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপের ফল অনুযায়ী, ডিএসসিসি এলাকার ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব সূচক (বিআই) সর্বোচ্চ ৮০ পাওয়া গেছে। এ ওয়ার্ডের আওতায় পুরান ঢাকার দয়াগঞ্জ, নারিন্দা, স্বামীবাগ, গে-ারিয়াসহ আশপাশের এলাকা রয়েছে। এ এলাকাকে ঢাকা মহানগরীর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে ধরা হয়েছে। এর পর ১২ নম্বর ওয়ার্ডে লার্ভার ঘনত্ব সূচক ৭০, ১৭ নম্বরে ৪০, ৪ নম্বর ও ৩৯ নম্বরে ৩০ পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া ৬, ৭, ১৪, ১৯, ২০, ২১, ২২, ৪৩, ৪৭ ও ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডে লার্ভার ঘনত্ব সূচক ২০ পাওয়া যায়। অন্যদিকে ডিএনসিসির এলাকাগুলোয় মশার প্রজননক্ষেত্র সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে (তেজগাঁও)। সেখানে লার্ভার ঘনত্ব সূচক (বিআই) সর্বোচ্চ ৪০। এর পর ১ নম্বর (তুরাগ), ৪ নম্বর (পল্লবী) এবং ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে (বনানী, গুলশান ও বারিধারা) লার্ভার ঘনত্ব সূচক ৩০ পাওয়া গেছে।

দুই সিটি করপোরেশনের মশক নিধনের দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিন ওষুধ ছিটানোর জন্য ৫ থেকে ৬ জন করে কর্মী নিযুক্ত আছেন। তারা দিনে দুবার ওষুধ ছিটানোর কাজ করেন। যদিও নগরবাসী তাদের কালেভদ্রে দেখতে পান বলে অভিযোগ করেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ সার্বিক বিষয়ে বলেন, এখন যেহেতু ডেঙ্গুর মৌসুম, তাই মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তবে ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়ে আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। আমরা দুই সিটি করপোরেশনকে অনুরোধ করছি তারা যেন মশক নিধন ব্যবস্থা আরও জোরদার করে। নগরবাসীর প্রতি আমাদের অনুরোধ, মশা যেন বংশবৃদ্ধি করতে না পারে সে জন্য বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখবেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments