বিচ্ছেদে কারা এগিয়ে?

আলোকিত সকাল ডেস্ক

সারাদেশে বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাকের হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। আর এই তালাকের হারে নারীরাই এখন সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে। বর্তমানে ঢাকার বাইরেও এই হার উদ্বেগজনক। আশঙ্কার বিষয় সংসার ভাঙ্গার এই হার বিভাগীয় শহরগুলোতে বছর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সব শ্রেণি-পেশার মানুষই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাচ্ছেন।

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, দেশে শিক্ষিত ও কর্মজীবীদের মধ্যে বিচ্ছেদের হার তুলনামূলক বেশি। আর নারীদের বিচ্ছেদের আবেদন করার হার পুরুষদের তুলনায় বেশি। আবার আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়েও অনেকে এখন আলাদা থাকছেন বা সেপারেশনে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, নারীদের মধ্যে শিক্ষার হার যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি তাদের সচেতনতাও বাড়ছে। বাড়ছে স্বনির্ভরতা। তাই তারা এখন আর সব অত্যাচার এবং অনাচার মুখ বুজে সহ্য করতে চাচ্ছেন না। তারা এখন প্রতিবাদী হন। তাতেও প্রতিকার না হলে মুখ-বুঝে নির্যাতন সহ্যের চেয়ে বিবাহ বিচ্ছেদকেই শ্রেয় মনে করছেন।

আর সামাজে প্রচলিত ‘স্বামী বাইরে কী করল তা তার স্ত্রীর দেখার বিষয় নয়’- এই ধারণা এখন আর স্ত্রী’রা মানতে নারাজ। এছাড়া বিভিন্ন কারণে কিছু নারী-পুরষ উভয়ই বিয়ের পর বিবাহ বহির্ভূত রোমান্সেও জড়াচ্ছেন বলে মনে করেন সমাজ বিজ্ঞানীরা। আর তাও বিচ্ছেদ ডেকে আনছে।

ডিভোর্সের সবচেয়ে বড় কারণ হল বিশ্বাসহীনতা। নানা কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাসহীনতা বাড়ছে। এখন দু’জনই কাজ করছেন, বাইরে যাচ্ছেন। তাদের সহকর্মী, বন্ধুবান্ধব এবং পরিচিতি জনের সঙ্গে মিশছেন কথা বলছেন। আর এটা যে বাইরেই তা নয়। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এই যোগাযোগ সার্বক্ষণিক যোগযোগে পরিণত হয়।

নারীদের কাছ থেকে এখন বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন বেশি আসলেও বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাকের তাদেরই ক্ষতির মুখে পড়তে হয় বেশি। বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে নারীকে সমাজের কাছে হেনস্তা হতে হয় বিভিন্নভাবে। বিবাহ বিচ্ছেদের পর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার মত ঘটনাও কম নয়।

মনোচিকিত্‍সকদের মতে, এ ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যাই বেশি৷ এর প্রধাণ কারণ আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি৷ এ দেশে বিবাহ বিচ্ছেদকে সাধারণ ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করা হয় না৷ আর বিবাহ বিচ্ছেদের বেলায় নারীকেই প্রধানত ‘দোষী’ বলে গণ্য করা হয়৷ অনেক নারীই এই চাপ সহ্য করতে না পেরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন৷

তবে বিবাহবিচ্ছেদের প্রধান শিকার হন সন্তানরা। তারা বেড়ে ওঠে ‘ব্রোকেন ফ্যামিলির’ সন্তান হিসেবে। যা তাদের স্বাভাবিক মানসিক বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে৷ তারা এক ধরনের ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে’ ভোগে৷

মনোচিকিত্‍সকরা মনে করেন, সন্তানরা যদি বাবা-মায়ের স্বাভাবিক সঙ্গ এবং ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তাদের জীবন হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক৷ তারা সমাজকে, পরিবারকে নেতিবাচক হিসেবেই দেখে৷তাদের মধ্যে জীবনবিমুখতা তৈরি হয়। যা ভয়াবহ।

তাহলে? এর জবাব কঠিন৷ কারণ বিবাহবিচ্ছেদ কখনো কখনো অনিবার্য হয়ে উঠতেই পারে। তবে স্বামী বা স্ত্রীর মনে রাখা উচিত্‍ তাদের বিচ্ছেদ যেন অন্যের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। আর নিজেদের মধ্যে শুরু থেকেই বিশ্বাসের ভিত গড়ে তুলতে হবে। থাকতে হবে স্বচ্ছতা। থাকতে হবে সহনশীলতা এবং সমঝোতার মানসিকতা। সিদ্ধান্ত নিতে হবে সুস্থির হয়ে। অস্থির সময়ে নয়। রাগ বা অস্থিরতার মধ্যে সিদ্ধান্ত নিলে তা আসলে অনেক সময়ই সঠিক হয় না।

এক হিসাবে দেখা যায়, বিভাগীয় শহরে বিচ্ছেদের হার ৪৯.০৩ শতাংশ আর জেলা শহরে ৩৫.৫ শতাংশ। বিবাহবিডি ডটকম নামের বেসরকারি বিবাহ সম্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান ২০১৭ সালে ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ নির্ণয়’ শিরোনামে প্রশ্নভিত্তিক এক জরিপ পরিচালনা করে। এতে ৪১২ জন অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১০৪ জনই বিবাহ বিচ্ছেদ করেন।

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, দেশে বিচ্ছেদের হার সবচেয়ে বেশি বিভাগীয় ও জেলা শহরে বসবাসকারীদের মাঝে, যা যথাক্রমে বিভাগীয় শহরে ৪৯.০৩ শতাংশ এবং জেলা শহরে ৩৫.৫ শতাংশ। আর উচ্চশিক্ষিত নাগরিকদের মাঝে বিচ্ছেদের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। এছাড়া একক পরিবারে থাকা দম্পতিদের যৌথ পরিবার থেকে আসা দম্পতিদের তুলনায় বিচ্ছেদে যাওয়ার হার বেশি।

আর বিচ্ছেদের কারণের মধ্যে যে বিষয়গুলো জরিপে উঠে এসেছে সেগুলো হলো- পরকীয়া, ভুল বোঝাবুঝি, সাংসারিক দায়িত্ব পালনে অনীহা, সঙ্গীকে মূল্যায়ন না করা, মাদকাসক্তি, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, সন্দেহ প্রবণতা, শ্বশুরবাড়ির লোকদের দুর্ব্যবহার, সন্তান ধারণে অক্ষমতা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তি।

এমনকি ‘এন ওভারভিউ অফ দ্য ইফেক্টস অব ডিভোর্স অন কালচার অ্যান্ড সোসাইটি উইদিন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রবন্ধেও উল্লেখ করা হয়, গ্রামাঞ্চলে কম বয়সে বিয়ে হয় অনেকের। এর ফলে বিচ্ছেদের হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও সমাজবিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনা করে শহর ও গ্রামাঞ্চলে বিচ্ছেদের বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা গিয়েছে। এগুলো হলো- মাদকাসক্তি, স্বামী-স্ত্রীর জীবন যাপনে অমিল, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, নারীর পেশাগত উন্নয়ন এবং আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন। এ ছাড়াও যৌতুক ও বাল্যবিবাহ বিবাহ বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ।

এক সময় পরিবারের কথা চিন্তা করে ও সামাজিক লোক লজ্জার জন্য আপস করে সংসার করলেও নারীরা এখন তারা আপসে রাজি নয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকাতে গড়ে প্রতিদিন ৫০টির ওপর বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়ছে।

সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে, ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় বিচ্ছেদের নোটিস পাঠানো হয়েছে ২৪ হাজার ৯১২টি। এর মধ্যে পুরুষরা পাঠিয়েছে আট হাজার ৯৬টি এবং নারীরা ১৬ হাজার ৮১৬টি। অর্থাৎ নারীরা পুরুষের থেকে দ্বিগুণ বিচ্ছেদের আবেদন করছেন। আর ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম মহানগরীতেও বিচ্ছেদের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) হিসাবে প্রতি দুই ঘণ্টায় সেখানে একটি করে সংসার ভাঙছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চসিকের তথ্যে, সেখানে এক হাজার ৫৭৯টি বিচ্ছেদের আবেদন করা হয়। আর প্রতি মাসে গড়ে ৩৮৪টি আর প্রতিদিন গড়ে ১৫টি বিচ্ছেদের আবেদন করা হচ্ছে, যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। আবেদনকারীর মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হার সবচেয়ে বেশি রাজশাহীতে। প্রতি হাজারে সেখানে এক দশমিক ৯ জন বিচ্ছেদের আবেদন করেন। রাজশাহীর পরপরই সবচেয়ে বেশি বিচ্ছেদ হচ্ছে খুলনায়। সেখানে প্রতি হাজারে এক দশমিক ৩ জন বিচ্ছেদের আবেদন করছেন।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্যে, বিচ্ছেদের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় সালিশি বোর্ডের কর্মকর্তারাও হিমশিম খাচ্ছেন। তাদের মতে, মাত্র ২ শতাংশ দম্পতি সালিশি বৈঠকে আসেন। তারা আরও জানান, বিচ্ছেদের আবেদন পাওয়ার পর দুই পক্ষকে প্রতি মাসে শুনানির জন্য ডাকা হলেও ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো পক্ষ সিটি করপোরেশন অফিসে আসেন না।

ডিভোর্স বা তালাক নিয়ে কাজ করেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তা আমার সংবাদকে বলেন, মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য নারী নিজেই এখন বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। পারিবারিক বন্ধনের চেয়ে অনেকে নিজের পেশাজীবনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে আগের চেয়ে বিচ্ছেদের হার বেড়েছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments