মহাসড়ক ভালো তবুও ভয়

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ঢাকা থেকে রংপুরের দূরত্ব মাত্র ৩৩৫ কিলোমিটার। ক’দিন আগেও যাতায়াতে লাগত কমপক্ষে ১০ ঘণ্টা। আর গত ঈদে লেগেছিল ২০ ঘণ্টা! অথচ ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়কের জয়দেবপুর-এলেঙ্গা অংশ চার লেনে উন্নীত করার পাশাপাশি দুটি ফ্লাইওভার এবং চারটি সেতু ও ওভারপাস চালুর পর সময় লাগছে মাত্র ছয় ঘণ্টা। যদিও ঈদযাত্রায় একই চিত্র থাকবে কি-না, শঙ্কা রয়েছে তা নিয়ে। কারণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও অবৈধ যানবাহন চলাচল, যত্রতত্র পার্কিং, উল্টোপথে চলার মতো বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার কারণগুলো রয়েই গেছে মহাসড়কে।

গত সোমবার সরেজমিনে মহাসড়কের জয়দেবপুর-এলেঙ্গা অংশে দেখা গেছে বিশৃঙ্খলার এই চিত্র। ঢাকা-রংপুর রুটের বাস ‘আগমনী এক্সপ্রেসে’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোস্তফা আজাদ চৌধুরী সমকালকে বলেছেন, ‘সাইকেল থেকে শুরু করে কাভার্ডভ্যান, সব ধরনের গাড়ি এক রাস্তায় চলছে- পৃথিবীর কোথাও এ রকম নেই। ফ্লাইওভার চালুর পর আপাতত স্বস্তি মিলেছে। ছয় ঘণ্টায় রংপুর যাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ঈদে গাড়ির চাপ বাড়লে যানজট হবেই। ওই সময় ফিটনেসহীন গাড়ি এবং অবৈধ যানবাহন বন্ধ করতে না পারলে মহাসড়ক উন্নয়নের সুফল পাওয়া যাবে না। কারণ ছোট গাড়ি রাস্তায় থাকলে দুর্ঘটনা হবেই, মানুষের প্রাণ যাবেই।’

একই কথা বলেছেন বাসচালক ও মালিকরা। পরিবহন বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, রাস্তার উন্নতিতে যে স্বস্তি এসেছে তা ধরে রাখতে শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত শনিবার বলেছেন, মহাসড়কের অবস্থা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো। ভয় শৃঙ্খলা নিয়ে।

সরেজমিনেও মহাসড়কের উন্নতি সহজেই চোখ পড়ে। জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ৮০ ভাগ কাজ শেষ। এ মহাসড়ক দেখতে গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস থেকে সোমবার দুপুর ১টায় মোটরসাইকেলে যাত্রা শুরু হয়। এখান থেকেই শুরু চারলেন মহাসড়কের। নওজোড় পর্যন্ত চারলেনের কাজ শেষ হয়েছে। তবে সেখান থেকে দুই কিলোমিটারের মতো অংশ এখনও দুই লেনের। নওজোরের পর কড্ডায় নতুন সেতু চালু হয়েছে। কড্ডার পর বংশী নদীর সেতু এখনও দুই লেনের। কড্ডার পর বাইমালে মহাসড়ক চারলেনের।

বাইমালের পর কোনাবাড়ি বাজার। প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এ বাজার। ফ্লাইওভার চালুর আগে এ বাজার এলাকা পার হতেই লাগত দুই ঘণ্টা। ফ্লাইওভার চালু হওয়ায় পাঁচ মিনিটেই অতিক্রম করা যায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভার। ফ্লাইওভার চালু হলেও এখনও এর দুই প্রান্তের সংযোগ সড়কে কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ হয়নি। ফ্লাইওভার থেকে নামার অংশের দুই পাশে ব্যারিকেড নির্মাণ কাজ এখনও চলছে।

কোনাবাড়ি থেকে সফিপুর পর্যন্ত রাস্তা চারলেনের। রাস্তার মাঝ বরাবর উঁচু বিভাজক। সেটি টপকেই চলছে সড়ক পারাপার! বড় যানবাহনের চাকার গতি প্রায়ই থমকে যায় উল্টোপথে আসা গাড়িতে। দাপিয়ে চলাচল করে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা। গত ঈদযাত্রায় ২৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল সড়কে। দুর্ঘটনার বড় কারণ ছিল মহাসড়কে ধীরগতির গাড়ি।

গত ৯ মে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ঈদ প্রস্তুতি সভা থেকে নির্দেশ এসেছে, মহাসড়কে ধীরগতির ও অনুমোদনহীন যান চলাচল বন্ধে কঠোর হতে হবে। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, কিছুতেই মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা, বাইক ও অটোরিকশা চলবে না। কিন্তু দীর্ঘ মহাসড়কে অবৈধ যান চলাচল বন্ধে চোখে পড়েনি পুলিশের তৎপরতা। বাস্তবায়ন ঘটেনি নির্দেশের। তবে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান বলেছেন, মহাসড়কে আনফিট গাড়ি ধরতে এবং অনুমোদনহীন যান চলাচল বন্ধে তারা অভিযান পরিচালনা করবেন।

সফিপুরে স্কাউট ক্যাম্পের সামনে কথা হয় ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালক মো. মাসুমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ইজিবাইকের সঙ্গে বাস-ট্রাকের ধাক্কা লাগলেই মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু পেটের দায়ে রাস্তায় নেমেছেন। মহাসড়কে ধীরগতির গাড়ির জন্য পৃথক লেন থাকলে দুশ্চিন্তা থাকত না। মহাসড়কে নামলে পুলিশ ধরে কি-না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুলিশের হয়রানি থেকে রেহাই পেতে মাসে তিনশ’ টাকা দেন।

সফিপুরের পর চন্দ্রা মোড়। তিন রাস্তার এ মোড়ে মিলিত হয়েছে জয়েদপুর-এলেঙ্গা মহাসড়ক এবং ঢাকা-আশুলিয়া মহাসড়ক। উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার গাড়ি যায় এ মোড় হয়ে। গাবতলী থেকে যেসব বাস উত্তরবঙ্গ যায় সেগুলো ঢাকা-সাভার-নবীনগর, আশুলিয়া হয়ে চন্দ্রা দিয়ে যমুনা নদীর বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়। মহাখালী ও গাজীপুর থেকে যেসব বাস যায়, সেগুলোকে ভোগড়া, কোনাবাড়িয়া ও চন্দ্রা হয়ে যমুনা নদী পাড়ি দিতে হয়। টাঙ্গাইলের বাসও চলে চন্দ্রা হয়ে।

চন্দ্রায় ফ্লাইওভার চালুর আগে এ মোড় পার হতেই দু-তিন ঘণ্টা লেগে যেত দুই পাশের গাড়ির চাপে। গত ২৫ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফ্লাইওভার উদ্বোধনের পর এ মোড় পার হতে সময় লাগছে পাঁচ মিনিট। কিন্তু এ সড়কের দুই পাশে আশপাশের শিল্প-কারখানার গাড়ি যেখানে-সেখানে পার্কিং করে রাখা হয়। ঈদযাত্রায় সড়কে ভিড় বাড়লে এ গাড়িগুলো যানজটের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

চন্দ্রার পর টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ। এরপর গোড়াই ও হাঁটুভাঙ্গা বাজার। গত ঈদেও এ বাজার পার হতে যানজটে পড়তে হয়েছে। মির্জাপুর রেলস্টেশন ও নাসির গ্লাস ফ্যাক্টরির আগে রেলওভারপাস। এ রেলপথ দিয়ে যমুনা নদী পার হওয়া সব ট্রেন চলে। ওভারপাসের নিচে কথা হয় রেলের গেটম্যান আবদুল মালেকের সঙ্গে। তিনি জানান, লোকাল ও আন্তঃনগর মিলিয়ে সারাদিন-রাতে ২২টি ট্রেন ৪৪ বার চলাচল করে এ পথ দিয়ে। ওভারপাস নির্মাণের আগে তিন মিনিট করে লাগলেও দিনে দুই ঘণ্টার বেশি সময় ট্রেন চলাচলের কারণে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ রাখতে হতো।

মির্জপুরের পর পাকুল্লা বাজারে মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত হওয়ার আগে যানজটে পড়তে হতো। তবে ঈদেও যানজটের শঙ্কা রয়েছে। কারণ বাজারের একাংশ চলে এসেছে নবনির্মিত মহাসড়কের ওপরে। বাজারের গাড়ি রাখা হচ্ছে রাস্তায়। সংকুচিত হয়ে পড়েছে মহাসড়ক।

ঢাকা-উত্তরবঙ্গের পথে বিভিন্ন জেলায় চলে এনা পরিবহনের বাস। প্রতিষ্ঠানটির মালিক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ সড়ক পরিবহন সমিতিরও মহাসচিব। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের যাত্রীদের ভোগান্তি আগের চেয়ে অনেক কম হবে এবার।

এনা পরিবহনের বাস ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কেও চলে। খন্দকার এনায়েত বলেন, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী-চৌরাস্তা অংশ অন্য সব জায়গার রাস্তার চেয়ে ভালো। এবার মালিকদের রাস্তা নিয়ে অভিযোগ নেই। মেঘনা ও গোমতীতে নতুন সেতু চালুর পর ঢাকা থেকে ফেনী যাওয়া যাচ্ছে আড়াই ঘণ্টায়।

তবে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন হবে কি-না তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন এনায়েত উল্যাহও। তিনি বলেন, সমস্যা হলো ঈদের সময় ঢাকার লোকাল বাসগুলো লাভের আশায় মহাসড়কে চলে যায়। এ বাসগুলো মহাসড়কে চলার উপযুক্ত নয়। ঢাকার কোনো লোকাল বাস যেন ঈদের সময় মহাসড়কে না যায়, সেজন্য মালিকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব।

তবে মহাসড়কে অবৈধ যান চলাচল বন্ধে মালিকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ। ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে গত বৃহস্পতিবার গাজীপুরের পুলিশ সুপার শামসুন্নাহারের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযানও চলে।

ফিরতি পথে চন্দ্রা থেকে গাবতলী পর্যন্ত দেখা যায়, উল্টো পথে গাড়ি চলা, সড়কের ওপর বাজার ও গাড়ি পার্কিংসহ সব অনিয়মই রয়ে গেছে। ঢাকা-নওগাঁ রুটের এসআর পরিবহনের চালক দিদার আলী বলেন, রাস্তা যতই ভালো হোক, এসব অনিয়ম দূর না হলে গাড়ি চালিয়ে শান্তি নেই। তার ও যাত্রী কারও জীবনই নিরাপদ নয়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments