মিন্নিকে নিয়ে রিফাতের বাবা, নয়নের মা ও মিন্নির বাবার যত অভিযোগ

সাইফুল ইসলাম সুমন

২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের মূল ফটকের সামনের রাস্তায় স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকার সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাত শরীফকে। তখন থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অভিযোগ আসে গনমাধ্যমে। ‍আলোকিত সকাল তখন থেকে নিয়মিত এবং গুরুত্বসহকারে রিফাত হত্যা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে আসছে। গতকাল হঠা‍ৎ করে রিফাতের বাবা ও নয়নের মা মিন্নিকে নিয়ে নানা তথ্য দেন গনমাধ্যমকে। মিন্নিকে এক প্রকার হত্যার সাথে জড়িত বলে অভিযোগ করে এবং গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিলে তথ্য পাওয়া যাবে বলেও অভিযোগ করেন তারা। নিচে তাদের বক্তব্য তুলে ধরা হলো:

রিফাতের বাবার বক্তব্য : বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের প্রধান সাক্ষী ও নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে রিফাত শরীফের বাবা আব্দুল হালিম দুলাল শরীফ। শনিবার রাত ৮টার দিকে বরগুনা প্রেসক্লাবে এ সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে আব্দুল হালিম দুলাল বলেন, রিফাত হত্যাকাণ্ডে তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি জড়িত। এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ হিসেবে তিনি যোগ করেন, মিন্নি প্রতিদিন একাই কলেজে যেতেন। ঘটনার দিনও তিনি একা কলেজে গিয়েছিলেন। এরপর মিন্নি ফোন করে রিফাতকে কলেজে ডেকে নেন। কিন্তু কেন? সেটা আপনারাই ইতোমধ্যে দেখেছেন।

আবদুল হালিমের অভিযোগ, এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি নিহত নয়ন বন্ডের সঙ্গে অতীতের বিয়ের কথা গোপন করেছিলেন মিন্নি ও তার পরিবার। নয়নকে তালাক না দিয়েই তারা আমার ছেলের সঙ্গে নিজের মেয়েকে (মিন্নি) বিয়ে করান। তার ভাষ্য, বিয়ের পরেও মিন্নি নয়নের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন।

এর আগে, নিহত নয়ন বন্ডের মা সাহিদা বেগম বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মিন্নি ঘটনার আগের দিনও তার বাসায় গেছেন এবং নয়নের সঙ্গে দেখা করেছেন। তিনি (নয়ন বণ্ডের মা) প্রমাণ হিসেবে মিন্নি যাওয়ার বিষয়ে প্রতিবেশী লোকজনও দেখেছেন বলে ওই সব সংবাদমাধ্যমে জানান।

এদিকে, ঘটনার পর নতুন করে প্রকাশ পাওয়া (দ্বিতীয়) ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, কলেজ গেট থেকে রিফাত শরীফকে ধরে নেয়ার সময় মিন্নি নির্লিপ্ত ছিলেন। এরপর কুপিয়ে জখম করার পর মিন্নি রিফাতকে হাসপাতালে নেয়ার বদলে নিজের জুতা খুঁজছিলেন এবং আক্রমণকারীদের একজন তার (মিন্নি) হাতব্যাগ তুলে দিচ্ছিল। অর্থাৎ আক্রমণকারীদের সঙ্গে তার যে সম্পর্ক ছিল, সেটিও ফুটেজটিতে দেখা গেছে।

আবদুল হালিম আরো বলেন, এতগুলো তরুণ রিফাতের ওপর হামলা চালালো অথচ একটি আঘাতও মিন্নির শরীরে লাগলো না —এটা বেশ রহস্যজনক। কারণ, তারা রিফাতকে খুন করেছে মিন্নির জন্য। যাদের কিনা মিন্নির ওপর পুরো রাগ থাকার কথা, তারাই তাকে স্পর্শই করলো না!

