বাজারে এখনো মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজধানীসহ সারাদেশে নিবন্ধিত প্রায় দেড় লাখের বেশি ফার্মেসি রয়েছে। অনিবন্ধিতও প্রায় নিবন্ধিতর সমান ফার্মেসি রয়েছে সারা দেশে। ওষুধ শিল্পের অভাবনীয় উন্নতি ঘটলেও এর বাজার সংশ্লিষ্টদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে নকল, ভেজাল, নিন্মমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে বাজার সয়লাব।

বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, যথাযথ মনিটরিং না থাকা এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও এক শ্রেণির চিকিৎসক জড়িত থাকায় মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সবখানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আবার অনেক সময় মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বাজার থেকে তুলে নিতে গড়িমসি করে অনেক কোম্পানি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মানেই বিষ। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটছে। এটি গণহত্যার সমান অপরাধ এবং অপরাধীর বিচার সেভাবেই হওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের গত ছয় মাসের অভিযান প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, রাজধানীর ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রয়েছে। ওই প্রতিবেদন সংযুক্ত করে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি বন্ধ ও অবিলম্বে সেগুলো প্রত্যাহারের নির্দেশনা চেয়ে ১৭ জুন জনস্বার্থে একটি রিট আবেদন করেন জাস্টিস ওয়াচ ফাউন্ডেশন।

পর দিন ১৮ জুন শুনানি শেষে এক মাসের মধ্যে বাজার থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জব্দ করে ধ্বংস করার নির্দেশ দেন বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ।

একই সাথে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের মজুত ও বিক্রি বন্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রেতা, সরবরাহকারী ও সংরক্ষণকারীদের শনাক্ত করতে কমিটি গঠন করতে বলেছেন।

আদালত তখন এক মাসের মধ্যে স্বাস্থ্য সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন।

আদালতের এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২৩ জুন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে ওষুধ শিল্প সমিতি, কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতি ও ফার্মেসি কাউন্সিলের সঙ্গে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় গত ২ জুলাইয়ের মধ্যে দেশের সব ফার্মেসি থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ তুলে নিয়ে ধ্বংস করার বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় সংশ্লিষ্টরা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ তুলে নিতে ব্যর্থ হয়েছে দেশের ফার্মেসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো।

ফলে তাদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংগ্রহ করে ধ্বংসের জন্য ২ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেয়। কিন্তু ওষুধ কোম্পানিগুলো সে কথা রাখেনি। ভোক্তা অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বাজারে এখনো মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের সন্ধান পাচ্ছেন তারা।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রশাসনের কর্মকর্তারা গত ছয়মাসে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৪২০টি মামলা দিয়েছে। জরিমানা করেছে ৮২ লাখ ৯১ হাজার ৫শ টাকা। এছাড়াও পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে জেল এবং পাঁচটি ফার্মেসি বন্ধ করে দিয়েছে।

নিয়মিত এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানায় সংস্থাটি। এরপর মাঠে নামে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ২৫ জুন থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত নকল, ভেজাল, আনরেজিস্টার্ড, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, ফিজিশিয়ান স্যাম্পলের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে ঢাকা, চাঁদপুর, খুলনা, কুষ্টিয়া, রংপুর, রাজশাহীতে। এতে ভ্রাম্যমাণ আদালত ১১টি মামলা দিয়েছেন। জরিমানা করেছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫শ টাকা। সেই সঙ্গে একজনকে কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

৩ জুলাই থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করে দেখা যায়, ১৬ জুলাই রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৭টি ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের সন্ধান পেয়েছে তারা। তাদের বিভিন্ন মেয়াদে জরিমানা এবং শাস্তিও দেয়া হয়েছে।

রাজধানীর পল্লবী এলাকায় ১৪ জুলাই অভিযান চালিয়ে ফ্যামিলি ফার্মাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভোক্তা অধিকারের উপপরিচালক (বিভাগীয়) মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের তত্ত্বাবধায়নে সহকারী পরিচালক আফরোজা রহমান ও মো. আব্দুল জব্বার মণ্ডল।

ভোক্তার উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, এক মাস সময় বেঁধে দেয়ার পরও বাজারে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের উপস্থিতি সত্যি দুঃখের বিষয়। আজও রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় টিম পাঠিয়েছি সেখানেও সাতটি ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পেয়েছি। আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। আগামী বৃহস্পতিবার (আগামীকাল) আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করা হয়েছে।

ভেজাল, নিম্নমানের এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সমস্যার সমাধান করার জন্য দেশের সব ওষুধ কোম্পানিকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ফেরত নিতে হবে। ড্রাগিস্ট এন্ড কেমিস্ট সমিতিকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

সেই সঙ্গে প্রত্যেক ফার্মেসিতে একটি আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এমন একটি আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করেন যাতে করে জানা যাবে কোন কোম্পানির কোন ওষুধটি কবে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাবে। তাহলে আগেই সতর্ক থেকে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আর এসব পদ্ধতি এখন শুধু উন্নত দেশে নয় উন্নয়নশীল দেশেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

১ জুলাই রাজধানীর মিরপুর, গুলশান এবং গাজীপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ও ভেজাল ওষুধ প্রতিরোধে কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির নেতাদের সঙ্গে সাধারণ ওষুধ ব্যবসায়ীদের জনসচেতনতামূলক সভা করেছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর।

সভায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ফার্মেসি ব্যবস্থাপনায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের লক্ষ্য তিনটি। সেগুলো হচ্ছে— জনসচেতনতা বাড়ানো, ওষুধ বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং প্রচলিত ওষুধ আইনের প্রয়োগ।

তবে শুধু আইনের প্রয়োগ করলেই চলবে না, জনসচেনতাও বাড়াতে হবে। নকল ও আনরেজিস্টার্ড ওষুধ কিভাবে চেনা যাবে, ফার্মেসি ব্যবস্থাপনা কিভাবে করতে হবে, ফার্মেসিতে কিভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং ইনভয়েসের মাধ্যমে ওষুধ ক্রয় করা কেন আবশ্যক এসব না জেনে অনেক সময় ফার্মেসির মালিক কিংবা ফার্মাসিস্টরা অপরাধ করে থাকেন।

তাই এ বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে। নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ প্রতিরোধ করে বাংলাদেশের ফার্মেসি ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করতে হবে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এর কোনো বিকল্প নেই।

এ সময় তিনি জনসাধারণকে মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ দেখে ওষুধ ক্রয় এবং ওষুধের সঙ্গে নিবন্ধন আছে কিনা অর্থাৎ ওষুধের মোড়কে ডিএআর বা এমএ নম্বর আছে কিনা তা দেখে ক্রয় করার অনুরোধ করেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments