বাস কিনতে ব্যর্থ বিআরটিসি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজধানীসহ সারা দেশে গণপরিবহন সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাস মালিকরা ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করছে।

তাই নিরাপদ ও কম খরচে ভ্রমণের জন্য সরকার বিআরটিসির জন্য ৩০০ ডাবল ডেকার (দ্বিতল বাস), ১০০ সিঙ্গেল ডেকার এসি সিটি বাস, ১০০ সিঙ্গেল ডেকার এসি দূরপাল্লার (ইন্টারসিটি) বাস এবং ১০০ সিঙ্গেল ডেকার নন এসি বাস কেনার অনুমোদন দেয়।

কিন্তু বিআরটিসি নির্ধারিত সময়তো দূরের কথা মাঝে এক বছর সময় বাড়িয়ে গত জুনেও ওইসব বাস আনতে পারেনি। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে আরও ছয় মাস সময় বাড়াতে একটি প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে বিআরটিসির চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব ফরিদ আহমদ ভূইয়া আমার সংবাদকে বলেন, এ পর্যন্ত অগ্রগতি ৯০ শতাংশ। ভোটের সময় টিম পাঠাতে এক মাস দেরি হওয়ায় অসক লেল্যান্ড ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করা সম্ভব হয়নি।

তাই বাস আসতেও দেরি হয়েছে। তবে বর্তমানে সিঙ্গেল এসি বাস চলে এসেছে। ঈদের আগেই ৮ আগস্ট বাকি সব বাস পোর্টে (বন্দর) চলে আসবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে এ অতিরিক্ত সচিব বলেন, ভ্যাট, রেজিস্ট্রেশন ফি, এলসিসহ বিভিন্ন কারণে ব্যয় বাড়ছে প্রায় ১৭ কোটি টাকা।

এটা সরকারি অর্থ থেকে ব্যয় করা হবে। তবে ডিপিপির চেয়ে ওপেন টেন্ডারে কম দামে বাস পাওয়া গেছে। তাই ঋণের পরিমাণ কমছে প্রায় ৭৬ কোটি টাকা। এ জন্য প্রকল্পটি সংশোধন করতে ছয় মাস সময় চাওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে প্রকল্পের পুরো কাজ বাস্তবায়ন হবে বলে তিনি জানান।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, রাজধানীসহ সারা দেশে গণপরিবহনে ভয়াবহ সংকট। এ সংকট মোকাবিলা ও যাত্রীসেবা বৃদ্ধির জন্য সরকার উদ্যোগ নেয়।

এরই অংশ হিসেবে ভারতীয় ২০০ কোটি ডলারের সহজ শর্তের ঋণ (এলওসি-২) থেকে ‘ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি)-এর আওতায় বিআরটিসির জন্য দ্বিতল, একতলা এসি ও নন-এসি বাস সংগ্রহ’ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় প্রস্তাব করে। তা আমলে নিয়ে সরকার ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট অনুমোদন দেয়।

ধরা হয় প্রায় ৫৮১ কোটি টাকা। এরমধ্যে ভারতীয় ঋণ ৪৩৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং বাকি ১৪৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের জুনে এসব বাস কেনার জন্য বিআরটিসিকে সময়সীমা বেধে দেয় সরকার। এসব বাসের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয় ১২ বছর।

ভারতীয় কোম্পানি অশোক লেল্যান্ডসহ তিনটি কোম্পানির সঙ্গে বিআরটিসি চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী অসক লেল্যান্ডেরই এসব বাস সরবরাহ করার কথা। ১০ শতাংশ খুচরা যন্ত্রপাতিসহ ৩০০ ডাবল ডেকার বাসের দাম ধরা হয় ২৫৫ কোটি টাকা।

প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ৮৫ লাখ টাকা। ১০০টি সিঙ্গেল ডেকার এসি সিটি বাসের দাম ধরা হয়েছে ৮১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। প্রতিটির দাম পড়ে ৮১ লাখ ৩২ হাজার টাকা। ৮২ কোটি ৭০ লাখ টাকায় ১০০টি এসি ইন্টারসিটি বাসের দাম নির্ধারণ করা হয়।

অর্থাৎ প্রতিটির দাম ৮২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এছাড়া ১০০টি সিঙ্গেল ডেকার নন এসি বাস কিনতে খরচ ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা। প্রতিটির দাম পড়ে ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা।

কিন্তু বিভিন্ন কারণে ওই বাস দেশে আনতে পারেনি বিআরটিসি। এর আগে মাঝপথে বিআরটিসি একবার দাবি করলে ব্যয় ঠিক রেখে ২০১৮ সালে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী সংশোধন করে এক বছর সময় বাড়ান। গত জুনে ওই নির্ধারিত সময়ও শেষ হয়ে গেছে। তারপরও কাজ হলো না শেষ।

সূত্র আরও জানায়, অনেক বাস কেনা হয়নি। তাই করণীয় ঠিক করতে ১১ জুন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সচিব মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে প্রজেক্ট স্ট্রিয়ারিং কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় বলা হয় ৬০০ বাস কেনার জন্য সিডি ও ভ্যাট খাতে ১০১ কোটি ৬২ লাখ টাকার জায়গায় লাগবে ১২৫ কোটি টাকা। প্রতিটি বাসে ১০ হাজার টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি বৃদ্ধি পাওয়ায় বেশি লাগবে ৬০ লাখ টাকা।

একইসঙ্গে এলসি ও সিএন্ডএফ কমিশন খাতে ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকার সঙ্গে আরও লাগবে ১৬ লাখ টাকা। এই তিন অঙ্গে ব্যয় বেড়ে গেছে ১৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা। যা দেশি অর্থ থেকে ব্যয় করা হবে।

অপরদিকে চারটি প্যাকেজের আওতায় তিনটি কোম্পানি ওইসব বাস সরবরাহের জন্য বিআরটিসির সঙ্গে চুক্তি করে। তবে অসক লেল্যান্ডই ৫০০ সরবরাহ করার কথা।

কিন্তু অসক লেল্যান্ড চিঠিতে সাফ জানিয়ে দিয়েছে নির্ধারিত সময় অর্থাৎ জুনে তা সম্ভব না। আরও ছয় মাস সময় লাগবে। এ জন্য ছয় মাস সময় বাড়ানো দরকার বলে সভায় সিদ্ধান্ত হয়। তবে ঋণের শর্ত হিসেবে বাসের পুরো অর্থ ঋণ থেকে পরিশোধ করা হবে।

অপরদিকে, ডিপিপিতে যে মূল্য প্রাক্কলন করা হয়েছিলো প্রকৃত মূল্য তা থেকে কম হওয়ায় ঋণের পরিমাণও ৪৬৯ কোটি টাকা থেকে কমে ধরা হয়েছে ৩৯৩ কোটি টাকা।

এ জন্য প্রকল্প সাহায্য কমছে প্রায় ৭৬ কোটি টাকা বা ১৬ শতাংশ। এ জন্য প্রকল্পটি দ্বিতীয়বার সংশোধন করা দরকার।

সূত্র আরও জানায়, মে মাস পর্যন্ত ৩০০ বাস কেনার আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১৬ দশমিক ১১ শতাংশ, ১০০ সিঙ্গেল এসি সিটি বাসের অগ্রগতি ২৭ শতাংশ, ১০০ সিঙ্গেল এসি ইন্টারসিটি বাসের অগ্রগতি ১৮ দশমিক ১৬ এবং ১০০ নন-এসি বাসের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। এ জন্য দ্বিতীয়বার প্রকল্পটি সংশোধন করা দরকার।

অনুমোদনের জন্য ২য় সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

তা যাচাই করতে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভা শেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে সূত্র জানায়।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের জুন মাসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে ২০০ কোটি ডলারের দ্বিতীয় এলওসি ঋণের সমঝোতা ও ২০১৬ সালের মার্চে দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি হয়।

ভারতীয় দ্বিতীয় এলওসির আওতায় ১৫টি প্রকল্প থেকে প্রথমবারের মতো ৬০০ বাস কেনা প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় সরকার।

আস/এসআইসু

Facebook Comments