রক্তকেন্দ্রে দিনরাত একাকার

আলোকিত সকাল ডেস্ক

টানা চব্বিশ ঘণ্টা ল্যাবে কাজ করছেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ৭/৫ আওরঙ্গজেব সড়কের রেড ক্রিসেন্ট রক্তকেন্দ্রের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রূপম সাহা। এ কেন্দ্রের ৯ জন টেকনোলজিস্টের মধ্যে তিনি একজন। রোস্টার অনুযায়ী তার ছয় ঘণ্টা কাজ করার কথা থাকলেও ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় রক্তের প্লাটিলেট (অণুচক্রিকা) সংগ্রহের কাজ করছেন তিনি। তার মতো অন্যদেরও এখন দিনরাত একাকার। প্লাটিলেট হচ্ছে রক্তের একটি কণিকা। এক মাইক্রোলিটার রক্তে সাড়ে তিন লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা থাকে। সমকালকে রূপম বলেন, ‘ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ কেন্দ্রে চাপ পড়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরেও আমাদের কাজ করতে হচ্ছে।’ আরেক মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বললেন, গত কিছুদিন প্লাটিলেটের জন্য কেন্দ্রে মানুষের চাপ বেড়েছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লাটিলেটের চাহিদাও বেড়েছে।

রেড ক্রিসেন্ট প্রধান কার্যালয় রক্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ডা. জাহিদুর রহমান জানান, রেড ক্রিসেন্টের মোহাম্মদপুর ও সাব-সেন্টার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের রক্তকেন্দ্রে এবার রক্তের চাহিদা অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। গত এক মাসে এ দুই কেন্দ্র থেকে এক হাজার ১০০ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ ও বিতরণ করা হয়েছে। অথচ আগে প্রতি মাসে ২০০ ব্যাগের মতো রক্ত সরবরাহ করা হতো। এখন অতিরিক্ত চাহিদার ৯০ শতাংশ রক্ত ডেঙ্গু রোগীদের প্রয়োজন মেটাচ্ছে।

এই রক্ত কেন্দ্রের ডেস্ক ইনচার্জ দেলোয়ার হোসেন জানান, প্রতিদিন এই কেন্দ্রে দেড় শতাধিক রোগীর স্বজন আসেন রক্ত সংগ্রহে। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৪৫ ব্যাগ প্লাটিলেট দেওয়া হয়। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় কেন্দ্রে ৩২ কর্মকর্তা ও কর্মচারী অতিরিক্ত সময়জুড়ে মানুষের সেবায় কাজ করছেন। সাব-সেন্টার হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালেও একই চিত্র। হাসপাতালের রক্তকেন্দ্রের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মাসুম রেজা বলেন, ‘ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর জন্য প্রতিদিন ৬০ ব্যাগ প্লাটিলেট দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া জুলাই মাসে অ্যাফ্রেসিস দেওয়া হয়েছে ৬০ ব্যাগ। এক ব্যাগ প্লাটিলেটের জন্য চার ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। এ জন্য দরকার চারজন দাতা। এতে খরচ পড়ে সাড়ে চার হাজার টাকা। অ্যাফ্রেসিস পদ্ধতিতে একজন দাতার শরীর থেকে সরাসরি এক ব্যাগ শুধু প্লাটিলেট নেওয়া যায়। তাতে খরচ পড়ে ১৫ হাজার টাকা।’ তিনি বলেন, ‘অন্য সময়ে দিনে আমাদের সাত/আট ব্যাগ প্লাটিলেট সরবরাহ করতে হতো। এখন করতে হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ ব্যাগ। ডেঙ্গুর কারণে আমাদের ওপর কাজের চাপ বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ গুণ।’

চাহিদা অনুযায়ী রক্তের প্লাটিলেট সংগ্রহে রোগীর স্বজনরা ভিড় জমাচ্ছেন এ কেন্দ্রে। সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল সোমবার মিরপুরের কাজীপাড়ার জাফর এসেছিলেন তার ১০ বছর বয়সী ভাতিজি লাবীবার রক্তের প্লাটিলেট সংগ্রহের জন্য। সে পাঁচ দিন ধরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত। তিন দিন ধরে ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ২৬৬ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন। রোববারও রেড ক্রিসেন্ট থেকে প্লাটিলেট সংগ্রহ করেছেন তার স্বজনরা। ওই দিন তার প্লাটিলেট ছিল ৩৫ হাজার। একদিনের ব্যবধানে গতকাল তার প্লাটিলেট নেমে হয় ২৫ হাজার। চিকিৎসকরা জরুরিভাবে এক ব্যাগ প্লাটিলেট সংগ্রহের জন্য বলেন। সে তাগিদেই রেড ক্রিসেন্টে এসেছেন তার দুই চাচা। জাফর এই প্রতিবেদককে বলেন, জরুরিভাবে লাবীবাকে প্লাটিলেট দিতে হবে। কিন্তু রক্তদাতার জন্য অপেক্ষা, প্রসেসিং এসব ক্ষেত্রে সময় লাগছে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। তাই ম্লান মুখেই অপেক্ষা করছিলেন প্লাটিলেটের আশায়। একই জায়গায় কথা হয় রসুল আহমেদের সঙ্গে। তার মা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। তার এক ব্যাগ প্লাটিলেট প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে রক্তদাতা প্রয়োজন চারজন। কিন্তু ঢাকার বাইরে থেকে আসায় পরিচিতজনদের মধ্য থেকে কাউকে পাওয়া যায়নি। তাই রেড ক্রিসেন্টে ছুটে এসেছেন রক্তের প্লাটিলেটের আশায়।

রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রধান কার্যালয়ের ডেপুটি ডিরেক্টর (ফিন্যান্স) মো. আবদুস সালাম বলেন, ‘অন্য সময় দিনে আমরা ২০ থেকে ২৫ ব্যাগ বা ইউনিট প্লাটিলেট সরবরাহ করতাম। ডেঙ্গুর কারণে তা বেড়ে ৬০ থেকে ৬৫ ব্যাগে দাঁড়িয়েছে।’ তিনি জানান, মানুষের জীবন রক্ষায় শুরু থেকেই রেড ক্রিসেন্ট বিভিন্ন মোটিভেশনাল কাজ করে আসছে। বিভিন্ন দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমরা রক্ত সরবরাহ করে থাকি। কিন্তু চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় আমরাও আমাদের কার্যক্রম বাড়িয়ে দিয়েছি। এমনকি আমিসহ অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী অতিরিক্ত সময় কাজ করছি। একই সঙ্গে ‘ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প’ও চলছে স্বেচ্ছাসেবীদের অংশগ্রহণে। বর্তমানে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে তিন দিনের ক্যাম্প চলছে। ভাসানটেকেও হচ্ছে রক্ত সংগ্রহের কাজ। তিনি জানান, দেশের আটটি সেন্টার- ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নাটোর, মাগুরা, যশোর, রাজশাহী ও দিনাজপুরে রক্ত সরবরাহ করা হয়। ঈদের সময় অনেকেই ঢাকার বাইরে ঈদ আনন্দে শামিল হতে যাবেন। সেখানে যেন রক্তের ডোনার পাওয়া কঠিন না হয়ে পড়ে, সে জন্য আমরা চেষ্টা করছি।

এবার ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হতে যাচ্ছে আগামী ৮ আগস্ট থেকে। ৯ ও ১০ আগস্ট শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি। ছুটি শেষ হতে পারে জাতীয় শোক দিবস ও পরের শুক্র-শনিবারের পর ১৮ আগস্টে। অর্থাৎ ১০ দিন রাজধানী অনেকটা ফাঁকা থাকবে। সাধারণত এ ধরনের ছুটির সময় রাজধানীতে শুধু ডেঙ্গু নয়, অন্যান্য রোগের চিকিৎসা পাওয়াও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। সংশ্নিষ্ট চিকিৎসকরা বললেন, ডেঙ্গু নিয়ে এবার আতঙ্কজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় থাকছে কি-না, অনেক ক্ষেত্রে তা দেখার কেউ নেই। এ জন্য সরকারের রেফারেন্স ল্যাব স্থাপন করা দরকার বলে অনেকে দাবি করেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments