বিচার বিভাগের সঙ্গে বসবেন ডিসিরা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

আসন্ন জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে প্রথমবারের মতো প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক করবেন ডিসিরা। বৈঠকে তারা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের সার্বিক কার্যক্রম তুলে ধরবেন। আলোচনা করবেন মামলা জটিলতা, কারাগার, সরকার ও জনস্বার্থ-সংশ্নিষ্ট বিষয়ে। সামরিক-বেসামরিক সহযোগিতা আরও কার্যকর করতে তিন বাহিনী প্রধানদের সঙ্গেও বৈঠকে বসবেন তারা। সাক্ষাৎ করবেন জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে।

ডিসি সম্মেলনের তৃতীয় দিনের পঞ্চম অধিবেশনে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এবং শেষ দিনের শেষ অধিবেশনে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে বৈঠক করবেন ডিসিরা।

এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ) মো. রেজাউল আহসান সমকালকে বলেন, ডিসিরা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে আলোচনা করেন এবং বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় সমাধান পেয়ে থাকেন। কিন্তু জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি ও তিন বাহিনী প্রধানদের সঙ্গে তাদের আলোচনার কোনো সুযোগ ছিল না। এবারের ডিসি সম্মেলনে সে সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকরা মাঠ পর্যায়ের প্রায় সব বিষয়ই দেখভাল করেন। এবারের সম্মেলনে তারা তাদের কার্যক্রমগুলো জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি ও তিন বাহিনী প্রধানদের কাছে তুলে ধরে মতবিনিময় করবেন। এরই মধ্যে বৈঠকের সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কার্য অধিবেশনগুলো এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, তিন বাহিনীর সঙ্গে সামরিক-বেসামরিক সমন্বয় বিষয়ক অধিবেশনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ নিয়ে আলোচনা হবে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত কতটি মামলার বিচার শেষ করার পাশাপাশি কতজনকে শাস্তি ও টাকা জরিমানা করা হয়েছে, তার চিত্র প্রধান বিচারপতির কাছে তুলে ধরবেন ডিসিরা।

দীর্ঘদিন ধরে বিচারিক ক্ষমতা ফেরত চেয়ে আসছেন জেলা প্রশাসকরা। এ জন্য তারা একাধিক ডিসি সম্মেলনে ২০০৯ সালের মোবাইল কোর্ট আইন সংশোধনের মাধ্যমে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে সরকারি কৌঁসুলি নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশও করেছেন। একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) অন্তত আটটি ধারা সংশোধনসহ আইন ও বিচার সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয়ে সমস্যা চিহ্নিত করে তা থেকে উত্তরণের সুপারিশ করেছেন। একাধিকবার প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তারা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ার সুযোগ তৈরির জন্য দাবিও করেছেন। যদিও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এসব দাবি এবার প্রধান বিচারপতি ও তিন বাহিনী প্রধানদের কাছে সরাসরি উত্থাপন করতে পারেন তারা।

একাধিক অতিরিক্ত জেলা জজ সমকালকে বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ের পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের এই কোর্ট পরিচালনার ক্ষমতা ধরে রাখতে এ কৌশল নেওয়া হয়েছে। তবে বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিচার বিভাগে এখন উল্লেখ করার মতো জনবল রয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষমতা হারালে বিচার বিভাগই তা পরিচালনা করতে পারবেন।

কয়েকজন জেলা প্রশাসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণের পর মাঠপর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। তাই মাঠ পর্যায়ে সরকারের স্বার্থসংশ্নিষ্ট মামলা পরিচালনার বিষয়গুলো নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক হবে। বিচার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়েও কথা হবে।

এ প্রসঙ্গে গাজীপুর জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর সমকালকে বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পরিকল্পিত বৈঠকে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান বিচারপতিও সম্মতি দিয়েছেন। তবে জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে এখনও কোনো কার্যপত্র নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে মামলা জটিলতা, কারাগার ও জনস্বার্থ-সংশ্নিষ্ট ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। নিম্ন আদালতে প্রায় ৩৫ লাখ মামলার জট রয়েছে। এগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হবে। জেলা প্রশাসককে প্রধান করে সম্প্রতি আদালত সহায়তা কমিটি গঠন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ও বাচ্চাদের মামলাগুলো যেন ভিডিও কনফারেন্সে নিষ্পত্তি করা যায়, এ জন্যও পরামর্শ দেওয়া হবে।

হাইকোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ সমকালকে বলেন, মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর মামলা বিচারাধীন আছে। বিচারাধীন কোনো মামলা নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। এ ছাড়া বিচারপতিদের গাইডলাইন অনুযায়ী কোনো বিচারপ্রার্থী বিচারকের সঙ্গে কথা বলতে পারেন না। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকরা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন। আদালতের নির্দেশনাগুলো মেনে চলার বিষয়েও তাদের তাগিদ দেওয়া যেতে পারে।

২০০৭ সালের ১ নভেম্বর উচ্চ আদালতের রায়ে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করা হয়। এরপর সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্বাধীন বিচার বিভাগও প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে নির্বাহী বিভাগের বিচারিক ক্ষমতা অনেকাংশে কমে আসে। তবে মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর আওতায় নির্বাহী বিভাগের ম্যাজিস্ট্রেটরা এখনও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা, ইভ টিজিং নিয়ন্ত্রণসহ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন। কিন্তু এরপরও বিচারিক ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে কয়েক বছর ধরে নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে প্রকাশ্যে ভিন্ন মত দেখা গেছে। ‘নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের সব ক্ষমতা কেড়ে নিতে চাইছে’ বলে অভিযোগও করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে তিনি আইনজীবীসহ বিচার বিভাগ-সংশ্নিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান। সর্বশেষ ২০১৭ সালে মোবাইল কোর্ট আইন অবৈধ ষোষণার ছয় মাস পর আবার বৈধ করা হয়। তবে এ নিয়ে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে চরম বিরোধ রয়েছে।

আগামী ১৪ থেকে ১৮ জুলাই ডিসি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথমবারের মতো এ সম্মেলন পাঁচ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এবার মোট অধিবেশন থাকছে ২৯টি। এর মধ্যে কার্য-অধিবেশন ২৪টি। আর ৫৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের স্থলে ৫৫টি। এবার নতুন করে সংযোজন হচ্ছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ।

আস/এসআইসু

Facebook Comments