মালিঙ্গার ম্যাচ মালিঙ্গারই রইল

আলোকিত সকাল ডেস্ক

আলোর সবটুকুন রইল সেই লাসিথ মালিঙ্গার। বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ শুধুই আঁধার।

এ যেন ধ্রুপদি মালিঙ্গা। ব্যাটসম্যানের আউটসাইড এজ হয়, ইনসাইড এজ হয়। ব্যাটে চুমু না খেলে ভেতর-বাহিরের কানায় শিস কেটে উড়ে যায় বল। ব্যাটসম্যানকে আড়াআড়ি করে ফেলেন; লাফিয়ে উঠতে বাধ্য করেন। এসবের ফাঁকে তিন উইকেট পান লঙ্কানদের ভালোবাসার স্লিংগা। যার শেষটি ম্যাচ শেষ করে দেওয়া বল। এমন বীরের বিদায়, এমন বীরোচিত পারফরম্যান্সে বিদায় কবে হয়েছে কার!

তাতেই গৌণ হয়ে যায় ম্যাচের ফল। মালিঙ্গার ওই শুরুর ৫-২-১২-২ স্পেলেই তো খেলার গন্তব্য আঁকা; ক্যানভাসে শেষ আঁচড়ও তাঁর শিকারে। শেষ পর্যন্ত ৯১ রানে হেরে সিরিজে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু ইনিংসের পরের অংশে বিদায়ি কিংবদন্তির পরের স্পেল নিয়ে যতটা আকর্ষণ, প্রথম ওয়ানডের ফল নিয়ে ততটা আগ্রহ ছিল না কারো।

তুমুল আগ্রহ ছিল বরং শ্রীলঙ্কা ৩১৪ রান করার পরও। এই স্কোর তো খুব সহজেই সাড়ে তিন শ, পৌনে চার শ এমনকি চার শ পর্যন্ত হতে পারত। ৩০ ওভারে দুই উইকেটে ১৯৮ রানে যে পৌঁছে গিয়েছিল স্বাগতিকরা! সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রবল প্রত্যাবর্তন। আট উইকেট হাতে নিয়ে শেষ ২০ ওভারে ঢোকা শ্রীলঙ্কাকে শেষ ১২০ বলে ১১৬ রানের বেশি নিতে দেয়নি তারা। কুশল পেরেরার ৯৯ বলে ১৭টি চার ও এক ছক্কায় সাজানো ১১১ রানের বিস্ফোরক ইনিংস ছাপিয়ে বাংলাদেশের ম্যাচে ফেরা ছিল তাই ম্যাচের মাঝবিরতির মূল আলোচনা। দেশ থেকে উড়ে এসে এক প্র্যাকটিস সেশনের পর একাদশে খেলা শফিউল ইসলামের তিন উইকেট নেওয়ার চেয়ে বেশি তো বটেই!

কিন্তু এক মালিঙ্গাই তো শেষ করে দেন সব। আগুনে বোলিংয়ের দুর্ধর্ষতায়। ইয়র্কারের বিষমাখা ভয়াবহতায়।

কালকের মঞ্চটা সাজানো ছিল তাঁর জন্যই। ১৫ বছরের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ খেলতে নেমেছেন। প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম, গ্যালারি, সমর্থক—সবাই বিদায়ের ডালি সাজিয়ে প্রস্তুত। ৪৯তম ওভারে যখন ব্যাটিংয়ে নামেন মালিঙ্গা, লঙ্কান ক্রিকেটের একনিষ্ঠ সমর্থক পার্সি পাশাপাশি হেঁটে পতাকা উড়িয়ে তাঁকে পৌঁছে দেন ক্রিজ পর্যন্ত। যেন পুরো দ্বীপদেশের হয়ে কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। গ্যালারিতে সব সমর্থকের মোবাইলের আলো জ্বলে ওঠে মুহূর্তে। যেন এক ধ্রুবতারার বিদায়ে তারার ফুলের অর্ঘ্য। প্রথম ইনিংস শেষে সতীর্থরা ব্যাট তুলে দেয় গার্ড অব অনার। যেন গেল দেড় দশকের জন্য অগণিত অবিস্মরণীয় মুহূর্তের জন্য কৃতজ্ঞতার শ্রদ্ধাঞ্জলি। রাঙানো বিদায়ের জন্য শুধু এক রঙিন পারফরম্যান্সই বাকি ছিল মালিঙ্গার।

সেটি তিনি করেন রাজসিকতায়। তাতেই বাংলাদেশের জয়ের রংধনু থেকে রং খসে পড়ে একটু একটু করে। সব রং হারিয়ে ধূসর বিবর্ণতার গহ্বরে ঢুকে যায় দ্রুতই।

মালিঙ্গার জাদু শুরু প্রথম ওভারেই। পঞ্চম বলের ইয়র্কারে থুবড়ে পড়েন তামিম ইকবাল (০); উড়তে থাকে বেলস। এমন ইয়র্কারে কত উইকেট পেয়েছেন; প্রতিপক্ষের ড্রেসিংরুমে ছড়িয়ে দিয়েছেন কত কত আতঙ্ক! ব্যতিক্রম হয়নি কালও। মালিঙ্গা পরের ওভারে সৌম্য সরকারের বিপক্ষে রিভিউ নিয়ে উইকেট পাননি হয়তো। কিন্তু তিনে নামা মোহাম্মদ মিঠুনের আউটসাইড-ইনসাইড এজ করান দুবার। পরের ওভারে সৌম্য-মিঠুনের আরো দুবার। পরের ওভারে আরো একবার। তাঁর পঞ্চম ওভারে আর রক্ষা হয়নি। তৃতীয় বলে টানা তৃতীয় ইয়র্কারে ছত্রখান করে দেন সৌম্যর (১৫) স্টাম্প। ৫-২-১২-২ বোলিং বিশ্লেষণে শেষ হয় মালিঙ্গার প্রথম স্পেল।

আক্ষরিক অর্থে শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনাও। কারণ মালিঙ্গার দুই উইকেটের ঠিক আগে মিঠুন এবং ঠিক পরে মাহমুদ উল্লাহকে হারায় সফরকারীরা। নুয়ান প্রদীপের বলে এলবিডাব্লিউ হয়েও সৌম্যর ঠিক কোন পরামর্শে যে রিভিউ নিলেন মিঠুন (১০), বোঝা দায়। লাহিরু কুমারার লাফিয়ে ওঠা বলে ঠিক কী বোধগম্যতায় আপার কাট করে থার্ড ম্যানে ক্যাচ দিলেন মাহমুদ উল্লাহ (৩), সেটি সত্যি বোধের অগম্য। ফিল্ডিংয়ের সময় বাউন্ডারিতে ক্যাচ ফেলা ওই সিনিয়র ক্রিকেটারের ব্যর্থতার ষোলোকলা তাতে পূর্ণ। ৩১৫ রান তাড়া করতে নেমে জয়ের আশা যে অপূর্ণ থেকে যাবে বাংলাদেশের, দ্বাদশ ওভারে ৩৯ রানে চতুর্থ উইকেট হারানোয় তা স্পষ্ট।

এরপর ম্যাচে হয়েছে আরো অনেক কিছু। মুশফিকুর রহিম ও সাব্বির রহমানের ১১১ রানের জুটি হয়েছে। দারুণ কিছু শট খেলা সাব্বির (৫৬ বলে ৬০) পঞ্চম এবং পুরো ইনিংস একই ছন্দে খেলে মুশফিক (৮৬ বলে ৬৭) অষ্টম ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হয়েছেন। ২২৩ রানে অলআউট হয়ে ৯১ রানে হেরে গেছে বাংলাদেশ। কিন্তু কারো স্মৃতির নিউরনেই তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

থরে থরে সাজানো রইবে শুধু মালিঙ্গার কীর্তি। তাঁর শেষ ওয়ানডের ৯.৪-২-৩৮-৩ বোলিং বীরত্ব। তাঁর শুরুর দুই বিস্ফোরক ইয়র্কার। তাঁর ১০ ওভারের কোটার শেষ ওভারে শেষ উইকেট নিয়ে ম্যাচ শেষ করে দেওয়া। প্রতিপক্ষ হয়েও বাংলাদেশের তাঁকে ম্যাচ শেষে বেরিয়ে আসার সময় দুই সারিতে দাঁড়িয়ে প্রশংসনীয় ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া।

না হয় জয়ের আশায় নামা ম্যাচে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে তামিমের দল। তাতেও তো আর ওই সত্যটি মিথ্যা হয়ে যায় না। লাসিথ মালিঙ্গার মতো কিংবদন্তির এমন রূপকথার মতো বিদায়ই প্রাপ্য!

আস/এসআইসু

Facebook Comments