বাড়ছে ভারী অস্ত্রের বিকিকিনি ও মজুদ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

গত কয়েক বছর ধরেই অস্ত্রের ব্যবহারে খুনোখুনির পরিমাণ কমে এসেছে অনেকটাই। এমনকি আগের মতো এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের যেসব গ্রুপগুলো সক্রিয় ছিলো, সেসবের শীর্ষ নেতারাও গ্রেপ্তার হয়েছে।

কেউ কেউ পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতও হয়েছে। কিন্তু সমপ্রতি নতুন করে রাজধানীতে অবৈধ অস্ত্রের বিকিকিনি ও মজুদ বাড়ছে বলেও তথ্য পাচ্ছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

আগে জঙ্গিরা শুধু বিস্ফোরক বা হাতে তৈরি বোমা ব্যবহার করলেও গত কয়েক বছর ধরে তাদের মধ্যেও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। টার্গেট কিলিংয়ের জন্যই জঙ্গিরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতো।

সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, সেমি অটোমেটিক রাইফেল একে-২২ এতদিন ব্যবহার হয়েছে বিভিন্ন দেশের পুলিশ বা ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণে। কিন্তু বাজারে আরো আধুনিক প্রশিক্ষণ-রাইফেল চলে আসায় হঠাৎই বাজার হারিয়েছিল এই নকল অ্যাসল্ট রাইফেল।

তারপরই আবার অস্ত্রের কালোবাজার ছেয়ে গেছে পয়েন্ট টু-টু বোরের এই হাল্কা রাইফেলে। নেপাল হয়ে বিহারে ঢুকে দেদার বিক্রি হচ্ছে একে-২২। সীমান্ত পেরিয়ে আসে বাংলাদেশে। গুলশানের হামলায় জঙ্গিরা এই রাইফেলই ব্যবহার করেছে। নারায়ণগঞ্জের জঙ্গি ডেরাতেও আইএস পতাকার সঙ্গে একে-২২ রাইফেল পায় পুলিশ।

বাংলাদেশের জঙ্গিদের হাতে কীভাবে পৌঁছল একে-২২ এমন প্রশ্নে গোয়েন্দারা বলছেন, দেশে সাধারণ দুষ্কৃতকারী থেকে জঙ্গি সবাই অস্ত্র আনে পড়শি দেশ ভারতের বিহার থেকে।

কোন পথে একে-২২ রাইফেল বাংলাদেশে আসছে, সে বিষয়ে সূত্র জানায়, নেপাল থেকে বিহারে আসা একে-২২ পশ্চিমবঙ্গের মালদহ-মুর্শিদাবাদ হয়ে পৌঁছে যায় বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জে। সেখান থেকেই তা যাচ্ছে জঙ্গিদের হাতে। বাংলাদেশে জঙ্গিদের কাছে একে-২২ রাইফেলের ভালো মজুদ রয়েছে বলেও আশঙ্কা গোয়েন্দাদের।

অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোমানিয়ায় তৈরি আধা স্বয়ংক্রিয় একে-২২ রাইফেল থেকে প্রতি মিনিটে ৫০টিরও বেশি গুলি বেরোয়। একে-৪৭-এর নকল করে বানানো এই রাইফেল আমেরিকায় খোলা বাজারেই বিক্রি হয়। দাম ৩০০ ডলার।

প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার হয় বলে এই রাইফেলের আরেক নাম ‘ট্রেনার’। এমন ভয়ঙ্কর অস্ত্র দেশে ঢুকে মজুদ হতে থাকায় গোয়েন্দাদের ভাবিয়ে তুলেছে। তবে তারা বলছেন, একে-২২ রাইফেলের উৎস এবং এর গন্তব্য বের করার চেষ্টা চলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, রাজধানী ঢাকায় অত্যাধুনিক ও ভারী অস্ত্রের জোগান বাড়ছে। গত কয়েক দিনে একাধিক অভিযানে একে টোয়েন্টি-টু অটোমেটিক রাইফেলসহ বিদেশি অত্যাধুনিক অস্ত্র উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এসব অস্ত্রের গন্তব্য নিয়ে চিন্তিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। পেশাদার অপরাধী নাকি জঙ্গিদের কাছে যাচ্ছে এসব অস্ত্র? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গোয়েন্দারা এখন মাঠে।

জঙ্গি থেকে পেশাদার কিলার-সবারই হাতে এখন রোমানিয়ায় তৈরি অ্যাসল্ট কালাশনিকভ রাইফেল। তবে এই রাইফেল একে-৪৭ বা একে ৫৬-র মতো কুলীন গোত্রের নয়। এর নাম একে-২২।

গত মাসে রাজধানীর শ্যামপুর থেকে একে-২২ অটোমেটিক রাইফেল উদ্ধার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট সিটিটিসি।

গত বুধবার খিলগাঁও থেকে উদ্ধার হয় আরো একটি একে-২২ অটোমেটিক রাইফেল। এ সময় গ্রেপ্তার হয় তিনজন পেশাদার কিলার। গত ছয় মাসে রাজধানীতে আরো তিনটি একই ধরনের ভারী অস্ত্র হাতবদল হয় বলেও খবর রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে।

জানা গেছে, ২০১৬ সালে হলি আর্টিজান বেকারিতে যে একে-২২ রাইফেল ব্যবহার করেছিল জঙ্গিরা, ঢাকা থেকে উদ্ধার হওয়া এসব অস্ত্র একই।

এছাড়া ওই বছরের ২৬ জুলাই কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানাতেও অভিযানের পর পুলিশ কর্মকর্তারা জানতে পারেন, একটি একে-২২ অটোমেটিক রাইফেল নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল এক জঙ্গি।

সর্বশেষ খিলগাঁও এলাকা থেকে একে-২২ রাইফেল উদ্ধারের পর পুলিশ জানায়, রাজধানীর খিলগাঁও সিপাহীবাগ এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে অত্যাধুনিক একে-২২ রাইফেলসহ দুই সহোদরসহ সন্ত্রাসী চক্রের তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

তারা হলো— খান মো. ফয়সাল, রেজাউল আবেদীন ওরফে জুয়েল ও জাহেল আল আবেদিন ওরফে রুবেল। তাদের কাছ থেকে একে-২২ রাইফেল ছাড়াও উদ্ধার হয়েছে চারটি বিদেশি পিস্তল, একটি বিদেশি রিভলবার ও ৪৭ রাউন্ড বিভিন্ন অস্ত্রের গুলি।

সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ সংঘটনের জন্য তারা ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী হিসেবে কাজ করত। চাঁদাবাজি ও হত্যা ছিলো তাদের প্রধান কাজ।

বিদেশেও এই চক্রের সদস্য রয়েছে। বিদেশ থেকে তাদের দলনেতার নির্দেশ পেলেই মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মানুষ হত্যা করাই ছিলো তাদের পেশা।

ঢাকার বাইরে মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই থেকে দীর্ঘদিন ধরে এই কারবারের নিয়ন্ত্রণ করছে এক শীর্ষ সন্ত্রাসী।

তাকে গ্রেপ্তার করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। আর এই সুযোগে পর্দার আড়ালে অর্থাৎ দেশের বাইরে থেকে তিনি তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছেন।

গত শনিবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, খিলগাঁও সিপাহীবাগ এলাকার বায়তুল হুদা মসজিদ সংলগ্ন ২৬৯/এ/ক নম্বর ফাইভ স্টার নিবাসের সামনে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ও গুলিসহ তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments