ভিতর বাহির জ্বলছে বিএনপি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) অস্থিরতা যেন কাটছেই না। কোন কূল কিনারাই যেন আর ঠিক হচ্ছে না। দলের মধ্যে স্ববিরোধী বক্তব্যের কারণে নড়বড়ে হচ্ছে দলের রাজনৈতিক ভিত্তি। সম্প্রতি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল থেকে নির্বাচিত পাঁচজন সংসদ সদস্যের শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে জন্ম হয় নানা নাটকীয়তার। বর্তমানে সে নাটকীয় দৃশ্যের মঞ্চায়ন এখন অব্যাহত রয়েছে। তবে প্রকৃতপক্ষে বিএনপির রাজনীতি আসলে কোন দিকে যাচ্ছে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না বলে মন্তব্য করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে গত ২৫ এপ্রিল ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান শপথ গ্রহণ করেন। এরপর অন্য চারজন সংসদ সদস্যও একে একে শপথ পড়ে সংসদের যান। এ নিয়ে তখন বেশ দ্বিধা বিভক্ত অবস্থান দেখা যায় দলটির নেতাদের মধ্যে। জাহিদুর রহমানের শপথ গ্রহণের পরে দল থেকে তাকে বহিষ্কারের কথাও বলেন জ্যেষ্ঠ নেতারা। তবে এরপর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, দলীয় সিদ্ধান্তের কারণেই সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেছেন। তিনি নিজে শপথ গ্রহণ না করায় সমালোচনা হয় দলের ভিতরে ও বাহিরে। তবে শপথের বিষয়টি সব নেতারা ঠিক মেনে নিতে পারেননি বলে দলটির পদস্থ এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে বলেন, ‘তারেক জিয়ার সম্মতিতেই শপথ নেননি সংসদ সদস্যরা। এখন আবার তিনি শপথ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। এভাবে দলের সিদ্ধান্ত উলট পালট হলে আন্দোলন ভিত্তিহীন হয়ে পড়বে।’ বিএনপি এখন খালেদা জিয়ার আন্দোলনে তেমন কোন কর্মসূচি পালন করতে পারছে না বলে নিজেদের দোষে বলেও মন্তব্য করেন এই নেতা।

এপ্রিলের শেষ দিকে মির্জা ফখরুল বাদে দলের বাকি সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের কথা বলে শপথ বাক্য পাঠ করেন। বিষয়টি সবার প্রত্যাশার বাইরে ছিল বলে জনমনে বিস্ময়ই প্রকাশ পায়। এরই মধ্যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্যে ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে ভাঙ্গন দেখা দেয়। এই ভাঙ্গন বিএনপির মিউঁ মিউঁ স্বভাবের কারণে হয়েছে বলে ধারণ করছেন ঐক্যফ্রন্টের শরিকরা। ১৯৯৯ সাল থেকে বিএনপির জোটসঙ্গী বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) গেল ৬ মে বিএনপির সঙ্গে সব প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করার আনুষ্ঠানিক ঘোষনা দেয়। জোট ছাড়ার বিষয়ে দলটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ জানান, দলীয় দ্বিপদ আচরণের কারণে জোট ছেড়েছে বিজেপি। বিএনপির সঙ্গে জোট হয়েছিল আদর্শিকতার কারণে কিন্তু সেই আদর্শ না থাকার কারনে বিএনপির সঙ্গ ছেড়েছে দলটি।

অন্যদিকে ২০ দলের জোটের পাশাপাশি নতুন জোট ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের নিয়েও বিপাকে রয়েছে বিএনপি। দীর্ঘদিন ধরে ২০ দলীয় জোটের সমস্যার কথা প্রকাশ্য হলেও এখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকরাও প্রকাশ্যে নানা সমস্যার কথা বলতে শুরু করেছে। ঐক্যফ্রন্ট থেকে কয়েকজন শরিক বের হওয়ারও উছিলা খুঁজছেন বলেও জোট সূত্রে জানা যায়।

বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানের প্রায় ১ মাস পরে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বিএনপির সংসদ সদস্যদের লোভ নিয়ে কথা বলেছেন। শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে তাঁতী দল আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, ‘বিএনপির এমপিদের শপথ গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারি চাপের চেয়ে লোভ বেশি ছিল। সংসদে যাব না। কিন্তু সংসদে গেলাম। এখানেই তো বুঝতে হবে আমাদের প্রতিশ্রুতির অভাব আছে।’

সংসদে যাওয়া দলীয় সংসদ সদস্যরা অবাধ্য উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অবাধ্যকে বাধ্য করতে পারি না। কারণ তাদের দলের প্রতি ও রাজনীতির প্রতি অঙ্গিকার নাই। এই পাঁচটা অবাধ্যকে যদি আমরা বাধ্য করতে পারতাম তাহলে আজকে আমাদের এই দুঃখ থাকত না।’ ওই অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্যে গয়েশ্বর দলের মধ্যের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন।

বিএনপি জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে মতানৈক্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন একাধিক নেতা। দলের এই দোলাচালের বিষয়ে কথা বলার জন্য ৫ জন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাদের মধ্যে কেউই প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক যুগ্ম মহাসচিব বলেন, ‘বিএনপিতে বর্তমানে যে অবস্থা চলছে তাতে আমরা বিব্রত। কিন্তু কিছুই করার নেই আমাদের। চেয়ারপার্সন কারাগারে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন বিদেশে। এই অবস্থায় কতক্ষণ দল চালানো যায়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box