বামের ভোট রামে কেন?

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের মধ্যদিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের হাত ধরে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস যুগের যবনিকাপাত ঘটলো বললে হয় তো বাড়িয়ে বলা হবে না। ২০১১ সাল থেকে একচ্ছত্রভাবে রাজ্যক্ষমতার দখলে থাকা মমতা বন্দোপাধ্যায়ের দুর্জয় দুর্গে এবার প্রলঙ্করী হানা দিলো মোদী-শাহের গেরুয়া বাহিনী। তাতে একথা নিশ্চিত যে, এক সময় যেভাবে এ রাজ্য থেকে বামেদের মূলোৎপাটনের মাধ্যমে ক্ষমতার দখল নিয়েছিলো মমতার তৃণমূল কংগ্রেস; ঠিক একইভাবে গেরুয়ে প্রলয়ে বিপর্যস্ত হতে চলেছে তারাও।

তৃণমূলের রাজ্যে গেরুয়া বাহিনীর এই উত্থানের নেপথ্যে একদিকে যেমন মমতার দলের লাগামহীন রাজ্য শোষণ, সাম্প্রদায়িক তোষণ, দুর্নীতি ও মাঠ পর্যায়ে নেতাদের অত্যাচারে জর্জিত মানুষের ‘অনাস্থা প্রকাশে’র দায় রয়েছে। অন্যদিকে রয়েছে মার্ক্সবাদীদের কাছে বাম রাজনীতির হন্তক হিসেবে পরিচিত মমতার প্রতি রাজ্যের বাম ঘরানার অনুসারীদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। লোকসভা নির্বাচন-২০১৯ নিয়ে দৈনিক জাগরণের পশ্চিমবঙ্গের ভোট কড়চার দ্বিতীয় ও শেষ পর্বের আলোচনায় থাকছে সেই বামেদের ভোটে বিজেপির ভোটব্যাংক ভরার কথা, ‘বামের ভোট রামে কেন?’

এক্ষেত্রে অবশ্য এমনটা বলা যাবে না যে, বাম না থাকলে ‘শ্রীরামের লঙ্কা জয়’ অসম্ভব ছিলো। কার্যত, শ্রীমান লক্ষ্মণের মত মমতার রাজ্য লক্ষ্য করে মোদীর চিরবিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী অমিত শাহের ছোঁড়া অব্যর্থ মৃত্যুবাণেই বাংলায় প্রাণপাত হয়েছে তৃণমূলের। আর এসত্য অনস্বীকার্য। মূল বিষয়ে আলোকপাতের পূর্বে একটু ইতিহাসের পাতায় নজর দেয়া যাক। যাতে বোঝা যাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির জন্য আসলে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ বামতত্ত্ব। ইতিহাস প্রেক্ষাপট আমলে নেয়ার পাশাপাশি দৈনিক জাগরণের কলকাতার বিশেষ সংবাদদাতা ভাস্কর সেনগুপ্তের প্রতিবেদনে প্রকাশিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও এক্ষেত্রে সংযোজিত হলো।

ভারতবর্ষের বুকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন চলাকালীন সময় থেকেই মার্ক্সবাদী সমাজতান্ত্রিকতার ব্যাপক উত্থান ঘটে। পুঁজিবাদী শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, নিপীড়িত সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে রাজপথে নামা ক্রান্তিকামী তরুণ সমাজ, বিশেষ করে বাঙালি তরুণদের জন্য তখন থেকেই, তাদের স্বত্তায় জড়ানো ‘লাল সালু’ হয়ে ওঠে মার্ক্সিজম তথা বামপন্থী সমাজতান্ত্রিক মতবাদ। মার্ক্সবাদী সমাজতান্ত্রিকতায় বিশ্বাসী এই রাজনৈতিক তত্ত্বই বামপন্থী রাজনীতির মতাদর্শ হিসেবে পরিচিত।

অবিভক্ত ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, সমাজ সংস্কার, শিক্ষা বিস্তার, সাহিত্য চর্চা হতে শুরু করে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার গোড়াপত্তনের মত প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ যাদের অবদানে আলোকিত, তাদের অধিকাংশই ছিলেন বাঙালি। আর এই বিপ্লবী বাঙালিদের হাত ধরেই বাংলা ভাষাভাষি ভূখণ্ডে বামপন্ত্রী সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির প্রসারও ঘটে সবচেয়ে বেশি। পরবর্তীতে এ উপমহাদেশে বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক চর্চা শুরু হয়, গড়ে উঠতে থাকে একাধিক রাজনৈতিক দল। তবে এর মাঝেও সমাজবাদী ঐতিহ্য ধরে রেখে নিজেদের রাজনৈতিক চর্চা অব্যাহত রাখে বামেরা। বিশেষ করে বাঙালি অধ্যুষিত বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি বিশাল রাজনৈতিক গোষ্ঠী বাস্তবেই একটি প্রগতিশীল সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করতে সক্ষম হয়। তা না হলে হয়তো এ অঞ্চলে আজকের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটই কখনো সৃষ্টি হতো না।

স্বাধীনতা উত্তর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতাসীন ছিল বামেরা। ২০১১ সাল পর্যন্ত প্রায় একচ্ছত্রভাবে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে সক্ষম হয় তারা। কিন্তু রাজ্যে বাম রাজনীতির ধারা খর্ব হয় বর্তমানে রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের আধিপত্যের কারণে। তবে এর কারণ যে কেবলই মমতার জনপ্রিয়তা তা কিন্তু নয়। বরং বলা চলে নিজের অবস্থান সৃষ্টির জন্য এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রাজ্য ক্ষমতায় আসীন থাকার লক্ষে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নেয়া হয়েছে বামপন্থীদের। কখনো মূল কংগ্রেস তো কখনো বিজেপি। আবার কখনো বা এই বামেদের সঙ্গে গড়া রাজনৈতিক মোর্চা-ঠিক কোন মতাদর্শের রাজনৈতিক তত্ত্ব ধারণ করে তৃণমূল কংগ্রেস তা আজও অনেকের কাছেই কেবলি একটি প্রশ্ন। তবে এতে করে একটি বিষয় পরিষ্কার বোঝা যায় যে, কার্যত কোনো স্বকীয়তা বা মৌলিকতা নেই তৃণমূলের রাজনৈতিক মতাদর্শে। হয়তো এটিই তাদের পতনের সবচেয়ে বড় কারণ। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে তাই মমতার দলের সঙ্গে টক্কর দেয়ার মত একটি শক্তিকে বাংলায় প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষেই হয়তো বামেদের ভোট-চোখবুঝে ‘শ্রী রাম’-এর ব্যালটে অর্পিত হয়েছে।

|| ভোটের আগের প্রলয় পূর্বাভাসই সত্য হলো- ‘দিদি গেল, মোদী এলো’
ভোটের আগের প্রলয় পূর্বাভাস সত্য হল এবার বাংলায়। বুথ ফেরত জরিপে আসা সমীক্ষাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপান্তরিত হল। বাংলায় বাম ভোটের বড় অংশই চলে গেল গেরুয়া শিবিরে। যার পরিণতিতে প্রধান বিরোধী দল তো বটেই, আসন ও ভোটপ্রাপ্তির নিরিখে শাসক তৃণমূলের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলার জায়গায় উঠে এল বিজেপি! আর একটিও আসন না জিতে স্বাধীনতার পরে বাংলায় এই প্রথম শূন্য থাকল বামেদের খাতা!

|| নির্বাচন কমিশনের তথ্যে পাওয়া ভোটের হাল

নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, লোকসভা ভোটে রাজ্যে এ বার বিজেপির ভোট বেড়ে হয়েছে ৪০.২৩%। আর বামেদের ভোট নেমে এসেছে ৭.৫২%-এ। তিন বছর আগের বিধানসভা ভোটে বামফ্রন্ট পেয়েছিল প্রায় ২৬% ভোট। বিজেপির ভোট তখন ছিল ১০.১৬%। অনেকেই মনে করছেন, বামেদের যে ১৫% ভোট ক্ষয় হয়েছে, তার সবটাই ঘরে তুলেছে বিজেপি! যে কারণে ভোটের আগে থেকে সামাজিক মাধ্যমে ঘুরতে থাকা স্লোগান এখন বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব— ‘বামের ভোট রামে’! বামের সঙ্গে তৃণমূল থেকে ছিটকে আসা ভোট যোগ হয়ে বিজেপির পাল্লা ভারী হয়েছে এবার বহু জায়গাতেই।

|| বিধানসভার পরে এবার লোকসভায় বামভোটের পরিসংখ্যান

বিধানসভার পরে গত বছর পঞ্চায়েত নির্বাচনে বাম ভোট কমে এসেছিল প্রায় ১৬%-এ। বামেদের ছাপিয়ে রাজ্যের নানা জায়গায় তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে উঠে আসে বিজেপিই। কিন্তু পঞ্চায়েত ভোটে স্থানীয় নানা সমীকরণ কাজ করে, কোনো দলের শীর্ষ নেতৃত্বেরই সেখানে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ থাকে না। লোকসভা নির্বাচনে কী ভাবে বামপন্থীদের সমর্থন বিজেপির মতো ‘সাম্প্রদায়িক শক্তি’র হাত শক্ত করল, এই সেই প্রশ্ন বিস্ময় জাগাচ্ছে রাজনৈতিক শিবিরে!

|| চুপচাপ পদ্মে ছাপ

পশ্চিমবঙ্গ থেকে মার্ক্সবাদী বামেদের উৎখাত করতে চেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্লোগান তুলেছিলেন চুপচাপ ফুলে ছাপ। এই স্লোগানকে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আপন করে নিয়েছে। শুধু ফুল ছাপের জায়গায় পদ্মে ছাপ জুড়ে দেয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে প্রতি নির্বাচনেই সহিংসতা সৃষ্ট হয়। আর বিজেপি এই বিষয়টিকেও ব্যবহার করে নিজেদের ভোটবাক্স ভরেছে। বিজেপি প্রার্থী ও কর্মীদের প্রতি তৃণমূল কর্মীদের আগ্রাসী আচরণকে সফলভাবে উষ্কে দিয়ে তাদের রীতিমত বেকায়দায় ফেলে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের সুনিশ্চিত পন্থাই সৃষ্টি করে গেরুয়া সেনারা। যাতে বিদ্যাসাগরের মূর্তিভাঙার দায়ে বিক্ষুদ্ধ বাম-প্রতিবাদ অব্যর্থ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে গেছে।

|| মমতা ও তৃণমূল বিরোধী ভোটে বিজেপির ভোটবাক্স ভরা

পঞ্চায়েত নির্বাচনেই লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির বিক্ষোভের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাতে করে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়, রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসকে কোনো দল চ্যালেঞ্জ করতে পারলে, সেটি একমাত্র বিজেপিই পারে। এর ফলে মমতা বিরোধী ভোটাররা বিজেপির বোতামেই আঙুল রেখেছে। পরিস্থিতি এমনই যে ২০১১ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের শাসন কায়েম করা বামেদের উৎখাতের মূল কারণ মমতার তৃণমূলের বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে ভোটে বিজেপিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে বামপন্থী ঘরানার ভোটাররাই। এখন ক্ষমতাসীন বিজেপিই রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল যা তৃণমূলের গোঁদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে উঠেছে।

|| রাজনীতিতে রামায়ণ ও ‘জয় শ্রী রাম’

পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজা নিয়ে যারা গর্ব করতেন, গত কয়েক বছরে তাদের ভাবাচ্ছেন রামনবমীর ধুম আর ডিজে বাদ্যের বুক কাঁপানো ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি। বিজেপির কৌশল পরিষ্কার- তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হিন্দুবিরোধী প্রমাণ করে এবং মুসলিম তোষণের ইস্যু সামনে রেখে বিজেপি হিন্দুদের সপক্ষে কথা বলার নির্ভরযোগ্য ঠিকানা হয়ে উঠবে। আর মমতার ব্রিগেডের পর একই ময়দানে বাম মোর্চার ব্রিগেড সমাবেশ সেটিকে একেবারে সত্যায়িত করে দিয়েছে। ফলাফল বলছে, সেপথ ধরে মোদী-শাহের নেতৃত্বাধীন দল এ ব্যাপারে পুরোপুরি সফল হয়েছে রাজ্যে। আর আগ্রাসী আচরণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই বিজেপিকে সাহায্য করে ফেলেছেন।

|| তৃণমূলের বিভাজনের রাজনীতিতে বামেরা

তৃণমূল, বাম, কংগ্রেস-সহ দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে বিজেপি-বিরোধী মোর্চা তৈরির লক্ষ্যেই ব্রিগেডের জনসভা আয়োজিত হয়। কিন্তু মমতার একতান্ত্রিক আচরণে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়, বিরোধী জোটকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত নেতৃত্বে নয় বরং নিজের অধীনস্থ হিসেবে অন্যদের কাছে টানতে চেয়েছিলেন মমতা, যাতে প্রথমেই বেঁকে বসে বামেরা। ফলে ঐক্যের মঞ্চেই ওঠে ভাঙনের সুর। অপরদিকে শরীক দলগুলোর প্রতি বিজেপির উদার মনোভাব প্রদর্শনে তৃণমূলের জোট সঙ্গীদের মনে আক্ষেপের বান টানে। এতে করে ‘মমতাবাদী’ শরীক দলগুলোর অনেক নেতাই নিজেদের হাই কমান্ডের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন। তাদের একাংশের ভোটও এবার বিজেপির বাক্সেই ঠাঁই নিয়েছে যা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করেছে।

|| শক্তিশালী বিরোধী শক্তির অভাব ঘোঁচাতে বামেদের তৎপরতা

কংগ্রেস নেতা-কর্মী-বিধায়করা গত কয়েক বছরে দলে দলে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। বামেরাও ক্রমশ দুর্বল হয়েছে। দাপট বাড়িয়েছে তৃণমূল। রাজনীতিতে বিরোধী স্থান শূন্য থাকে না। তাই বাম ও কংগ্রেসকে টপকে চতুর্থ থেকে দ্বিতীয় শক্তির দিকে উত্থান হচ্ছে বিজেপির। দুর্বলতার কথা স্বীকার করে সিপিএম বিধায়ক তন্ময় ভট্টাচার্য বলেন, তৃণমূলের সন্ত্রাসে আমাদের সংগঠন অনেক জায়গায় দুর্বল হয়েছে। ভয় দেখিয়ে, ভুয়া মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে নেতাদের। তাই সমর্থকদের একটা অংশ মনে করছে, তৃণমূলের বিরুদ্ধে আমরা লড়াইয়ের জায়গায় নেই। বিজেপি সেই সুযোগটা নিয়েছে।

|| বাংলাজুড়ে বামেদের ‘রাম যপে’র প্রতিধ্বনি

বিজেপির যে ২৩ শতাংশ (প্রায়) ভোট বেড়েছে, তার প্রায় পুরোটাই এসেছে বাম দলগুলো থেকে। কারণ তাদের ভোটের হার কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ। কিন্তু তৃণমুল কংগ্রেসের বাক্সে যায়নি ওই ভোট। গেলে হয়তো মমতার ‘৪২ এ ৪২’-ই সত্যি হতো। এই বামের ভোট রামের দলের দিকে চলে যাওয়া হচ্ছে এবারের লোকসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গের সব থেকে উল্লেখযোগ্য খবর। প্রচারণার সময়ে অনেক বিশ্লেষক এই সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন, কিন্তু বাম দলগুলো সেই সম্ভাবনার কথা মুখে প্রায় উড়িয়ে দেয়। তবে বোতাম টিপতে যে তারা ভুল করেনি তা বলাবাহুল্য।

|| বামপন্থীদের হিসাব মিলিয়ে দিচ্ছে বিজেপির খাতা

বাম দলগুলোর ভোট বিজেপিতে কেন গেল, তা নিয়ে অনেক যুক্তি দিচ্ছেন বাংলার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তৃণমূলের জামানায় বাম দলগুলো যেভাবে তৃণমূলের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছে, বাম সমর্থকরা তৃণমূলের সঙ্গে টেক্কা দিতে পারে এমন দল খুঁজছিলেন। বিজেপি যেহেতু কেন্দ্রে ক্ষমতায় আছে, তাই অনেক মানুষ বিজেপিকে বেছে নিয়েছেন।

