মাছের অভয়াশ্রম এখন মরণফাঁদ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

হালদা নদী থেকে বিভিন্ন উপায়ে মাছ শিকার করে চলেছে একটি চক্র। এ চক্রের সদস্য সংখ্যা অর্ধশতাধিক। গত দুই মাসে নদীতে কার্প জাতীয় অন্তত ৩৫টি মাছ নিধন করেছে তারা। এ ছাড়া এ দুই মাসে নদীতে ইঞ্জিনচালিত জলযানের প্রপেলারের আঘাতে মরে ও পচে ভেসে উঠেছে ৯টি মাছ। অথচ মৎস্য সংরক্ষণ আইন-১৯৫০ অনুসারে হালদা নদীর নাজিরহাট সেতু থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত দীর্ঘ ৪০ কিলোমিটার এলাকাকে মাছের অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছে সরকার।

এ অভয়াশ্রমে সারা বছর যে কোনোভাবে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। মাছের প্রজনন মৌসুম মার্চ থেকে শুরু করে জুলাই পর্যন্ত নদীতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচলও নিষিদ্ধ। সেসব নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হালদা থেকে এভাবে মাছ ধরায় এ অভয়াশ্রম পরিণত হয়েছে মরণফাঁদে। বিশাল নদীর এ অংশ পাহারা দিতে মাত্র দু’জন আনসার সদস্য নিয়োগ দিয়েছে মৎস্য বিভাগ।

সরেজমিন নদীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন বড়শি, ঘেরা জাল, কারেন্ট জাল, হাত জাল এমনকি বিষ প্রয়োগ করে নির্বিচারে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিধন করা হচ্ছে। এর মধ্যে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস, বোয়াল, আইড়, বাইন ছাড়াও ছোট-বড় চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রয়েছে। গত শনিবার নদীর উজানের ধলই ইউনিয়নের শীলেরঘাটা এলাকা থেকে নাঙ্গলমোড়া স্কুল সংলগ্ন এলাকায় মাছ নিধনকারী চক্রকে অন্তত ২৭টি ঘেরা জাল পাততে দেখা গেছে।

এ সময় ঘেরা জাল বসাচ্ছিলেন ফটিকছড়ি উপজেলার সরোয়ার। তিনি জানান, তারা অনেকেই মাছ ধরে ও কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে জাল বসিয়ে চিংড়ি ও ছোট জাতের কার্প জাতীয় মাছ ধরলেও বড় মাছ নিধন করেন না বলে দাবি করেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হালদা নদীর পাড়ঘেঁষা হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজান অংশের কিছু ব্যক্তি মাছ নিধনে জড়িত। এর মধ্যে ধলই বংশাল এলাকা থেকে নাঙ্গলমোড়া এলাকার জাকের, সালাউদ্দিন, ইয়াছিন, বাবুল, অহিদ, রাশেদ, ইয়াকুব, জাহাঙ্গীর; ছিপাতলী এলাকার মতি, মমতাজ, শফি, দুল্লাহ, আলমগীর, আবছার, করিম, গিয়াস, জসিম, কালো নাজিম, ধলা নাজিম; গড়দুয়ারা ও মাদার্শা এলাকার ফখরুল, জহুর আহম্মদ, ইলিয়াছ, হাসেম, মফিজ, বাহাদুর, জাকির, রাখাল জলদাস, মনোরঞ্জন জলদাস, আলী আকবর মাছ শিকারে জড়িত বলে জানা গেছে।

এদিকে হালদা নদী পাহারায় মাত্র দু’জন আনসার সদস্য নিয়োগ দেওয়া বিষয়ে স্থানীয়রা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, যেখানে দারোয়ান দিয়ে একটি দীঘি পাহারা দেওয়ার পরও মাছ চুরি হয়, সেখানে সুবিশাল হালদা নদীতে মাত্র ২ জন আনসার কীভাবে মাছ চুরি বন্ধ করবেন?

নদীতে মাছ শিকারের কথা স্বীকার করে হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা মো. আজহারুল আলম বলেন, ‘দুই উপজেলায় জনবল হিসেবে কর্মকর্তাসহ ১২ জন থাকার কথা থাকলেও রয়েছি মাত্র ৬ জন। মাছের এ প্রজনন মৌসুমে ২ জন আনসার সদস্য দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের একটি ইঞ্জিনচালিত জলযান থাকলেও সেটি অচল। তারপরও হালদায় মাছ নিধন বন্ধে সাধ্যমতো কাজ করে যাচ্ছি।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও হালদা নদী গবেষক মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, নদীতে ইঞ্জিনচালিত জলযান বন্ধ ও মৎস্য নিধনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে নদীতে মা মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাবে।

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, স্থানীয়রা এগিয়ে না এলে শুধু প্রশাসিনক নজরদারি দিয়ে হালদা নদী থেকে মাছ নিধন বন্ধ করা সম্ভব নয়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box