ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ার শঙ্কা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজধানীতে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। চিকিৎসক, নার্সদের দম ফেলার ফুরসত পর্যন্ত নেই। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো রোগী সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। যেখানে ৫০ রোগীর শয্যা রয়েছে, সেখানে ভর্তি আছে ২শ রোগী। ওয়ার্ডের সারিবদ্ধ শয্যার ফাঁকে মেঝেতেও বিছানা পাতা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, হাসপাতালগুলোর বারান্দায়, সিঁড়িতে, আনাচে-কানাচে খানিক স্থান যেখানে আছে, সেখানেই মাদুর বা চাদর বিছিয়ে আশ্রয় জুটছে ডেঙ্গু আক্রান্তদের। এর পরও রোগীর পর রোগী আসছে প্রতিনিয়ত। গুরুতর অবস্থা যাদের, তাদের ভর্তি না করে উপায় নেই। আবার ভর্তি করা হলেও

কোথাও রাখার স্থানটুকু পর্যন্ত মিলছে না। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই বেসামাল হয়ে পড়ছে। সংশ্লিষ্টদের শঙ্কা, এমন নাজুক পরিস্থিতিতে রোগীর সংখ্যা এভাবে বাড়তে থাকলে যে কোনো সময় হাসপাতালগুলোর পুরো ব্যবস্থাপনাই ভেঙে পড়তে পারে।

রাজধানীতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৯০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, ডেঙ্গু রোগী বাড়লে হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের ভর্তি কমিয়ে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া রাজধানীর সব হাসপাতালে ডেঙ্গুর রোগীর চিকিৎসার জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালুসহ শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এবং শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউটেও ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করা হবে।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে মেডিসিন ওয়ার্ড পর্যন্ত বারান্দা, করিডোর, চলাচলের পথ কোথাও খালি নেই। যেসব ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে শয্যা পাননি, তারা এসব স্থানে শয্যা পেতেছেন। মেডিসিন ওয়ার্ডের (পুরুষ) সিনিয়র এক স্টাফ নার্স বলেন, এখানে ৯০টি বেড আছে আর রোগী আছে ৩০৯ জন। এর মধ্যে ডেঙ্গু রোগী ৬৬ জন। এর পর দ্বিতীয়তলার মেডিসিন ওয়ার্ড ৭-এ গিয়েও দেখা গেছে, ওয়ার্ডের বাইরে অনেক রোগী শয্যা পেতেছেন। সেখানে কর্তব্যরত ডা. সোহেলা আক্তার বলেন, মেডিসিন ওয়ার্ডে ৪শ শয্যা আছে। এসব শয্যার বিপরীতে রোগী আছে প্রায় ৭শ। অতিরিক্ত রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি আমরা। এর পর আরও রোগী বাড়লে ম্যানেজ করা কঠিন হবে।

শুধু সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালই নয়, রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল ও হলি ফ্যামিলি হাসপাতালসহ সব সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। প্রতিটি হাসপাতালে শয্যার চেয়ে অনেক অনেক বেশিসংখ্যক রোগী ভর্তি করা হয়েছে অনন্যোপায় হয়ে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেছেন, এপ্রিল থেকে অক্টোবর ডেঙ্গুর জীবাণুবাহক এডিস মশার উপদ্রব বাড়ে। চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। সামনের দিনগুলোয় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে যেতে পারে। যারা ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়, তাদের মধ্যে ১০ শতাংশ রোগীর ডেঙ্গুজ্বর তীব্র হয়ে থাকে এবং তাদের হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ে। অবশিষ্ট ৯০ শতাংশ রোগীকে ভর্তির প্রয়োজন হয় না। আর এ ১০ শতাংশের চাপেই নাজুক ঢাকা মহানগরীর সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতাল ও ক্লিনিক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, সরকারের সব মহলে এখন একটা প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে, যেভাবেই হোক এডিস মশা কমাতে হবে। এটির জন্য কাজ চলছে। মশা কমিয়ে ফেলা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, শুক্রবার আমরা সব হাসপাতালের তথ্য পাইনি। যেসব হাসপাতালের রিপোর্ট পেয়েছি সেগুলোর সঙ্গে আগের রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, যে সংখ্যায় নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে, সেই সংখ্যায় রোগী রিলিজও নিচ্ছে। আমরা মনে করছি না, রাতারাতি রোগী বেড়ে যাবে। হাসপাতালে রোগীর একটা ভারসাম্য থাকবে।

ডা. আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের রোগী ভর্তি হয়। অনেক রোগীকে কিছুদিন পরও চিকিৎসা দিলে চলবে। হাসপাতালে যদি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ধারণার বাইরে চলে যায় তখন আমরা এ ধরনের রোগী ভর্তি কমিয়ে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি বাড়িয়ে দেব। হাসপাতালগুলোয় এডিশনাল স্পেস খুঁজে বের করা যায় কিনা, সে নির্দেশনাও দিয়েছি ইতোমধ্যে। এ ছাড়া আমাদের এ মুহূর্তে দুটি হাসপাতাল আছে। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট আর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট। এগুলোয় ইনডোর চালু হয়নি। প্রয়োজন হলে সেখানে ডেঙ্গু রোগীদের ভর্তির কার্যক্রম শুরু করব। অনেক হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন নেই এমন রোগীকেও ভর্তি করা হচ্ছে, যাদের বাসায় রেখে চিকিৎসা করা সম্ভব। আমরা এ জন্য প্রতিটি হাসপাতালে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালু করতে নির্দেশ দিয়েছি। সেই সেন্টারে ঠিক করা হবে কাদের ভর্তি প্রয়োজন এবং কাদের ভর্তি না দিয়ে বাড়িতে নজরদারিতে রাখলে চলবে। যারা বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নেবেন, তাদের বিপজ্জনক লক্ষণগুলো সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া হবে। ফলে তারা বুঝতে পারবেন ভর্তির জন্য কখন হাসপাতালে আসতে হবে। আগামী রবিবার থেকে ওয়ান স্টপ সেন্টার হয়েছে কিনা তা দেখতে মাঠে নামবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করে থাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন ও কন্ট্রোল রুম। কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যালে ১৩৬ জন, শিশু হাসপাতালে ৮, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ২২, হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ৯, মুগদা হাসপাতালে ৪১, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ৩৭, বিজিবি হাসপাতালে ৩, বারডেম হাসপাতালে ৪, ইবনে সিনায় ১১, স্কয়ারে ৯, সেন্ট্রাল হাসপাতালে ২৯, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ২১ এবং সালাউদ্দিন হাসপাতালে ১৭ জনসহ রাজধানীর হাসপাতালগুলোয় মোট ৩৯০ জন ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বাইরে ঢাকা বিভাগে ১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৩, খুলনা বিভাগে ২ জনসহ মোট ১৬ জন ভর্তি হয়েছেন।

কন্ট্রোল রুমের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের সরকারি ১২টি ও বেসরকারি ৩৫টি হাসপাতালসহ মোট ৪৭টি হাসপাতাল থেকে এ তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। কিন্তু সব হাসপাতালের তথ্য-উপাত্ত পাচ্ছে না কন্ট্রোল রুম। গতকাল শুক্রবার কন্ট্রোল রুমের তথ্যমতে, সরকারি ১২টি হাসপাতালের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়নি। এ ছাড়া বেসরকারি ৩৫টি হাসপাতালের মধ্যে ইবনে সিনা, স্কয়ার, গ্রিনলাইফ, ইসলামী ব্যাংক ও সেন্ট্রাল হাসপাতালসহ ৬টি হাসপাতাল ছাড়া বাকি ২৯টি হাসপাতালে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়নি বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিএসএমএমইউর এক কর্মকর্তা বলেছেন, বিএসএমএমইউ থেকে ডেঙ্গুজ্বরের চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয় না। তাদের এখানে গড়ে প্রতিদিন অর্ধশত ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে শয্যা সংকটের কারণে ভর্তি হয় একেবারেই কম। মিটফোর্ড হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়নি। অথচ প্রতিদিন এ হাসপাতালে অর্ধশত ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়ে থাকে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ৫৭ জন ভর্তি হয়েছিলেন। বাংলাদেশ মেডিক্যালেও গত ২৪ ঘণ্টায় কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তির তথ্য নেই, কিন্তু এর আগের ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ২২ জন ভর্তি হয়েছিলেন। অর্থাৎ বেসরকারি ৩৯টি হাসপাতালের মধ্যে ২৯টিতে গত ২৪ ঘণ্টায় কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে কিনা তার তথ্য পায়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

কন্ট্রোল রুমের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ৯ হাজার ৬৫৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩৭, ফেব্রুয়ারিতে ১৯, মার্চে ১৭, এপ্রিলে ৫৮, মে মাসে ১৮৪, জুনে ১৮২৯ এবং জুলাই মাসে ৭ হাজার ৫১৩ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে ৭ হাজার ৪০৭ জন বাড়ি ফিরে গেছেন এবং ২ হাজার ২৪২ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ জন মারা গেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ডেঙ্গুজ্বরে এ পর্যন্ত ৮ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রকৃতপক্ষে মৃতের সংখ্যা সরকারি তথ্যের চারগুণ। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে তানিয়া আক্তার (২৮) নামে এক চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাতে মারা যান তিনি। তার তথ্য কন্ট্রোল রুমের তালিকায় নেই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেছেন, এবার ডেঙ্গুজ্বরের ধরন বদলেছে। তীব্র জ্বর, ব্যথা, গায়ে র‌্যাশ ও বমি বমি ভাবকেই আগে ডেঙ্গুর লক্ষণ ছিল। এখন ডেঙ্গু হলে আগের কোনো লক্ষণ আর দেখা যায় না। ফলে ডেঙ্গু হেমরেজিক হয়ে দ্রুত শক সিনড্রোমে চলে যাচ্ছে। যার ফলে রোগীর মৃত্যু হয়। আগে জ্বর হলে তিনদিন পর ডেঙ্গুর পরীক্ষা করতে পরামর্শ দেওয়া হতো। এখন ২-৩ দিনের মধ্যেই ডেঙ্গুর টেস্ট করতে হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments