বিতর্কিত পদবঞ্চিতরাও

আলোকিত সকাল ডেস্ক

সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত ১৩ মে (সোমবার) প্রকাশ করা হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নতুন কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা। গত বছরের ১১ ও ১২ মে সংগঠনটির নতুন কমিটি ঘোষণার প্রায় সাড়ে ৯ মাস পর এ তালিকা প্রকাশ করা হয়। কমিটি ঘোষণার পর গত বৃহস্পতিবার ‘পদবঞ্চিত’ নেতাদের একটি অংশ পদপ্রাপ্ত প্রায় ১০০ জনকে ‘বিতর্কিত’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তাদের তালিকা প্রকাশ করেন। তবে পদবঞ্চিত নেতাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে বিবাহিত, চাঁদাবাজি, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত, ছাত্রদলের সাবেক কর্মী, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকাসহ নানা ধরনের অভিযোগ।

সূত্র জানায়, পদবঞ্চিতদের নেতৃত্বদানকারী নেতা কবি জসীম উদদীন হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহেদ খান, কুয়েত মৈত্রী হল ছাত্রলীগের সভাপতি ফরিদা পারভিন, সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী শায়লা, বঙ্গবন্ধু হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আল-আমিন রহমান, বর্তমান কমিটিতে উপ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক বিএম লিপি আক্তার, তিলোত্তমা শিকদারসহ ৩০ জনের অধিক পদবঞ্চিত নেতাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে।

আল আমিন রহমানের বিরুদ্ধে নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনের সময় নারী নিপীড়ন, একটি বেসরকারি চ্যানেলের সংবাদকর্মীর ফোন ছিনিয়ে নেয়া, বৈশাখী কনসার্টে আগুন দেয়াসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে বৈশাখী কনসার্টে আগুন দেয়ার অভিযোগ এসেছে, তাদের কমিটিতে পদ দেয়া হয়েছে। অথচ আমি এর সঙ্গে জড়িত ছিলাম না, কিন্তু আমাকে পদ দেয়া হয়নি। নারী নিপীড়নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি আমার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায়নি।

শ্রাবণী শায়লা ও ফরিদা পারভিনের বিরুদ্ধে রয়েছে হলের পার্লার ও হলের সামনের দোকান থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ। একাধিক পত্রিকায় এই নিয়ে একাধিক খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে শ্রাবণী শায়লা গত বছরের ২৩ জানুয়ারি নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনকারী এক নারী শিক্ষার্থীকে তিনি মারধর করছেন ও পোশাক টানছেন এমন কিছু ছবি গণমাধ্যমে উঠে আসে।

অভিযোগের বিষয়ে ফরিদা পারভিন বলেন, পাঁচ-ছয় মাস আগে এইরকম একটি নিউজ হয়েছিলো। তবে এর কোনো প্রমাণ ছিল না। পরবর্তীতে এই সংবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ লিপিও আমরা দিয়েছিলাম। সেটি ছাপানোও হয়েছে। এ বিষয়ে শ্রাবণী শায়লার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

তিলোত্তমা শিকদারের বিরুদ্ধে আবাসিক কক্ষে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজের ছোটবোনকে রাখার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তার কক্ষে নিয়মবর্হিভূতভাব টিভি, ফ্রিজ, আলমারিও রেখেছেন বলেও জানা যায়। কক্ষে নিয়মবর্হিভূতভাবে বহিরাগত রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ রকম কিছু না। পলিটিক্যাল রুমে আমরা থাকি। কক্ষে গেস্ট পারমিশন ১০০ টাকা করে দিয়ে পরীক্ষার্থী রাখার সিস্টেম আছে। প্রশাসনকে ৩৬০০ টাকা দিয়ে অ্যাডমিশন টেস্টের সময় এবং সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার সময় তার বোনকে রেখেছিলেন বলে জানান তিনি।

শাহেদ খানের বিরুদ্ধে ক্যান্টিনে চাঁদাবাজি ও হলে কক্ষ ভাড়া দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে রাজনীতি করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কোনো নেতা নেই যে তার বিরুদ্ধে দুই একটা নিউজ পত্রিকায় আসেনি। এগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়ে থাকে। আমি বলছি না আমাকেই পদ দেয়া হোক। যারা পরিশ্রমী ও পরীক্ষিত তাদেরই বিতর্কিতদের জায়গায় পদ দেয়া হোক।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য জেরিন দিয়ার বিরুদ্ধে বিলাসবহুল জীবন-যাপন ও তার তার মামা বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য প্রার্থী ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণার পর কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে উদ্দেশ্য করে ফেসবুকে তার একটি স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়। অভিযোগের বিষয়ে জেরিন দিয়া বলেন, ‘‘আমার মায়েরা চার বোন। আমার কোনো মামা নেই। আমার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর অফিসার। তিনি এখন একজন ব্যবসায়ী। এটা সকলেই জানে।’’

ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক দেলোয়ার শাহাজাদা বিবাহিত বলে অভিযোগ ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক স্কুল ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক দেবাশীষ বিরুদ্ধে ঢাবি উপাচার্যের স্বাক্ষর নকলের দায়ে আজীবন বহিষ্কৃত হয়েছেন। তার নামে শাহবাগ থানায় মামলা একটি মামলাও রয়েছে। ডাকসুর বর্তমান সদস্য তানভীর হাসান সৈকতের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও সাবেক কেন্দ্রীয় পাঠাগার সম্পাদক ইলিয়াস সানি, সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক রানা হামিদ, ঢাবি ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি রুম্মান হোসেন, উপ-সম্পাদক আবুল হক রনি, ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী সজীব, ইমদাদ হোসেন সোহাগ, শহিদুল্লাহ হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আরিফ হাসান সিফাত, কবি সুফিয়া কামাল হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শারজিয়া শারমিন সম্পা, বিজয় একাত্তর হল ছাত্রলীগের সভাপতি ফকির রাসেল আহমেদ, শামসুন নাহার হল ছাত্রলীগের সভাপতি জিয়াসমিন শান্তা, সাধারণ সম্পাদক নিপু ইসলাম তন্বীসহ ৩০ জনের অধিক পদবঞ্চিত নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ওঠে।

এর আগে গত সোমবার (১৩ মে) ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটি ঘোষণার পরপরই ছাত্রলীগের একাংশ এই কমিটির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। তাদের অভিযোগ, যোগ্য ও ত্যাগীদের মূল্যায়ন না করে নিষ্ক্রিয়সহ ‘বিতর্কিত’দের পদ-পদবি দেয়া হয়েছে। এ অভিযোগে তারা কমিটির প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন। মিছিল শেষে ওইদিন সন্ধ্যায় মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে মারধরের শিকার হন তারা।

পরদিন মঙ্গলবার (১৪ মে) দুপুরে তারা সংবাদ সম্মেলন করে কমিটি থেকে অযোগ্যদের বের করে যোগ্যদের মূল্যায়ন করতে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন।

মধুর ক্যান্টিনে মারামারির ঘটনায় ছাত্রলীগ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরে গত বুধবার (১৫ মে) মধ্যরাতে আওয়ামী লীগ সভা‌নেত্রীর রাজ‌নৈ‌তিক কার্যাল‌য়ে এক জরুরি সংবাদ স‌ম্মেল‌নে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী সংবাদ সম্মেলন করেন। এতে তারা ছাত্রলীগের কমিটিতে ১৭ জন ‘বিতর্কিত’ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করেন। সংবাদ সম্মেলনে ‘বিতর্কিতদের’ বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের অব্যাহতি দেয়া হবে বলে তারা ঘোষণা দেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments