বিএনপিকে দুবছর শান্ত রাখতে চায় সরকার!

আলোকিত সকাল ডেস্ক

একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকে অনেকটাই শান্ত দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ। গায়েবি মামলা, ধরপাকড়ের এমন দৃশ্যও কমে গেছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীরাও অতীতের চেয়ে ভালো সময় পার করছেন। রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, শান্ত রাজনীতির দৃষ্টান্ত স্থাপনে সরকারপন্থি বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শে সরকারও কাজ করছে।

কেননা, চলমান পাঁচ বছর আওয়ামী রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। ২০২০ সালে পূর্ণ হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সাল হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী।

ইতোমধ্যে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত মুজিববর্ষ হিসেবে উদযাপন করার ঘোষণাও দিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রধান। মুজিববর্ষ উদযাপনে বিশিষ্টজনদের নিয়ে ১০২ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি এবং বাস্তবায়নের জন্য ৬১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিও ঘোষণা করেছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, ২০২০-২১ সালে দেশে কোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হোক; ক্ষমতাসীন সরকার তা চায় না। তাই আক্রমণাত্মক রাজনীতি থেকেও ফিরে আসছে সরকার। আন্দোলন-সংগ্রাম, সহিংস কর্মসূচিতে মুজিববর্ষ ম্লান হতে পারে; এমন সম্ভাবনাগুলোও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে এখন থেকেই তৎপর ক্ষমতাসীন দল।

এ নিয়ে এর আগে আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘২০২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্ম তারিখ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত মুজিববর্ষ পালিত হবে। এখানে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীও থাকবে। এ সময়ের মধ্যে যেসব জাতীয় ও দলীয় (আ.লীগের) দিবস পড়বে; সেগুলোকেও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হবে।

সারা দেশের ওয়ার্ড, ইউনিয়ন পর্যন্ত এই বর্ষ পালন করা হবে। মুজিববর্ষ সরকারিভাবেও পালিত হবে।’ তিনি জানান, বছরব্যাপি বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে উদযাপিত হবে জন্মশতবার্ষিকী। বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। বিভাগ, জেলা ও ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করা হবে।

রাজনৈতিক, বুদ্ধিজীবী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী এবং গোয়েন্দাসূত্র মতে, ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য হুমকি হতে পারে দুটি দল। একটি হচ্ছে জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি, অন্যটি যুদ্ধাপরাধীর দল জামায়াতে ইসলামী।

এ দুটি দলকে আগামী দুই বছর শান্ত রাখার জন্য ক্ষমতাসীন সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে কৌশলী অবস্থানে রয়েছে। যাতে এ দুটি বছর বিএনপি-জামায়াত আন্দোলনের নামে হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও কিংবা সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করে সরকারকে কোনো ধরনের চাপে ফেলতে না পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, ইতোমধ্যে বিএনপি-জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থান মারাত্মক দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে বড় ধরনের কর্মসূচি দিয়ে টিকে থাকার ক্ষমতা আপাতত বিএনপির নেই।

অন্যদিকে, জামায়াতের ঘরেও জ্বলছে আগুন। শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির পর এমনিতেই জামায়াত রয়েছেন নড়বড়ে অবস্থায়। অন্যদিকে, সেই ঘর থেকে এখন তৈরি হয়েছে আরেক ঘর! স্বেচ্ছায় পদত্যাগ, দলত্যাগীদের নতুন দল গঠনে লেজেগোবরে চলছে দলটিও। অতীতের মতো অগ্নিসংযোগ, জানমালে হামলার সেই পরিস্থিতিও নেই।

তবে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে লন্ডন নেতার নির্দেশে বিএনপি পুনর্গঠনে কিছুটা আতঙ্কের জায়গা রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের জন্য। ইতোমধ্যে বিএনপি ঘরে-বাইরে খালেদার মুক্তির জন্য আন্দোলনের দাবি উঠেছে দলটিতে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ এবং গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও বলেছিলেন— আন্দোলন ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয়।

বিএনপি যদি খালেদার মুক্তি চায়, তা হলে আন্দোলনই হবে একমাত্র পথ। এ ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদার মুক্তি অসম্ভব বলেও জানিয়েছিলেন এই দুই নেতা। ছাত্রদল-যুবদল ও বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটি গঠনের চলমান ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে সরকারের জন্য শঙ্কার জায়গা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। কমিটি গঠনের পর বিএনপি যদি কোনো একক কর্মসূচিতে আসে, তা হলে আওয়ামী লীগের ইতিহাস সময়ে কিছুটা হলেও ভাটা পড়তে পারে।

সমপ্রতি বিএনপির সংসারে ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়েছে। নিজেদের মধ্যে সৃষ্ট সঙ্কট, দূরত্ব এবং ভুল বোঝাবুঝি দূর করে কর্মসূচি নিয়ে আসতে চাইছে তারা। আবার চাঙা হতে চাচ্ছে একটি অংশ। যদিও মির্জা ফখরুল ছাড়া বিএনপির বড় একটি অংশ ড. কামালদের সঙ্গে বসতে রাজি নয়। বিএনপির একটি অংশের দাবি— ড. কামাল ও আ স ম আবদুর রব ক্ষমতাসীন সরকারের এজেন্ট হয়ে কাজ করছেন।

বিএনপি যখন পুনর্গঠন করে নিজেদের একক শক্তি নিয়ে মাঠে নামার চিন্তা করছে, তৃণমূলকে আবার রাজপথে নামানোর কথা ভাবছে, দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সঠিক সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে— ঠিক সেই সময়ে আবার বাধা হচ্ছেন ড. কামাল ও আ স ম রবরা।

বিএনপির বিশ্বস্ত একটি সূত্রের দাবি, বিএনপি একক কর্মসূচি দিয়ে জনগণের কাছে আস্থা অর্জন করুক এটি ঐক্যফ্রন্টের অনেকেই চান না। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনে বিএনপিকে ঐক্যফ্রন্টের কব্জায় ধরে রাখতে ভেলকি কর্মসূচি দেখাতে ড. কামাল-আসম রবরা তৎপর।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল সোমবার বিকাল ৪টায় রাজধানীর উত্তরায় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রবের বাসায় বৈঠক বসেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং ও সমন্বয় কমিটির শীর্ষ নেতারা। নিজেদের টানাপড়েন, দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আগামী দিনে জোটের করণীয় নির্ধারণ করতে বৈঠকে বসেছেন তারা।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, তানিয়া রব, সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, শহিদ উদ্দীন আল মাহমুদ স্বপন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, সাধারণ সম্পাদক হাবীবুর রহমান তালুকদার বীর প্রতীক, গণফোরাম নির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক আবু সাইয়্যিদ, অ্যাড. সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরী। দীর্ঘ দুই ঘণ্টার ঐক্যফ্রন্টের নিষ্ফল বৈঠক, সিদ্ধান্তে অটল কাদের সিদ্দিকী, বৈঠকে আস্থা না থাকায় উপস্থিত হননি জোটের শরিক দল নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না।

বৈঠক শেষে ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র আ স ম আবদুর রব ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘সরকারবিরোধী যত রাজনৈতিক দল আছে, সেসব দলকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের হাত থেকে গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলন অব্যাহত রাখব। সরকারের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ড. কামল হোসেনের নেতৃত্ব আগামী সভা করব। এই আন্দোলনের রূপ হবে বৃহত্তর ঐক্য। ঐক্যফ্রন্টকে আরও বিস্তৃত ও ব্যাপক করতে হবে।

তবে আজকের বৈঠকে ড. কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন না। তার অনুপস্থিতিতে আমরা কোনো সিদ্ধান্তে নিতে পারিনি। তাই বৈঠকটি আজকের মতো স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তীতে আবার বৈঠকে বসা হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত না করা পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্টের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

আমরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছি। ভবিষ্যতে বৃহৎ ঐক্য গড়ে তোলা হবে।’ এদিকে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘ড. কামালের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার পরই আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাব। আমি যে আল্টিমেটাম দিয়েছিলাম, সে বিষয়ে অটল আছি।’

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ঐক্যফ্রন্টের চরিত্র, কর্মফল নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলে কেউ তার জবাব দিতে পারেনি। যে কামালকে নিয়ে ঐক্য সেই ড. কামালের ঘনিষ্ঠজনরাও তাকে মানেন না! সুলতান মনছুর, মোকাব্বির খান কামালের সংসার থেকে চলে যান, তাহলে জনগণ কেন ড. কামালের ঐক্যতে আসবেন? জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢাকাতে অন্তত সাত-আটটি সমাবেশ করার কথা ছিল।

কয়েক লাখ লোককে ঢাকায় একস্থানে জড়ো করার সিদ্ধান্ত ছিল, তার কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি কেন? নির্বাচনের পর ঐক্যফ্রন্ট টানা পাঁচ মাস নীরব কেন? যে সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান শপথ নেয়ার পর বিএনপি মহাসচিব তাদের বেঈমান-বিশ্বাসঘাতক বলেছিলেন, তাদের পথ ধরে যখন অন্যরা সংসদে গেল; তখন এই মহাসচিবই বলেছিলেন— দলীয় সিদ্ধান্ত।

এতে করে কি জনগণ বিভ্রান্ত হয়নি? এসব প্রশ্নের কোনো জবাব না আসায় নিষ্ফল বৈঠক হয় ঐক্যফ্রন্টের। ঐক্যফ্রন্টের ক্ষমতা নিয়ে এর আগে শরিক নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার ভাষ্য ছিল—‘ঐক্যফ্রন্ট কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, বিষয়টি ঐক্যফ্রন্টের বড় দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি নির্ভর করছে বিএনপির ওপর। পাঁচ মাস নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকলাম, সে নিষ্ক্রিয়তা ভাঙতে পারে বিএনপি।’

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box