মিন্নি ফের আলোচনায়

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বরগুনায় চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় রিফাতের স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নিকে গ্রেফতার দেখানোর পর তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে। মিন্নিকে সাক্ষী থেকে আসামি করে গ্রেফতারের পর গতকাল ৫ দিনের রিমান্ডেও নিয়েছে পুলিশ। এক নম্বর সাক্ষী থেকে মামলার আসামি হওয়ায় মিন্নির ভূমিকা নিয়ে চলছে সরগরম আলোচনা। রহস্য আরও ঘনীভ‚ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মিন্নির ভ‚মিকা। জানা যায়, রিফাত শরীফকে কোপানোর সময় স্ত্রী মিন্নির গগনবিদারী চিৎকার ও খুনিদের বাধা দেওয়ার চেষ্টার ভিডিও দেখে সারা দেশের মানুষের মধ্যে মিন্নির প্রতি সহানুভ‚তিশীল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তার অল্প সময়ের মধ্যেই রিফাত হত্যাকান্ডের মূল কিলার ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির প্রেম ও বিয়ের খবর এবং বিভিন্ন সময়ের ছবি প্রকাশ হওয়ায় সহানুভুতি হারিয়েছেন তিনি। এমনকি পরবর্তী সময়ে হত্যাকান্ডের আরও দুটি ভিডিও প্রকাশ হলে সেখানে রিফাতকে কোপানোর আগ মুহূর্তে ব্যাপক মারধর করা হলেও উপস্থিত মিন্নির মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়নি। সেখানে তার হাঁটাচলার ভাবভঙ্গিও ছিল অনেকটাই স্বাভাবিক। এসব কারণে সাধারণ মানুষের চোখেও এখন রিফাত হত্যার নেপথ্যের ‘খলনায়িকায়’ পরিণত হয়েছেন মিন্নি। তবে সাধারণ মানুষদের কেউ কেউ বলছেন, নেপথ্যের হোতা বা খুনিদের শেল্টারদাতাদের রক্ষা করতে হত্যা মামলায় মিন্নিকে জড়িয়ে বিষয়টি হালকা করা হচ্ছে।

যদিও পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, রিফাত হত্যায় মিন্নির যোগসাজশ বা মদদ রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। রিমান্ডে নিয়ে এ বিষয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, রিফাত হত্যার পর খুনিদের কোপানোর একটি ভিডিও ভাইরাল হলে তাতে দেখা যায়Ñ স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নির চিৎকার, ছোটাছুটি ও খুনিদের বারবার বাধা দিচ্ছেন। অপর একটি ভিডিওতে মিন্নিকে দেখা যায়, কোপানোর আগে স্বামী রিফাতকে বেশ কয়েকজন মিলে কিলঘুষি দিয়ে মারতে মারতে নয়ন বন্ডের কাছে নিয়ে গেলেও সেখানে উপস্থিত মিন্নির মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না। যেন কিছুই হয়নি। স্বাভাবিক হাঁটাচলার দৃশ্য ছিল রহস্যজনক। রিফাত হত্যার পরপরই মিন্নির ভ‚মিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নিহতের বন্ধু-স্বজনরা। তারা বলেছিলেন, নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির প্রেম ও বিয়ে হয়েছিল। ফেসবুকে নয়ন বন্ড ও মিন্নির বিয়ে সংক্রান্ত একটি কাবিননামার কপি ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া খুনি নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির সেলফি এবং জন্মদিনের একটি অনুষ্ঠানে কয়েকজন বন্ধুর মাঝে নয়ন বন্ড ও মিন্নির ছবিও প্রকাশ পায়। সেখানে হাসিখুশি মিন্নির হাতে ছিল ফুলের তোরা।

অপরদিকে গত ১৩ জুলাই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত নয়ন বন্ডের মা শাহিদা বেগম বলেছিলেন ‘রিফাত হত্যার আগের দিনও মিন্নি আমাদের বাসায় এসে নয়নের সঙ্গে দেখা করে। রিফাত শরীফের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার আগেও মিন্নি নিয়মিত আসত আমাদের বাসায়। মিন্নিকে রিফাত শরীফ কলেজে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেই মিন্নি তারপর আমাদের বাসায় চলে আসত।’

বরগুনা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মারুফ হোসেন বলেন, রিফাত হত্যার ঘটনায় মিন্নির সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। এ কারণেই তাকে সাক্ষী থেকে আসামি করে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মিন্নি ৫ দিনের রিমান্ডে : আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি এখন ৫ দিনের পুলিশ রিমান্ডে। বুধবার বেলা ৩টা ১০ মিনিটে মিন্নিকে বরগুনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মসদ সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলা তদন্ত কর্মকর্তা বরগুনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হুমায়ুন কবির। বিচারক শুনানি শেষে মিন্নির ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এ সময় আদালতে মিন্নি দাবি করেন, রিফাত হত্যায় কোনোভাবেই তিনি জড়িত নন।

বরগুনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থিত অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত কৌঁসুলি অ্যাড. সঞ্জিব দাস জানান, ‘বিকাল ৩টার দিকে বরগুনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিয়ে আসা হয় নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে। এরপর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতের বিচারকের কাছে মিন্নিকে কী কারণে হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত মনে হয়েছে সে বিষয়গুলো উপস্থাপন করেন। এ সময় তদন্তকারী কর্মকর্তা মিন্নির সঙ্গে আসামিদের কল লিস্ট, বিভিন্ন সময়ে যোগাযোগ, নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির বিয়ের বিষয় ও এজাহারভুক্ত আসামি টিকটক হৃদয়ের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির তথ্য আদালতে উপস্থাপন করেন। এরপর তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার রহস্য উদঘাটন ও অধিকতর তদন্তের জন্য মিন্নির সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।’

অ্যাড. সঞ্জিব দাস বলেন, ‘মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতকে জানান, রিফাত হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি টিকটক হৃদয় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন রিফাত হত্যাকাÐের পরিকল্পনায় মিন্নি জড়িত ছিল। এ হত্যাকান্ডের আগে এজাহারভুক্ত সব আসামির সঙ্গে বিভিন্ন সময় এ আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ রক্ষা করেছে, সেই কল লিস্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা উপস্থাপন করেছেন।’

এ আইনজীবী আরও জানান, ‘আদালতের বিচারক মিন্নিকে প্রশ্ন করেন, ‘এ মামলায় আপনার কোনো আইনজীবী না থাকায় আপনার বক্তব্য কী?’ এ সময় মিন্নি বলেছেন, ‘রিফাত শরীফ আমার স্বামী। আমি আমার স্বামী হত্যার সঙ্গে জড়িত না। আমি আমার স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার চাই। আমি এ হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত না। আমাকে ষড়যন্ত্র করে এ মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে।’ ‘এজাহারভুক্ত আসামিদের সঙ্গে আগে থেকেই আপনার যোগাযোগ ছিল এবং আসামি নয়ন বন্ডের সঙ্গে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সম্পর্ক ছিল সে বিষয়ে আপনার কী বক্তব্য’ বিচারকের এমন প্রশ্নের জবাবে মিন্নি নিরুত্তর ছিলেন।’

আস/এসআইসু

Facebook Comments