বাজেটের আগেই চাঙ্গা অর্থনীতি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

প্রতি বছর ঈদ ও বাজেটকে সামনে রেখে নানা ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলেও এবার ব্যতিক্রম। সরকারের ইতিবাচক ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্তের ফলে বাজেটের আগেই চাঙ্গা দেশের অর্থনীতি। তা ছাড়া নতুন অর্থবছর শুরুর আগেই সুসংবাদ হলো বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতিতে প্রথম সারিতে এখন বাংলাদেশ। বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে টায়ার-২ থেকে টায়ার-১-এ উঠে এসেছে বাংলাদেশ। ইউরোমানি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনডেক্সের (ইবিআরআই) প্রথম প্রান্তিকের প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। এ ছাড়াও অন্য আরেকটি সংস্থা আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস (এসঅ্যান্ডপি) আভাস দিয়েছে, আর্থিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও জোরালো প্রবৃদ্ধি ও বিপুল উন্নয়ন চাহিদার কল্যাণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আগের মতোই ‘স্থিতিশীল’ থাকবে। প্রতি বছর ঈদ এলেই গার্মেন্টস সেক্টরে এক ধরনের অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। এবার সময়মতো বেতন-বোনাস পরিশোধ করায় সে পরিস্থিতি এড়ানো গেছে।

এ দিকে ঈদকে সামনে রেখে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে অর্থের বড় জোগান আসছে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের বোনাস, গতিশীল অভ্যন্তরীণ বাজার, জাকাত ও ফিতরা থেকে। বিশেষ করে লম্বা ছুটিতে চাকরিজীবীরা গ্রামমুখী। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ বিত্তবানদের মধ্যে আগের থেকে বেড়েছে জাকাত দেয়ার প্রবণতা। এ ছাড়া বাজেটের আগে অর্থনীতির সব উৎসেই হাওয়া লেগেছে। ধানের দাম না পেলেও কৃষককে বাঁচাতে চাল রফতানিসহ প্রণোদনার ঘোষণা, ঈদের আগে চাঙ্গা শেয়ারবাজার, রেকর্ড রেমিট্যান্স (প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ), গার্মেন্টস পণ্য রফতানি ঊর্ধ্বমুখী, ঈদ-কেন্দ্রিক নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে যাতে যানজটে পড়তে না হয়, সেজন্য ইতোমধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে তিনটি সেতু চলাচলের জন্য খুলে দেয়া, যা গ্রামমুখী মানুষের যানজটের ভোগান্তি এবং সিস্টেম লস থেকে বাঁচাবে। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি এবং উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম পদ্মা সেতুসহ মেগা প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। আসন্ন বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, শেয়ারবাজার, ফ্ল্যাট ও জমির নিবন্ধন ফি কমানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে আবাসন খাতকে চাঙ্গা করাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে থাকছে প্রণোদনা, ভর্তুকি এবং নগদ ঋণের ঘোষণা। সব কিছু মিলিয়ে বাজেটের আগেই চাঙ্গা অর্থনীতি। চাকরিজীবীদের সাথে রাজনৈতিক নেতা, এমপি, মন্ত্রীরাও ছুটছেন গ্রামে। ঈদের অর্থনীতি নিয়ে সরকারিভাবে এখনো কোনো গবেষণা হয়নি। তবে বেসরকারি গবেষণা অনুসারে ঈদ ও রমজানে অর্থনীতিতে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার অতিরিক্ত লেনদেন হয়। এ টাকার বড় অংশই যায় গ্রামে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ঈদ ও বাজেটকে কেন্দ্র করে সব সময়ই নানামুখী অস্থিরতা তৈরি হয়। যদিও এ বছর সেটি নেই। কারণ শেয়ারবাজারকে চাঙ্গা রাখতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা রাখতে বলেছেন। পাশাপাশি প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে কৃষককে বাঁচাতে চাল রফতানির ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া আসন্ন বাজেটে যারা কর দেন তাদেরকে বিপাকে ফেলবেন না বলে অঙ্গীকার করেছেন। এ জন্য তিনি করহার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া ঈদে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে এবং যানজট নিরসনে একাধিক সেতু উদ্বোধন, রেকর্ড রেমিট্যান্স, ডলারের প্রবাহ বাড়াসহ সব কিছুই অনুকূলে রয়েছে। তাই দেশের অর্থনীতিতেও চাঙ্গাভাব বিরাজ করছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ঈদে সবচেয়ে বেশি টাকার প্রবাহ বাড়ে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ টাকার ব্যবহার পোশাক, ভোগ্যপণ্য, শৌখিনতা ও ভ্রমণসহ বিনোদনমুখী খাতেই বেশি হচ্ছে। কাজেই এটা একটা বড় ভূমিকা রাখে অর্থনীতিতে। তিনি বলেন, এ ধরনের উৎসব অর্থনীতির আকার, ধরন ও ব্যাপ্তি আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। মানুষ এ উৎসবকে ঘিরে প্রচুর পরিমাণ অর্থ খরচ করে। এতে উৎপাদনকারী, আমদানিকারক, ব্যবসায়ী প্রত্যেকে কিছু না কিছু লাভবান হচ্ছেন। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ইআরএফ’র সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশিদুল ইসলাম ইনকিলাবকে বলেন, কয়েক দিন পরেই ঈদ। আর ঈদের পরপরই জাতীয় বাজেট ঘোষণা। এই সময়ে অন্যান্য বছরে সাধারণত শেয়ারবাজারের পতন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘরমুখী মানুষের যানজটসহ নানা ভোগান্তিতে বিপর্যস্ত থাকে সাধারণ মানুষ। এবার সে রকম কোনো পরিস্থিতি নেই বললেই চলে। তিনি বলেন, ঈদ অর্থনীতির প্রবাহ ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রামে, যা খুবই ইতিবাচক। ঈদ সামনে রেখে ক্রেতার খরচ বাড়ছে। আর ক্রেতার খরচ বাড়লে তার প্রভাব অর্থনীতির ওপর এসে পড়বে, যা ঈদ মার্কেট ঘিরে হচ্ছে।

এ দিকে ঈদ উপলক্ষে প্রবাসীরা বিপুল রেমিট্যান্স দেশে পাঠান। ঈদের সময় বৈদেশিক আয়ের প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। চাঙ্গা হয়ে ওঠে ব্যাংক খাতও। এ উপলক্ষে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে অন্য সময়ের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি লেনদেন হয়। মে মাসের মাসের ২৫ দিনেই ১৩৫ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে যা আরও বাড়ছে। কিন্তু অন্যান্য সময় পুরো মাস শেষে ১৩০ কোটি ডলারের মধ্যেই থাকতে দেখা যায় এই প্রবাহ।

এদিকে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ঈদের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, বিকিকিনি তত বাড়ছে। দোকান মালিক সমিতির তথ্য মতে, দেশব্যাপী ২২ লাখ দোকান আছে, যার মালিকরা বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সদস্য। তাদের দৈনিক মোট এক হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হয়। আর ঈদের আগে বিক্রি প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। তাতে সাড়া দেশে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার দৈনিক বিকিকিনি হয়। এ ছাড়াও টেইলারিং এবং অনলাইনেও প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার কেনাবেচা হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

ঈদে আর্থিক ব্যয়ের কোনো সঠিক চিত্র পাওয়া না গেলেও ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র অনুমানের ভিত্তিতে করা এক তথ্যে জানা গেছে, এবার ঈদ-বাণিজ্যে ৬০ শতাংশ পোশাক, ২০ শতাংশ খাদ্যদ্রব্য এবং বাকি ২০ শতাংশ অন্য পণ্য বিক্রি হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। তথ্যে আরও জানা যায়, ঈদ উৎসবে পোশাকসহ সব পরিধেয় খাতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা, জুতা-কসমেটিক্সে তিন হাজার কোটি, জাকাত-ফিতরা ও দান-খয়রাতে ৩৮ হাজার কোটি, যাতায়াত বা যোগাযোগ খাতে ১০ হাজার কোটি, ভোগ্যপণ্যে সাত হাজার কোটি, সোনা-ডায়মন্ডে পাঁচ হাজার কোটি, ইলেকট্রনিক্স পণ্যে চার হাজার কোটি, ভ্রমণে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি, স্থায়ী সম্পদ ক্রয় এক হাজার কোটি, পবিত্র ওমরা পালন তিন হাজার কোটি ও আইনশৃঙ্খলাসহ অন্য খাতে লেনদেন হয় এক হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ফার্নিচার, গাড়ি ও আবাসন শিল্পে বড় ধরনের কেনাকাটা হয়ে থাকে।

