মিন্নিকে গ্রেফতারের পূর্বে যা ঘটেছে

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার ১ নম্বর সাক্ষী ও তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে নিয়ে হত্যার কাণ্ডের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। হত্যার ঘটনায় ২য় ভিডিও ফুটেজ প্রকাশের পর মিন্নি এই হত্যা কাণ্ডের সাথে জড়িত বলে প্রশ্ন উঠে।

রিফাত শরীফ হত্যার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এ মামলায় পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত এজাহারভুক্ত সাতজন (ছয়জন জীবিত) ও সন্দেহজনক সাতজন আসামিসহ মোট ১৪ জনকে গ্রেফতার করে। এজাহারভুক্ত গ্রেপ্তার চারজন এবং সন্দেহজনক ছয়জন আসামিসহ মোট ১০ জনকে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণের জন্য আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।

এরপর রোববার (১৪ জুলাই) সকালে বরগুনা প্রেসক্লাব প্রাঙ্গনে বরগুনার সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। মানববন্ধনে নিহত রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ, চাচা আবদুল আজীজ শরীফ, জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক অ্যাভোকেট সুনাম দেবনাথ, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মারুফ মৃধাসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

মানববন্ধন চলাকালে সমাবেশে বক্তারা মিন্নিকে রিফাত হত্যার ‘নেপথ্যের নায়িকা’ উল্লেখ করেন। একই সাথে তাকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

কয়েকদিন পর মিন্নিকে গ্রেফতারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেন রিফাত শরীফের বাবা। তিনি বলেন, আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি আগে নয়ন বন্ডকে বিয়ে করেছিল। ওই বিয়ে গোপন করে রিফাত শরীফকে বিয়ে করে মিন্নি। বিষয়টি আমাদের জানায়নি মিন্নি এবং তার পরিবার। কাজেই রিফাত শরীফ হত্যার পেছনে মিন্নির মদদ রয়েছে। তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনলে সব বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাবে।

শ্বশুরের সংবাদ সম্মেলনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে মিন্নি বলেন, আমার শ্বশুর সংবাদ সম্মেলনে যা বলেছেন তা মনগড়া ও বানোয়াট। গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে আমার স্বামী রিফাত শরিফকে নয়ন বন্ডসহ কতিপয় সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করে। সেই হত্যার ভিডিও প্রকাশ পেলে স্বামীকে বাচানোর জন্য আমি যে জীবনের ঝুকি নিয়ে অস্ত্রেরমুখে প্রতিবাদ করেছি, সেই ভিডিও দেখে সারা দেশের মানুষ আমার সাহসের প্রশংসা করেছেন।

পরবর্তীতে আমার শ্বশুর নয়ন বন্ডসহ ১২ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় উল্লেখ নেই যে আমি স্বামী হত্যার সাথে জড়িত, বরং ওই মামলায় আমি ১ নম্বর স্বাক্ষী। বর্তমানে আমার শ্বশুর অসুস্থ্য এবং তার একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে আরও অসুস্থ্য হয়ে পড়েছেন। যখন যা বলেন পরে তা মনে থাকেনা। উল্লেখ থাকে যে, রিফাত হত্যায় আসামীরা বিচারকে অন্যদিকে প্রবাহিত করার জন্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আমাকে হয়রানির চেষ্টা করেছে। যেমন ফেসবুকে বিভিন্ন ছবি এডিট করে পোষ্ট করেছে যা কখনই সত্য নয়।

তিনি আরও বলেন, ০০৭ নামে যে গ্রুপটি বরগুনায় যারা সৃষ্টি করেছেন তারা খুবই ক্ষমতাবান ও বিত্তশালী। তাই তারা এই বিচারের আওতা থেকে দুরে থাকার জন্য আমার শ্বশুরকে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে রিফাত হত্যার বিচারকে অন্যদিকে প্রবাহিত করার জন্য শনিবার বরগুনা প্রেস ক্লাবে আমার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছেন যা সম্পূর্ন মনগড়া ও বানোয়াট। আমার শ্বশুরের সকল বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাই আমি।

আমার স্বামীকে কোপানোর পরে তাকে আমি বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাই। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে রেফার করার কথা শুনে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি এবং জ্ঞান ফিরলে আমি জানতে পারি। আমার নিরাপত্তা দেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বরগুনার পুলিশ সুপারকে ধন্যবাদ জানাই। আমি এক স্বামীহারা অসহায় নারী, আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্রকারীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানাচ্ছি।

এখানেই শেষ না, সকল ঘটনার নায়ক নয়ন বন্ড যখন নিহত হয় ঠিক তখনই সব কিছু নিয়ে মুখ খুলেন নয়নের মা শাহিদা বেগম। তিনি বলেন, ‘রিফাতের সঙ্গে মিন্নির বিয়ের খবর পাওয়ার পর আমি আমার ছেলেকে অনেক নিষেধ করেছি, যোগাযোগ না রাখতে। কিন্তু আমার ছেলে নয়ন কখনও আমার কথা শুনত না। ওর মনে যা চাইতো ও তা-ই করত। নয়ন যদি আমার কথা শুনত তাহলে এমন নির্মম ঘটনা ঘটত না।’

তিনি বলেন, ‘রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২৬ জুন, বুধবার। এর আগের দিন মঙ্গলবারও মিন্নি আমাদের বাসায় এসে নয়নের সঙ্গে দেখা করে। আমার ছেলে তো মারাই গেছে। আমার তো আর মিথ্যে বলার কিছু নেই। মিন্নি যে মঙ্গলবারও আমাদের বাসায় গিয়েছিল তা আমার প্রতিবেশীরাও দেখেছে।’

নয়ন বন্ডের মা আরও বলেন, ‘শুধু হত্যাকাণ্ডের আগের দিন মঙ্গলবারই নয়, রিফাত শরীফের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পরও মিন্নি নিয়মিত আমাদের বাসায় এসে নয়নের সঙ্গে দেখা করত। মোটরসাইকেলে মিন্নিকে রিফাত শরীফ কলেজে নামিয়ে দিয়ে চলে যেত। এরপর মিন্নি আমাদের বাসায় চলে আসত। আবার কলেজের ক্লাস শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে মিন্নি আমাদের বাসা থেকে বের হয়ে কলেজে যেত।’

সব কিছু যখন নাটকিয়তার মধ্যে দিয়ে চলছিল ঠিক তখনই মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) সকাল পৌনে ১০টার দিকে সদর উপজেলার নয়াকাটা গ্রামের বাড়ি থেকে মিন্নিকে বরগুনা পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সঙ্গে তার বাবাকেও নিয়ে যায় পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে মিন্নির সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তাকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। সেইসাথে তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

এরপর বুধবার (১৭ জুলাই) বিকেল ৩ টার দিকে মিন্নিকে বরগুনা জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলা হলে আদালত ৫ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments