বাঁশের খেলাঘর রাজধানীতে শিশুদের খেলার রাজ্য

আলোকিত সকাল ডেস্ক

শিশুদের খেলার জায়গা ক্রমশ কমছেই। বিশেষ করে শহুরে শিশুদের খেলার কোনো জায়গাই নেই। বাচ্চারা বেড়ে উঠছে বলা যায় খেলাধুলা ছাড়াই। ঢাকা শহরে শিশুদের খেলার জন্য যে কয়টি মাঠ আছে তার কয়টিই বা তাদের খেলার উপযোগী আছে? দিনকে দিনকে প্রকট হচ্ছে এই সমস্যা। সমস্যা শুধু যে এক জায়গায় তাও কিন্তু না। খেলাধুলার জায়গা না পেয়ে শিশুরা অবধারিতভাবে ঝুঁকছে ইন্টারনেট এবং ভিডিও গেমের দিকে। গবেষণা বলছে, এসব গেম শিশুদের সহিংস করে তোলার পাশাপাশি মানসিক বিকাশেও সৃষ্টি করছে নানা রকম বাধা। সেই সাথে শারীরিক বিকাশের ব্যাপারটি তো আছেই।

তবে কেউ কেউ আছেন যারা এই ব্যাপারটি নিয়ে ভাবেন। শিশুরা বেড়ে উঠবে স্বাভাবিকভাবে খেলাধুলা করে এমন চিন্তা থেকেই রাজধানীর বছিলাতে শিশুদের জন্য গড়ে উঠেছে ব্যাম্বো প্লে স্পেস। শুনতে একটু অবাক লাগলেও এই জায়গাটিতে শিশুদের খেলার জায়গা গড়ে তোলা হয়েছে বাঁশকে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে। বাঁশ দিয়ে তৈরি করা এই খেলাঘরটি শিশুদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে দ্রুতই। এখানে তাই সারা দিনই দেখা মেলে শিশুদের দুরন্তপনার নানা দৃশ্য।

বছিলার শহিদ বুদ্ধিজীবী সেতু পাড় হয়ে খানিকটা এগিয়ে গেলেই ডানদিকে চোখে পড়বে একটি আধাপাকা সড়ক চলে গেছে সোজা। কিছুদূর গেলেই ওয়াশপুর গার্ডেন সিটি। এখানেই তৈরি হয়েছে বাঁশের খেলাঘর। কাদামাটির পথ পেরিয়ে এসে আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে মুহূর্তেই। তিন তলা বাড়ি সমান উঁচু এই স্থাপনাটি যে কারও নজরে পড়তে বাধ্য। ছোট্ট এক চিলতে উঠোন তার চারপাশে বাঁশের স্থাপনা। পাশে ছোট্ট একটা মঞ্চ সেটাও বাঁশেরই বানানো।

প্রথমেই চোখে পড়ে শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা একটি ক্লাইম্বিং ওয়াল। দেয়াল বেয়ে উঠতে দেখা গেল বেশ কয়েকজনকে।

তারপাশেই রয়েছে স্পাইডার জোন। এই জায়গাটিতে বাঁশের সাথে দড়ি বেঁধে এমন একটি ব্যবস্থা করা হয়েছে শিশুরা স্পাইডারম্যানের মতো দড়ি বেয়ে উপরে উঠে যেতে পারে অনায়াসে। এছাড়া এখানে দোলনা এবং কাবাডি খেলার মাঠ রয়েছে। মনের আনন্দে শিশুরা এখানে খেলতে আসে প্রতিদিন। তাদের সাথে আসেন অভিভাবকরাও। সমান আনন্দই পান তারা শিশুদের মতো।