ঈদে চাঙ্গা অর্থনীতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ঈদের সময় দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ে। শহর থেকে গ্রামমুখী হচ্ছে টাকার প্রবাহ। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙ্গা হয়ে উঠছে। এর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে যে স্থবিরতা ছিল, সেটা অনেকটা কেটে যাবে। এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এর ইতিবাচক দিক হলো, এ সময় বণ্টন ব্যবস্থায় একটি পরিবর্তন হয়। এতে অধিকাংশ মানুষের কাছেই টাকা পৌঁছে যায়। আর নেতিবাচক দিক হলো মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এবার ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা হবে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, নারীদের গয়না ও প্রসাধনীর বেচাকেনা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এবার গয়না ও প্রসাধনীর বাজারে বিক্রির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া মোবাইল ফোন, গাড়ি ও ফর্নিচারসহ বিভিন্ন পণ্য বেচাকেনাও বেড়েছে। এবার ঈদের বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে বিশ্বকাপ ফুটবল। এ কারণে টেলিভিশন বিক্রি বেড়েছে। জার্সি বিক্রিও বেড়েছে বিপুল।

বাংলাদেশ ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি আবদুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, এবারের ঈদ উপলক্ষে অনলাইনভিত্তিক বাজার বেশ চাঙ্গা। ঈদকেন্দ্রিক এই ই-কমার্স রাজধানী ছাড়িয়ে জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ই-কমার্স এ বার্ষিক লেনদেনের আর্থিক আকার শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে হাজার কোটি টাকায় রূপ নিয়েছে। আগামী ৩ বা ৪ বছরের মধ্যে এ আকার ১০ হাজার কেটি টাকায় পরিণত হবে।

এ দিকে প্রতি বছরের মতো এবারো ১৮ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়াও ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বেগবান হচ্ছে, আর পর্যটন শিল্প তারই অংশ। ঈদে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণের জায়গায় রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের নানা কর্মসূচি। পরিসংখ্যান অনুসারে, প্রতি ঈদে প্রায় দুই থেকে তিন লাখ পর্যটক ভ্রমণ করে কক্সবাজার। অন্য দিকে, সারা বছর কক্সবাজার ভ্রমণে আসে মোট ১৫ থেকে ২০ লাখ পর্যটক। এই সময় সব হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট পর্যটকে থাকে পরিপূর্ণ। পার্বত্য তিন জেলা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির সবুজঘেরা পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে ঢল নামে মানুষের। সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ধর্মীয় স্থাপনা এবং সবুজ চা-বাগান পর্যটকদের বারবার আকর্ষণ করে। তা ছাড়া কুয়াকাটা, খুলনা এবং কুমিল্লাসহ দেশের অন্যান্য জেলার দর্শনীয় স্থানে ঈদে পর্যটকের উপস্থিতি অনেক বেড়ে যায়। ঢাকার আশপাশে বিশেষ করে গাজীপুরে ব্যাপকহারে রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। ঈদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পার্ক ও অ্যামিউজমেন্ট পার্কে পর্যটকের উপস্থিতি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

ইতোমধ্যে বেতন-বোনাসের পুরো অর্থ যোগ হচ্ছে অর্থনীতিতে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি বেসরকারি অফিস, প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজস্ব কাঠামোতে বোনাস দিচ্ছে। এ ছাড়া পোশাক ও বস্ত্র খাতের প্রায় ৭০ লাখ কর্মীর বোনাসও যোগ হচ্ছে। যার পুরোটাই যোগ হচ্ছে ঈদ-অর্থনীতিতে। ঈদ উৎসব অর্থনীতিতে সারা দেশের দোকান কর্মচারীদের বোনাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এ দিকে ঈদের পরপরই বাজেট ঘোষণা। গত চার বছরের ধারাবাহিকতায় এবারো ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সরকার বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ বাবদ বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box