আবদুল হালিম বলেন, রিফাত আঘাতের পর রক্তাক্ত অবস্থায় একাই রিকশায় করে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে যান। এরপর যখন গুরুতর অবস্থায় রিফাতকে অ্যাম্বুলেন্সে বরিশাল নেয়া হয় তখনও মিন্নি তার সঙ্গে যাননি।

আবদুল হালিম আরো বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সব ক্ষেত্রে মিন্নির ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার ঝড় বইলেও কেন তাকে (মিন্নি) আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না, তা আমার বোধগম্য নয়। এ অবস্থায় আমি প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিপির কাছে দাবি জানাই, অবিলম্বে মিন্নিকে আটক করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। আর সেটা করা হলেই রিফাত শরীফ হত্যার মূল রহস্য উদ্‌ঘাটন হবে।

এদিকে, আবদুল হালিমের অভিযোগ প্রসঙ্গে মিন্নির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার বাবা মোজাম্মেল হক তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে বলে গণমাধ্যমকে জানান। তিনি বলেন, ছেলের মৃত্যুতে বাবার মাথা গেছে! তা না হলে এমন কথা তিনি বলতেন না।

তিনি বলেন, এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে আমার মেয়েকে নিয়ে নেতিবাচক নানা মন্তব্য ও খবর প্রকাশ করা হচ্ছে। এ কারণে সে (মিন্নি) সারাক্ষণ কান্নাকাটি করে এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। তাই তাকে শনিবার চিকিৎসকের কাছে নেয়া হয়েছিল। তাদের পরামর্শে তাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। আর এসব অভিযোগের বিষয়ে আমার মেয়ে সুস্থ হলে কথা বলবে।

নয়নের মার বক্তব্য : এবার ‘জিরো জিরো সেভেন’ গ্রুপের প্রধান বন্দুকযুদ্ধে নিহত নয়ন বন্ডের মায়ের কাঠগড়ায় আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে তার স্ত্রী মিন্নির সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে জানিয়েছেন নয়নের মা শাহিদা বেগম। এ মায়ের বর্ণনা বলছে, মিন্নি কোনোভাবেই দোষ এড়াতে পারেন না। নয়ন বন্ড হত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে মিন্নির পরোক্ষ মদদেই। রিফাতের স্ত্রী হলেও মিন্নি অধিকাংশ সময় নয়নকেই দিয়েছে, সেটা সশরীরে সাক্ষাতে কিংবা মুঠোফোনে।

বরগুনার চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান আসামি নিহত নয়নের মা বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বুধবার (২৬ জুন)। কিন্তু আগের দিন মঙ্গলবারও মিন্নি আমাদের বাড়িতে এসেছিল। সে আমার ছেলে নয়নের সঙ্গে দেখা করেছে। ছেলে তো মারাই গেল, এখন আর মিথ্যা কথা বলে কী লাভ? মিন্নি যে ঘটনার আগের দিনও আমাদের বাড়িতে এসেছিল; সেটি আমাদের প্রতিবেশীরাও দেখেছে। আমার ছেলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

শাহিদা বেগম বলেন, শুধু হত্যার আগের দিনই আসেনি, রিফাতের সঙ্গে বিয়ের পরেও মিন্নি নিয়মিত আমাদের বাড়ি আসত। আমার মনে হয়েছে; সে নয়নকে না দেখে থাকতেই পাড়ত না। আমি এ ব্যাপারে মিন্নিকেও কয়েকবার বলেছি, সে কেন এমন করে, কেন আমার ছেলের সঙ্গে বাড়িতে এসে নিয়মিত দেখা করে? রিফাত শরীফ মোটরসাইকেলে করে মিন্নিকে নিয়মিত কলেজে নামিয়ে চলে যেত। কিন্তু মিন্নি কলেজ থেকে সোজা চলে আসত আমাদের বাড়িতে, দেখা করত নয়নের সঙ্গে। তারা দুজন একসঙ্গে সারাক্ষণ থাকত, কথা বলত। মিন্নি নিয়মিত কখনো কলেজে ক্লাস করত বলে আমার মনে হয় না। কলেজের ক্লাস শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে সে আমার বাড়ি থেকে আবার কলেজে চলে যেত। তখন রিফাত শরীফ তাকে বাড়ি নিয়ে যেত, কিন্তু এসবের কিছুই জানত না রিফাত।

নয়নের মায়ের দাবি, এ হত্যার ঘটনার সঙ্গে মিন্নি জড়িত। তিনি বলেন, আমি পরে জানতে পেরেছি মিন্নির সঙ্গে রিফাতের বিয়ে হয়েছে। তখন মিন্নিকে আমার বাড়িতে আসতে মানা করেছি। আমার ছেলেকেও তার সঙ্গে দেখা করতে নিষেধ করেছি। কিন্তু কেউই আমার নিষেধ মানেনি। তারা নিয়মিতই যোগাযোগ রেখেছে। নয়ন কখনই আমার কথা শুনত না। আমার ছেলে তার মন মতো চলত। ছেলে আমার কথা শুনলে এমন নির্মম ঘটনা ঘটত না।

ঘটনার আগের দিন নয়ন বন্ডের বাড়িতে কেন গিয়েছিল; কেনইবা নিয়মিত দেখা করত, এসব বিষয়ে শনিবার (১৩ জুলাই) মিন্নির সঙ্গে কথা বলতে তার বাবা মো. মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। মিন্নির বাবা জানান, মিন্নি খুবই অসুস্থ। শুক্রবার (১২ জুলাই) তাকে চিকিৎসক দেখে গেছে। মিন্নি এ মুহূর্তে কথা বলতে পারবে না, সে ঘুমাচ্ছে। তাছাড়া মিন্নির সঙ্গে কথা বলতে হলে বরগুনা জেলা পুলিশের অনুমতি লাগবে।

গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে স্ত্রীর সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। রিফাতকে কুপিয়ে হত্যার একটি ভিডিও ওই দিনই ফেসবুকে ভাইরাল হয়। রিফাত শরীফের বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলার ৬নং বুড়িরচর ইউনিয়নের বড় লবণগোলা গ্রামে। তার বাবা আব্দুল হালিম দুলাল শরীফ। তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। এ ঘটনায় দায়ের মামলায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কয়েকজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। গ্রেফতার কেউ কেউ বর্তমানেও রিমান্ডে।

মিন্নির বাবার বক্তব্য : বরগুনায় প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছেন রিফাতের বাবা আব্দুল হালিম দুলাল শরীফ।

শনিবার (১৩ জুলাই) রাত ৮টার দিকে বরগুনা প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান শ্বশুর আব্দুল হালিম দুলাল শরীফ।

রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফের এসব অভিযোগ সম্পর্কে মিন্নির সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তার অসুস্থতার কথা জানিয়ে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেন মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর। দুলাল শরীফের মাথা ঠিক নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দুলাল শরীফ হার্টের রোগী। এ কারণে তিনি ভুলভাল বকছেন। তার কথার কোনো ভিত্তি নেই। তার কথায় কান দেয়ারও কিছু নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘রিফাতের ওপর হামলার পর আমি রিফাতকে আমার খরচে বরিশাল নিয়ে যাই। বরিশাল নেয়ার পর সেখানে কিছু লোক আমার ওপর হামলা করে। সেইসব হামলাকারীদের প্ররোচনায় মূলত আজকের এই সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে।’

মিন্নির বাবা কিশোর বলেন, ‘আমার মেয়েটি বিধবা হয়েছে। মেয়ে জামাইয়ের জন্য আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। ভিডিও ফুটেজে রিফাত শরীফকে বাঁচানোর আপ্রাণ প্রচেষ্টা দেখে হাজার হাজার মানুষ আমার মেয়ে মিন্নিকে বাহবা দিয়েছে। আমার মেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রিফাতকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। তারপরও আমার মেয়ে ও আমার পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যে অপবাদ দিচ্ছে রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ।’

মিন্নিকে গ্রেফতারের বিষয়ে বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন বলেন, রিফাত হত্যা মামলাটি স্পর্শকাতর। মামলাটি আমরা অত্যন্ত গুরত্ব সহকারে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করছি। এ হত্যাকাণ্ডে যে জড়িত থাকবে পুলিশ তাকে আইনের আওতায় আনতে বদ্ধ পরিকর।

আস/এসআইসু

Facebook Comments