এই স্থাপত্যটি নির্মাণ করা হয়েছে ‘পাড়া’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে। প্রতিষ্ঠানটি স্থাপত্যশিল্প নিয়ে নানা রকম গবেষণা করে থাকে। তবে ব্যাম্বু প্লে স্পেস নির্মাণে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত। এটির নকশা থেকে শুরু করে নির্মাণ অবধি কাজ করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা। শিশুদের কাছে বাঁশের খেলাঘর হিসেবে পরিচিত এই জায়গাটির দেখাশোনা করে ‘লিডো পিস হোম’ নামের একটি অনাথাশ্রম। বাঁশের খেলাঘরের পাশেই লিডো পিস হোমের অবস্থান। মূলত এখানকার বাচ্চাদের খেলাধুলার জন্য তৈরি করা হলেই এই জায়গাটি সব বাচ্চাদের জন্যই উন্মুক্ত।

কথা হলো ‘লিডো পিস হোম’ এর পরিচালক সোহেল রানার সাথে। তিনি জানালেন, ‘এই জায়াগটি লিডো পিস হোম এবং ওয়াশপুর গার্ডেন সিটির বাচ্চাদের জন্য তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এখানে অনেক দূর দূরান্ত থেকেও অভিভাবকরা তাদের বাচ্চাদের নিয়ে আসেন প্রতিদিনই। এই জায়গাটি বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে শারীরিক এবং মানসিকভাবে ভারসাম্যহীনরাও এখানে খেলার সুযোগ পাবে।’

এখানে খেলতে আসা শিশুদের সাথে কথা বলে জানা গেল এই জায়গাটি তাদের খুবই প্রিয়। দোলনায় দোল খাচ্ছিল অহনা নামের এক শিশু। তার কাছ থেকে জানা গেল, এই জায়গাটা খুব প্রিয় তার। প্রতিদিনই এখানে খেলতে আসে সে। তার কাছে জানতে চাইলাম কেউ ব্যথা পায় কি না এখানে খেলতে গিয়ে। তার সোজাসাপ্টা জবাব, ‘নাহ, ব্যথা পাবে কেন? এখানে তো সবাই মজা করে।’

মঞ্চের জায়গাটিতে লিডো পিস হোমের বাচ্চারা নানা সময়ে মঞ্চ নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে থাকে। গত কয়েকদিন আগেও এখানে এমন একটি আয়োজন করেছিল তারা। এলাকাবাসীর কাছে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিল তাদের অনুষ্ঠান। লিডো পিস হোমে ৫৩ জন শিশু রয়েছে। যাদের মধ্যে ২২ জন ভিন্নভাবে সক্ষম। তাদের মধ্যে হুইল চেয়ারে চলাচল করে শামীম নামে এক শিশু। সে জানালো,’আমিও এখানে খেলতে আসি প্রতিদিন। আমার খুব ভালো লাগে।’

লিডো পিস হোমের পাশেই এই খেলার জায়গাটি তৈরি হওয়ায় শিশুদের খেলার জন্য অন্য কোথাও ছুটতে হয় না। বরং বাইরের শিশুরাই ছুতে আসে এখানে। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি শিশুরা এখানে আনন্দ আর হুল্লোড়ে মাতিয়ে রাখছে বাঁশের তৈরি এই খেলাঘরটিতে। তাদের জন্য অবশ্য বেশ কিছু নির্দেশনা আছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। শিশুরা যাতে এই নিয়মগুলো মেনে খেলতে পারে সেই দিকটিও খেয়াল রাখতে হয় বলে জানালেন লিডো পিস হোমের পরিচালক সোহেল রানা। ‘বৃষ্টি হলে বাঁশ পিচ্ছিল হয়ে যায়। তখন খেলতে গেলে আহত হবার সম্ভাবনা থাকে। তাই সে সময় কাউকে খেলতে দেয়া হয় না।’ এমনটাই জানালেন তিনি।

শিশুদের খেলার জন্য অবশ্য এই জায়গাটি আর মাত্র বছর দুয়েক পাওয়া যাবে। প্রকল্পটির মেয়াদ আড়াই বছর। তবে আয়োজকদের বিশ্বাস এর মধ্যে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে এর মধ্যে

আ/এসআইসু

Facebook Comments Box