ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ সাংবাদিকতা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৩০ রানের পাহাড় গড়ে ২১ রানে জিতেছে বাংলাদেশ। গত রোববার এ দাপুটে জয়ে টাইগার বন্দনায় মেতেছে ক্রিকেট বিশ্ব। কিন্তু ফের টাইগারদের বিজয় নিয়ে কটূক্তি করেছে এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ ভারতের শীর্ষ কয়েকটি গণমাধ্যম। তারা বাংলাদেশ দলের দাপুটে জয়কেও ‘আপসেট’ হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছে। যদিও বিগত এক বছরে টাইগারদের জয়ের হার শীর্ষ দলগুলোর চেয়ে কম নয়। তবু ভারতীয় গণমাধ্যম টাইগারদের হেয় করার অনুশীলন থেকে বের হতে পারেনি। যদিও দেশটির কিংবদন্তি ক্রিকেটাররা মাশরাফিদের প্রাপ্য সম্মানই দিয়েছেন। তবু বন্ধুপ্রতিম দেশটির গণমাধ্যমে এসব মন্তব্যে টাইগারভক্তদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়া নাক উঁচু কিছু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার-বিশ্লেষক টাইগারদের হেয় করার মিশনে নেমেছেন। বারবার মাঠে তাদের নাক কেটে দিলেও টাইগারদের উত্থান তারা মেনে নিতে পারছেন না। তবে ‘দ্য ক্যাপ্টেন’ মাশরাফি বিন মর্তুজা এসব সমালোচনাকে পাত্তা দিতে নারাজ। তিনি আসল কাজটা মাঠেই করে দেখাতে বিশ্বাসী।

টাইগারভক্ত ও ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা ভারতীয় এসব গণমাধ্যমের পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, প্রায় দশকজুড়ে ধারাবাহিক জয়ের বৃত্তে থাকা একটি দেশের বিজয়কে এভাবে হেয় করা সম্পূর্ণ নীতিবিরুদ্ধ।

জয়ের পর ভারতের জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল এনডিটিভি তাদের চ্যানেলে বাংলাদেশের জয়কে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে দিয়ে লেখে, ‘বিশ্বকাপের প্রথম দুঃখজনক ঘটনা, বাংলাদেশ চমকে দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকাকে।’

এই লাইনের নিচে লেখা ‘দক্ষিণ আফ্রিকাকে চমকে দিল বাংলাদেশ’। তবে তাদের অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে অবশ্য বাংলাদেশের বেশ প্রশংসাই করা হয়েছে।

এদিকে আরেক শীর্ষস্থানীয় সংবাদ মাধ্যম ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ বাংলাদেশের জয় নিয়ে করা সংবাদে শিরোনামে লিখেছে , ‘ওভালে আন্ডারডগের দিন, দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছে বাংলাদেশ’। একই সংবাদ মাধ্যমের আরেকটি সংবাদের শিরোনাম ‘যখন ডেভিড হারিয়ে দিল গোলিয়াথকে : বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আপসেট’।

এছাড়া ওই দিন জয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো বাংলাদেশকে নিয়ে অবজ্ঞাসূচক ভাষ্য দিতে শোনা গেছে কমেন্ট্রিবক্সে। প্রেসবক্সে রেডিও ধারাভাষ্য শুনতে আইসিসি সাংবাদিকদের তারবিহীন একটি ডিভাইস দিয়েছে। সেই ডিভাইস থেকেই ভেসে এসেছে বাংলাদেশকে নিয়ে অবজ্ঞাসূচক বক্তব্য- ‘আপসেট’ ঘটাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ!’

এখানেই শেষ নয়। জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে আসেন মাশরাফি। এ সময় এক বিদেশি সাংবাদিকের প্রশ্নে ‘আপসেট’ শব্দটি শুনে অধিনায়ক মাশরাফির ভ্রু কুঁচকে গেল। ছুড়ে দিলেন পাল্টা প্রশ্ন, ?‘আপনি বোঝাতে চাইছেন, এটা আপসেট ছিল?’ তখন ওই সাংবাদিক বলেন, বলতে চাইছি, অতীতে আপনাদের এসব জয়কে আপসেট বলতো অনেকে, এখন ধারণা বদলাবে?

এবার দৃঢ় কণ্ঠেই টাইগার অধিনায়ক জানালেন, চারপাশে না তাকিয়ে কেবল নিজেদের উন্নতির পথ ধরেই এগিয়ে যেতে চান তারা।

মাশরাফি বলেন, ‘অবশ্যই, শতভাগ উচিত ধারণা বদলানো। তবে কে কী ভাবছে, সেটা তো আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। লোকে যা বলবে, বলতে থাকুক। আমাদের সেটা ভাবার প্রয়োজন নেই। নিজেদের কাজ করতে হবে। আমি নিশ্চিত, আমাদের ক্রিকেটের খুব বড় ভক্ত তেমন কেউ নেই। তাতে আমাদের কিছু করারও নেই। আমরা কেবল আমাদের খেলায় মন দিচ্ছি।’

এ দিকে টাইগার সমর্থকরা গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের জয়ের বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরে সমালোচকদের রীতিমতো ধুয়ে দিচ্ছেন। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেটে একের পর এক সাফল্যের পালক যুক্ত হচ্ছে। হেলায় হারাচ্ছে ভারত, পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়ার মতো দলগুলোকে। তবু বাংলাদেশকে নিয়ে অবজ্ঞা নতুন কিছু নয়। নিন্দুকরা বিশেষ করে ভারতীয় সমর্থকের বড় একটি অংশ ও বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম বাংলাদেশের অসাধারণ নৈপুণ্য মেনে নিতে পারে না।

এদিকে বিশ্বের বাঘা বাঘা ক্রিকেটবোদ্ধা ও সাবেকরা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিচ্ছেন। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর টুইটারে প্রশংসায় ভাসছেন টাইগাররা। আইসিসির টুইটে লেখা হয়, ‘বাংলাদেশ ২১ রানে জিতেছে। সম্পূর্ণভাবে একটি অসাধারণ অলরাউন্ড টিম পারফরম্যান্স।’

ভারতের সাবেক ক্রিকেটার আকাশ চোপড়া লেখেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকাকে গ্রেফ উড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। নিঃসন্দেহে মাশরাফি সেরা একজন অধিনায়ক। এশিয়ার অন্যতম সেরা।’

সাবেক ওপেনার ভিরেন্দর শেবাগ লেখেন, ‘অসাধারণ খেলেছো। এ জয় তোমাদেরই প্রাপ্য।’

আরেক ভারতীয় কিংবদন্তি ভিভিএস লক্ষ্মণ লেখেন, ‘কৌশলগত দিক দিয়ে টাইগাররা দুর্দান্ত ছিল।’

পাকিস্তানের ক্রিকেট সাংবাদিক মাজহার আরশাদ লেখেন, এ জয় কোনো অঘটন নয়।

ইংল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার মাইকেল ভন বলেন, ‘বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ডার্ক হর্স হয়ে উঠতে পারে।’

খোদ দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক ক্রিকেটার হার্শেল গিবস মনে করেন, ‘সব দিক দিয়েই দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে ভালো খেলেছে বাংলাদেশ।’

ক্রিকেট বোদ্ধারা বলছেন, এসব সমালোচনা ও হেয় করার চেষ্টা অনৈতিক ও অগ্রহণযোগ্য। তবে এগুলো প্রমাণ করে টাইগাররা ক্রিকেট পরাশক্তিদের গাত্রদাহের কারণ হয়ে উঠছে। ফলে এসব সমালোচনা ইতিবাচক, এটাকে পেশাদারভাবে নিতে হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box