ভাঙা কুড়েঘর থেকে লোকসভার রাজ্যমন্ত্রী

আলোকিত সকাল ডেস্ক

শূন্য থেকে সাফল্যের চরম শিখরে পৌঁছে যাওয়া বহু কিংবদন্তীর গল্পই মানুষ শুনেছে। বাস্তবে সত্য হলেও তাদের এই উৎসরণের এক একটি গল্প যেন কল্পনার রূপকথার কাহিনীকেও হার মানায়। তবে তাদের একজনের ইতিহাস খুব বেশি দিন আগের নয়। আর ভাঙা কুঠির থেকে হোয়াইট হাউজে ঠাঁই করে নেয়া, যুক্তরাষ্ট্রের মত পরাক্রমশালী একটি রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে সে ঐতিহাসিক গল্পটি রচনা করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিংবদন্তী জননেতা ‘আব্রাহাম লিংকন : দ্য লেজেন্ডারি প্রেসিডেন্ট অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা।’

তবে এবার সাম্প্রতিক বিশ্বের কাছে তেমনি এক অবিস্মরণীয় গল্পের মহানয়ক হয়ে আবির্ভূত হলেন সদ্য গঠিত ভারতের মন্ত্রিসভার একজন সদস্য। তিনি ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের নীলগিরির গোপীনাথপুর গ্রামের এক সাদামাটা মানুষ, শ্রী প্রতাপ চন্দ্র সারেঙ্গি। যিনি উড়িষ্যাবাসীর কাছে ‘উড়িষ্যার নরেন্দ্র মোদী’ নামে পরিচিত। শিশুকাল থেকেই আধ্যাত্মিক বিষয়ে আগ্রহি সারেঙ্গির জীবনে লোক জগতের মোহমায়া মূল্যাহীন হলেও সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী হিসেবে ঠিকই বাজিমাত করেছেন তিনি।

লোকসভা নির্বাচনে উড়িষ্যার বালাসোর আসন থেকে ১২ হাজার ৯৫৬ ভোটে জিতেছেন প্রতাপ চন্দ্র সারঙ্গি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বৃহস্পতিবার (৩০ মে) দ্বিতীয় মেয়াদে শপথগ্রহণ করেন নরেন্দ্র মোদী। তার কিছু সময় পর, স্থানীয় সময় রাত প্রায় সাড়ে ৮টা নাগাদ দেশটির রাষ্ট্রপতির সচিব মঞ্চে ঘোষণা করেন যে, ‘এবারে রাজ্য মন্ত্রী হিসাবে শপথগ্রহণ করবেন শ্রী প্রতাপ চন্দ্র সারেঙ্গি’। সবাইকে রীতিমত অবাক করে দিয়ে মঞ্চে উঠে আসেন হালকা গড়নের এক ব্যক্তি। একেবারে সাধারণ একজোড়া সফেদ পাঞ্জাবি-পায়জামা গায়ে, হালকা বাতাসে উড়ছে মাথার উষ্কো-খুষ্কো চুল, মুখভর্তি সন্ন্যাসীদের মত দাড়ি! এই লোক নরেন্দ্র মোদীর রাজ্যমন্ত্রী! শহুরে চাকচিক্য বা সৌখিন বিলাসীতার লেশ মাত্র নেই তার কোন কিছুতে, তবে চোখেমুখে ব্যক্তিত্বের আভিজাত্য যেন ঠিকরে পড়ছে!

• কে এই প্রতাপ চন্দ্র সারেঙ্গি?
উড়িষ্যার নীলগিরির গোপীনাথপুর গ্রামে জন্ম শ্রী প্রতাপ চন্দ্র সারেঙ্গির। অল্প বয়সেই আধ্যাত্মিকতায় মজে সন্ন্যাসী হন। তবে অল্পদিনের মধ্যেই ঘরে ফিরে আসেন মা পাগল সারেঙ্গি। তার কাছে পৃথিবী বলতেই মাতৃভক্তি, মাতৃসেবা। সেই সঙ্গে তুলে নেন জনসেবার দায়ভার। স্থানীয় পর্যায় থেকে ক্রমেই আলোচিত হয়ে ওঠা সারেঙ্গি একসময় জনগণের জন্য কাজ করতেই বেছে নেন রাজনীতির পথ, হয়ে উঠেন বিজেপির রাজ্য সংঘের অপরিহার্য সদস্য।

কথিত আছে, কঠিন বাস্তবতার মাঝে কাটানো নিজের সংগ্রামী জীবনের অতীত সত্যকে অনুপ্রেরনা হিসেবে ধারণ করেন বলেই হয়তো সারেঙ্গিকে মূল্যায়ন করেছেন মোদী। তাই দলের প্রতি নিবেদিত একজন নেতা হিসেবে কাজ করার প্রতিদান স্বরূপ ২০০৪ ও ২০০৯ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সারেঙ্গি হয়ে উঠেন বিজেপির বাজির ঘোড়া। আর তার প্রতি হাইকমান্ডের আস্থার প্রতিদান দিয়ে লাগাতার দুই মেয়াদেই বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বিধানসভার বিধায়ক নির্বাচিত হন সারেঙ্গি। কিন্তু তারপরেও তার জীবন চলায় আসেনি এতটুকু পরিবর্তন। বিধায়কের বাসভবন হিসেবে নিজের ছোট্ট কুড়েঘর আর বাহন হিসেবে জীর্ণ সেই সাইকেলটিকেই সঙ্গী করে নেন তিনি।

সততা আর বিশ্বস্ততার পাশাপাশি নির্লোভ ব্যক্তিত্বের উদাহরণ হয়ে ওঠা শ্রী প্রতাপ চন্দ্র সারেঙ্গি শেষ পর্যন্ত লোকসভা নির্বাচনে শুধু জয় লাভ করা নয়, হয়ে গেলেন রাজ্যমন্ত্রী। দেওয়া হয়েছে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ মন্ত্রক এবং পশুপালন, দুগ্ধজাত দ্রব্য ও মৎস্য মন্ত্রকের দায়িত্ব। আর তার মন্ত্রীত্ব প্রাপ্তিতে উড়িষ্যাবাসী যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে, একজন আদর্শ মানুষ ও একজন আদর্শ নেতা হিসেবে সারেঙ্গির সত্যায়নে সেটাই যথেষ্ট।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box