|| কারো ঘর ভেঙে বাড়ল বিজেপি নাকি কেউ ঘরে ঠাঁই দিলো

বামেদের ভোটব্যাঙ্ক তলানিতে ঠেকায় এই প্রশ্নের উত্তরে তাদের দিকেই আঙুল উঠছে বেশি। কিন্তু পদ্ম কি জোড়াফুলের জমিও দখল করেনি? এ নিয়ে দুই শিবিরের একে অপরকে দোষারোপের পালা শুরুর পাশাপাশি ভোটের ফল নিয়ে ময়না-তদন্ত শুরু করছেন অনেকেই। কালীঘাটের দেবীর মন্দিরও শ্রীরাম নিশ্চয়ই কোন হনুমানের সাহায্য নিয়েই দখল করেছেন এবার। আর ভোট পরিসংখ্যান সুস্পষ্টভাবেই বলছে, সেই হনুমান ও তার বানর সেনাদের অধিকাংশই মার্ক্সবাদী তবে জোড়াফুলের বঞ্চণাবাদীদের জনা কয়েকও আছেন সেখানে।

|| ভোট কড়চার নথি না রাম-নাম পুঁথি

ফলাফলের পরদিনই বৈঠকে বসে তৃণমূল কংগ্রেস। আর সেখানে আগেভাগেই রাজ্যে গেরুয়া বিপ্লবের জন্য সোজা সিপিএমের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে মমতার দলও বামেদের মুখে রাম-নাম যপ ওঠার কথা স্পষ্ট করেছে। তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় সাংবাদিকদের বলেছেন, বাম ভোটের একটা বড় অংশই গেছে বিজেপির ঝুলিতে। সে কারণে তৃণমূল এ বার বেশি মানুষের সমর্থন পেলেও বিজেপি বেশ কিছু আসন দখল করেছে। পার্থর কথায়, ‘রাম-বাম এক, এ কথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম থেকেই বলে আসছেন। তখন কথাটাকে কেউ গুরুত্ব দিতেন না। এখন সেটা সকলে বুঝতে পারছেন।’

|| সিপিএম-সহ বাম শিবিরের পাটকেল

সিপিএম-সহ বাম শিবিরে বহু দিন ধরেই দিদি-মোদী বোঝাপড়ার কথা বলে আসছে। আবার নির্বাচনী প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি-সিপিএম সমঝোতার কথা বলেছেন। ভোটের ফল প্রকাশের পরে দুই শিবিরই সরব। বাঁকুড়ায় বিজেপির সুভাষ সরকারের কাছে পরাজিত রাজ্যের মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘বিধানসভা ভোটে সিপিএমের যিনি শুধু তালডাংরায় ভোট বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, এ বার কী করে তিনিই লোকসভা ভোটে মাত্র এক লাখ ভোট পান?’ তবে শাসকদলের একাংশ মানছে, জোড়া ফুলেরও কিছু ভোট পদ্মে গিয়েছে। যেমন দলের বীরভূমের জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল বলেন, ‘তৃণমূলের কিছু কমবয়সির ভোট মোদীর দিকে গিয়েছে।’

|| বিজেপির উত্থানে বামতত্ত্বের ময়না-তদন্ত

বিজেপির এই উত্থানকে বেশি গুরুত্ব দিতে নারাজ তৃণমূল। আবার বামেদের ভোট কেন সাত-আট শতাংশে নেমে এসেছে এবং সেটা কোথায় গিয়ে জমা পড়ছে, সেটা নিয়েও চলছে জোর পর্যালোচনা। তৃণমূল নেতাদের মতে, বামেরা জীবনে অনেক ঐতিহাসিক ভুল করেছে। যার মধ্যে এবারের লোকসভা ভোটে রাপ-নাম যপও একটা ঐতিহাসিক ভুল।

কেন নিজের নাক কেটে তৃণমূলের যাত্রা ভঙ্গ করলো বামেরা-

প্রথম, দেশে মোদীর সরকারের প্রত্যাবর্তনকে ঠেকানোর চেয়েও রাজ্যে তৃণমূলের হাত থেকে ‘নিস্তার’ পাওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বাম কর্মী-সমর্থকেরা।

দ্বিতীয়, কংগ্রেসের সঙ্গে জোট শেষ মুহূর্তে ভেস্তে যাওয়ায় হতাশা তৈরি হয়েছিল বাম শিবিরের বড় অংশে। কংগ্রেসের সঙ্গে থাকলে কেন্দ্রে বিকল্প সরকার গড়ার যে বার্তা দেওয়া যেত, তা সম্ভব হয়নি। এই হতাশাই বহু বাম সমর্থকে পদ্মমুখী করে তুলেছে।

তৃতীয়, পরের পর নির্বাচনে ব্যর্থ বাম নেতৃত্বের কোনও নিয়ন্ত্রণ কর্মী-সমর্থকদের উপরে কাজ করেনি। তারাই এ বার তৃণমূলকে শিক্ষা দেবেন, বিজেপি নেতৃত্বের এই প্রচারে বরং বাম কর্মী-সমর্থকেরা বেশি ভরসা রেখেছেন! ভাঙা সংগঠন নিয়েও যতটুকু কাজ করা যায়, তার বেশির ভাগটাই তলে তলে গেরুয়া শিবিরের পক্ষে গেছে।

চতুর্থ, ঘরোয়া আলোচনায় বাম নেতারা বলছেন, রাজ্যে ‘পরিবর্তনে’র পরে দল ভাঙানো, মিথ্যা মামলা দেওয়া থেকে কার্যালয় দখল— নানা ভাবে লাগাতার তৃণমূল সচেষ্ট ছিল বামেদের দুর্বল করতে। তার উপরে পঞ্চায়েত ভোটে বিরোধীদের আটকানো হয়েছে গায়ের জোরে। এ সবের ফলেই বাম কর্মী-সমর্থকেরা বিজেপির চেয়ে তৃণমূলকে ‘বড় শত্রু’ বলে মনে করেছেন।

পঞ্চম, দলীয় কর্মীদের পাশাপাশি যে ‘স্বাধীন ভোট’ বামেদের সঙ্গে ছিল, তার বড়সড় অংশই সরে গেছে বিজেপির দিকে। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে না পারাও যে বড় ব্যর্থতা, মেনে নিচ্ছেন সিপিএম নেতারা। আবার জোট বা গ্রহণযোগ্য কোনও বিকল্প না থাকায় সংখ্যালঘুদের ভোটের বড় অংশ বাম ছেড়ে তৃণমূলের দিকে চলে গেছে।

ষষ্ঠ, নিচু তলার সিপিএম কর্মীরা আঙুল তুলছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের দিকেও। উত্তর ২৪ পরগনার আমডাঙার এক দলীয় কর্মী যেমন বলছেন, ‘‘তৃণমূলের সঙ্গে লড়াই করে আমরা পঞ্চায়েত বাঁচিয়েছিলাম। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়। কিন্তু এই ভোটের সময়ের আগে মাঝের কয়েক মাসে এরিয়া কমিটির নেতারাও আমাদের পাশে দাঁড়াতে আসেননি।’’ এই কর্মীদের মতে, বিজেপির ছাতার তলায় গেলে লড়াইয়ে সহায়তা মিলবে, এই আশা অনেকের মনেই কাজ করেছে।

দীর্ঘ সময় রাজ্য ক্ষমতায় থাকা বামেদের অস্তিত্ব ক্রমশ ম্লান হয়ে পড়ছে বাংলায় তৃণমূলের আগ্রাসনে। শেষ পর্যন্ত দলীয় মোর্চা ছেড়ে বিজেপির ব্যালটে তারা নিজেদের রায় দিয়েছে অস্তিত্ব রক্ষার শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে। আশা করা হচ্ছে, ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার বামেদের এই প্রচেষ্টা মূল্যায়াণ করে বাংলা তথা ভারতজুড়ে মুক্ত রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িকতার চর্চা নিশ্চিত করতে সফল হবে।

যদি সেটা হয়, তাহলে গোটা বিশ্বের কাছে লোকসভা ভোটে শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক উদযাপনের পটভূমি হিসেবে নয়, মুক্তমনা গণতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও নন্দিত হবে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। গণতন্ত্রমনা দেশপ্রেমী হিসেবে খ্যাতি আছে সচেতন ভারতবাসীর। প্রত্যাশা পূরণ না হলে কিন্তু তাদের হাত ধরে রামের ভোট বামে যেতেও সময় লাগবে না। কারণ, তাদের হৃদয়ের সবচেয়ে কাছ থেকে ধ্বনিত হওয়া ভালবাসার প্রতিধ্বনি কেবল একটিই, ‘ভারত মাতার জয়।’

আলোকিত সকাল/এসআইসু

Facebook Comments