মিন্নি কি পরিকল্পনাকারী!

আলোকিত সকাল ডেস্ক

গ্রেফতার আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে বুধবার বরগুনার আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ – সমকাল
আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী ও নিহতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতারের পর পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তবে আদালতে মিন্নি বলেছেন, ‘এ মামলায় আমাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হয়েছে। রিফাত শরীফ আমার স্বামী। আমি আমার স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার চাই।’ আদালতে মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।

বরগুনার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বলেছেন, মামলাটি ভিন্ন খাতে নেওয়া হচ্ছে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। পুলিশের ভূমিকারও সমালোচনা করেছেন তারা। আদালতে মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকার বিষয়টি নিয়ে রয়েছে অনেক গুঞ্জন। মিন্নির বাবা তিন আইনজীবী নিয়োগ করলেও ওকালতনামায় স্বাক্ষর না করায় তারা আদালতে লড়তে পারেননি। এদিকে, মিন্নির গ্রেফতার নিয়ে গতকাল সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হয়। সেখানে এক এমপি প্রশ্ন তোলেন, মিন্নির গ্রেফতারে প্রভাবশালী কারও ইন্ধন রয়েছে কি-না।

গতকাল বুধবার বিকেলে মিন্নিকে বরগুনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বরগুনা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) হুমায়ূন কবির। আদালতের বিচারক মোহাম্মাদ সিরাজুল ইসলাম গাজী শুনানি শেষে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, রিফাত শরীফ হত্যার পরিকল্পনায় নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর সঙ্গে মিন্নিও ছিলেন।

পুলিশের অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সমকালের কাছে দাবি করেন, ঘটনার দিন ও তার আগের দিন নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির কথোপকথন ও মেসেজ আদান-প্রদান হয়েছে। এতে তাদের মনে হয়েছে, রিফাত হত্যার নীলনকশায় মিন্নির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু ওই কথোপকথন ও মেসেজে কী ধরনের বক্তব্য ছিল, তা এখনই খোলাসা করতে চাননি ওই কর্মকর্তা। অবশ্য অন্য সূত্র থেকে ওই পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রিমান্ড শুনানিতে বলেন, এ মামলার এজাহারভুক্ত অন্যতম আসামি টিকটক হৃদয় ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যা পরিকল্পনায় মিন্নি জড়িত বলে উল্লেখ করে। এ ছাড়া মিন্নি তার আগের স্বামী নয়ন বন্ডের সঙ্গে বিয়ের কথা গোপন করে রিফাতকে বিয়ে করেন। তবে নয়ন বন্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতেন মিন্নি। রিফাত তার স্ত্রীকে নয়ন বন্ডের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রাখার জন্য বলেছিলেন। মিন্নি এ ঘটনা নয়ন বন্ডকে জানান। পরে মিন্নি, নয়ন বন্ড ও তার বাহিনী রিফাতকে হত্যার পরিকল্পনা করে। রিফাত হত্যার আগে এজাহারভুক্ত সব আসামির সঙ্গে মিন্নি যোগাযোগ রাখতেন। এর প্রমাণ হিসেবে তদন্তকারী কর্মকর্তা মোবাইল কললিস্ট আদালতে উপস্থাপন করেন।

আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর সঞ্জীব দাস বলেন, এ সময় পুলিশ রিমান্ড আবেদন করলে বিচারক মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকায় তাকেই কথা বলার সুযোগ দেন। সঞ্জীব বলেন, ‘এজাহারভুক্ত আসামিদের সঙ্গে আগে থেকেই আপনার যোগাযোগ ছিল।’ – এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে মিন্নি নিরুত্তর ছিলেন।

রিমান্ড শুনানিকালে আদালতের বাইরে থাকা মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘রিফাত হত্যাকাণ্ডের আসল খুনিদের বাঁচাতে আমার মেয়েকে ষড়যন্ত্র করে এ মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। আমি প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।’ তিনি আরও বলেন, তিনি তার মেয়ের পক্ষে তিনজন আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছিলেন। তারা ওকালতনামায় স্বাক্ষর দিতে না পারায় আদালতে দাঁড়াতে পারেননি।

নিহত রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বলেন, তিনি আগেই সন্দেহ করেছিলেন যে মিন্নি তার ছেলের হত্যাকাণ্ডে জড়িত। তাই তিনি পুত্রবধূকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি আশা করেন, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মিন্নির কাছ থেকে হত্যার আসল রহস্য বেরিয়ে আসবে।

এদিকে, রিফাত শরীফ হত্যার ২০ দিনের মাথায় মামলার প্রধান ও প্রত্যক্ষ সাক্ষী মিন্নিকে পুলিশ গ্রেফতার করায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন অনেকে। অনেকে বলেছেন, এটা বিচারিক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে।

বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটি ও সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আনিচুর রহমান বলেন, ‘রিফাত হত্যার যথাযথ বিচার হবে কি-না, সন্দেহ সৃষ্টি হলো। একটি ফৌজদারি মামলার এক নম্বর সাক্ষী আসামি হয়ে গেলে বিচার কীভাবে এগোবে? শুনেছি, আদালতে খুনিদের পক্ষের লোকজন উপস্থিত ছিল। মনে হচ্ছে, মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হচ্ছে। একটি চাঞ্চল্যকর মামলার এমন পরিণতি ভালো নয়।’

বরগুনার নারীনেত্রী ও উন্নয়ন সংগঠন জাগো নারীর প্রধান নির্বাহী হোসনেআরা হাসি বলেন, মিন্নি যদি নয়ন বন্ডকে বিয়ে করেও থাকে, কী কারণে এটা করেছিল, এ ক্ষেত্রে একজন নারীর সীমাবদ্ধতা তদন্তকারী কর্মকর্তার বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। নয়ন ও রিফাত ফরাজীর ভয়ে অনেকে বরগুনা ছেড়ে চলে গেছে।

তিনি বলেন, চার দিন আগে মামলার বাদীর (রিফাতের বাবা) সংবাদ সম্মেলনের অভিযোগ এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার আদালতে দেওয়া বক্তব্য একই সূত্রে গাঁথা। তাই মনে হচ্ছে, পুলিশ এবং মামলার বাদীর মধ্যে একটি যোগসাজশ রয়েছে।

বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সকালে মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ লাইনে আনা হয়। একটানা ১১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাতে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। পুলিশ সুপার আরও জানান, রিফাত হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১০ জন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বাকি তিনজন রিমান্ডে আছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments