মানহীন মশার কয়েলে বাজার সয়লাব

আলোকিত সকাল ডেস্ক

সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের ‘বালাইনাশক মান নিয়ন্ত্রণ’ বিভাগের পরীক্ষাগারে বাজারের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মশার কয়েল পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা গেছে, সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১০-৫০ গুণ পর্যন্ত বেশি নিম্নমানের কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে মশার কয়েলে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রদত্ত মশার কয়েলে সর্বোচ্চ দশমিক ০৩ মাত্রার ‘অ্যাক্টিভ ইনগ্রিডিয়েন্ট’ ব্যবহারের নির্দেশনা থাকলেও দেশের বাজারে প্রচলিত মশার কয়েলে বিষাক্ত উপাদান রয়েছে ১-৫ শতাংশেরও ওপরে। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক দেওয়ার পরও মশা মরছে না, কিন্তু ঘরে থাকা অন্যান্য কীটপতঙ্গ ও টিকটিকি মরছে।

এর কারণ সম্পর্কে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের গবেষক মো. মোশাররফ হোসেন সময়ের আলোকে জানান, বাজারে প্রচলিত মশার কয়েলে যেসব কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে তার অধিকাংশ নিম্নমানের। এসব নিম্নমানের কীটনাশক ব্যবহার করার কারণে ফল হচ্ছে উল্টো। মশা মরার বদলে মরছে অন্যান্য প্রাণী। তা ছাড়া এগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নমানের মশার কয়েলের কারণে মানুষ নানা রকম জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে মশার ওষুধের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ায় হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ক্যানসার, ফুসফুস, কিডনি রোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক সময়ের আলোকে বলেন, মশা নিধনের কীটনাশকের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পাইমেথ্রিন। এ ছাড়াও ডি-অ্যালোথ্রিন, ডি-ট্রান্স অ্যালোথ্রিন, ডাইমেফ্লুথ্রিন, ট্রান্সফ্লুথ্রিনসহ অনেক কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। তবে পাইমেথ্রিন তুলনামূলক ভালো। সঠিক মাত্রায় যদি এটি ব্যবহার করা হয় তাহলে জনস্বাস্থ্য বা অন্য কোনো প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর নয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমাদের দেশের মশার কয়েল ও স্প্রে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এর সহনীয় মাত্রা মেনে চলে না। জটিলতা তখনই দেখা দেয়। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক দেওয়ায় ক্ষতি হচ্ছে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের।

ফসলের কীটনাশকের পাশাপাশি মশার ওষুধেরও লাইসেন্স দিয়ে থাকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্ভিব সংরক্ষণ উইং। এই উইংয়ের পরিচালক কৃষিবিদ এজেডএম ছাব্বির ইবনে জামান সময়ের আলোকে জানান, বর্তমানে সারা দেশে তালিকাভুক্ত ১৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৬০০ ধরনের মশার কয়েল এবং স্প্রে তৈরির কীটনাশক আমদানি ও বাজারজাত করছে। এসব ওষুধের উপাদানের মধ্যে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিভিন্ন জেনেরিক ব্যবহার করা হয়। একেক ধরনের মশার জন্য একেক রকম ওষুধ আছে। যেমন বয়স্ক মশার জন্য এক রকম ওষুধ, লার্ভার জন্য আরেক ওষুধ। সাধারণত দেশে মশা নিধনের জন্য পাইমেথ্রিন, বায়োঅ্যালোথ্রিন, ডি-ট্রান্স অ্যালোথ্রিন, টেট্রাথ্রিন, ডেল্টামেথ্রিন, বায়োলেথ্রিন, মেটোফফ্লুথ্রিন, সাইপারমেথ্রিন, ইমিপোথ্রিন ডায়াজোনিনসহ আরও কিছু উপাদান ব্যবহার করা হয়।

তিনি জানান, সম্প্রতি বিএসটিআই বাজার থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মশার কয়েল ও স্প্রে সংরক্ষণ করে পরীক্ষার জন্য আমাদের ল্যাবে দিয়ে যায়। আমরা পরীক্ষা করে দেখতে পাই প্রায় অধিকাংশ মশার কয়েলে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘মজার বিষয় হলো, কোনো প্রতিষ্ঠানকে আমরা যখন রেজিস্ট্রেশন দেই তখন বলা হয়, উৎপাদন শুরু হলে পণ্য এনে আমাদের ল্যাবে পরীক্ষা করতে হবে। তারা প্রথম উৎপাদিত পণ্য এনে পরীক্ষা করে আমাদের ল্যাবে। তখন তাতে সবকিছুই সহনীয় মাত্রার উপস্থিতি পাওয়া যায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাজার থেকে ওই একই কোম্পানির মশার কয়েল এনে পরীক্ষা করলে দেখা যায় কোনো উপকরণই ঠিকমতো নেই। সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়ায় যায়। তার চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে, যেসব কেমিক্যাল তারা ব্যবহার করে সেগুলোও অনেক নিম্নমানের। নিম্নমানের মশার কয়েল ছড়িয়ে পড়ায় দু’বছর ধরে মশার কয়েল ও স্প্রে উৎপাদনের জন্য নতুন রেজিস্ট্রেশন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে ‘পেস্ট্রিসাইড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটি (পিট্যাক)’ রয়েছে। মূলত এই কমিটিই রেজিস্ট্রেশনের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়। এই কমিটির সুপারিশেই বন্ধ রাখা হয়েছে নতুন রেজিস্ট্রেশন।’

বিশিষ্ট বক্ষব্যাধি চিকিৎসক ডা. ইকবাল মাহমুদ মশার ভেজাল কয়েল ও স্প্রের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সময়ের আলোকে জানান, প্রতিটি মশার ওষুধেরই কোনো না কোনো ক্ষতিকর দিক থাকে। কয়েলের ধোঁয়ায় নাক, কান, গলা, ফুসফুস, লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়ম না মেনে এবং সঠিক মাত্রার কয়েল ব্যবহার না করলে মানবশরীরে নানা জটিল রোগ বাঁধবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় শিশুদের। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় ভেজাল মশার কয়েলের কারণে তারা দ্রুত আক্রান্ত হয়। সুতরাং আমার পরামর্শ হলো, নিতান্তই বাধ্য না হলে এসব নিম্নমানের মশার কয়েল ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা উচিত। আর ব্যবহার করা হলেও শিশুরা যে ঘরে থাকে সেখানে যেন কয়েল জ্বালানো না হয়।

এদিকে মশার কয়েল উৎপাদনের লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ থাকলেও বিএসটিআই থেকে অনুমোদন দেওয়া থেমে নেই। বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহেও প্রতিষ্ঠানটি থেকে ছয়টি নতুন ব্র্যান্ডের মশার কয়েল উৎপাদনের অনুমোদন দেওয়া হয়। তেমনই একটি ব্র্যান্ড হচ্ছে গাজীপুরের ‘র‌্যান্ডি’ মশার কয়েল। গত ১৫ জুলাই বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স নিয়ে যান প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার হাবিবুর রহমান।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের রেজিস্ট্রেশন বন্ধ থাকার পরও কীভাবে বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স পেলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাই টাকা থাকলে বাংলাদেশে সবই সম্ভব। বাকিটা বুঝে নেন।’ তার বক্তব্যে একটা বিষয় পরিষ্কার, রেজিস্ট্রেশন বন্ধ থাকলেও অর্থের বিনিময়ে বিএসটিআই থেকে লাইসেন্স নিয়ে ভেজাল মশার কয়েল উৎপাদন করছে অনেকেই।

চলতি মাসের শুরুতে মশা মারার ভেজাল ওষুধ সরবরাহ করায় লিমিট অ্যাগ্রো প্রোডাক্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ডিএনসিসির মশার ওষুধ সরবরাহকারী কোম্পানি লিমিট অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেড। যাদের মশার ওষুধ চারবার টেস্ট করার পর দেখেছি খারাপ মশার ওষুধ। এজন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে লিমিট অ্যাগ্রো প্রোডাক্টসকে বø্যাক লিস্ট (কালো তালিকাভুক্ত) করা হয়েছে। তার মশার ওষুধ আমরা নেব না।

আতিকুল ইসলাম আরও বলেন, এ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের ওষুধ সরবরাহ করার কারণেও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তা ছাড়া ডেঙ্গুর বিস্তারও ঘটছে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের কারণে। সুতরাং যেসব প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের ওষুধ সরবরাহ করছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা আরও কঠোর হবো।

আস/এসআইসু

Facebook Comments