বন্দুকযুদ্ধে মাদক কারবারি কমলেও থামেনি মাদক পাচার

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজধানীসহ সারাদেশে মাদক পাচার ও মাদক ব্যবসা চলছেই। আইন-শৃংখলা বাহিনীর সঙ্গে মাদক কারবারিদের বন্দুক যুদ্ধে এত হতাহতের পরও থামছে না মাদক পাচার ও মাদক ব্যবসা। সরকার ঘোষণা দিয়ে সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে হতাহতের পর দেশে মাদকের পাচার ও কেনাবেচা কিছুটা হলেও কমে যাওয়া কথা। কিন্তু তা হয়নি। এক বছর অভিযান চালানোর পর দেখা যাচ্ছে মাদক ব্যবসায়ী কমেছে। কিন্তু মাদকের আমদানি ও কেনাবেচা এবং পাচার কমেনি।

পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাবে, অভিযানের গত এক বছরেরও বেশি সময়ে বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে ৫ কোটি ১৪ লাখ ইয়াবা এবং ১০ মণ হেরোইন উদ্ধার হয়েছে, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এর আগে কোনো বছরেই ৪ কোটির বেশি ইয়াবা উদ্ধার হয়নি। পুলিশ বলছে, স্থলপথ ও জলপথ দুই দিক থেকেই মাদক দেশের ভেতরে আসছে। এক বছরে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার তারই বড় প্রমাণ।

এবিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, এটা অভিযানেরই সুফল। এটিকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ নেই। এখন মানুষ সচেতন হয়েছে, তারা খবর দিচ্ছে। সে কারণে এসব ধরা পড়ছে এবং উদ্ধার সম্ভব হচ্ছে।

জানা গেছে, মাদকে তরুণ সমাজ ধ্বংস হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত বছরের ১৫ মে থেকে দেশব্যাপী মাদক বিরোধী অভিযান শুরু হয়। এই অভিযানে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ৩৭৫ জন মাদক ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১৭৫ জন, র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১১০ এবং বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১৫ জন নিহত হন। বাকি ৭৫ মাদক ব্যবসায়ী নিজেদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন বলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে। এসকল বন্দুকযুদ্ধে শুধু কক্সবাজার জেলাতেই নিহত হয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, মাদক এখন আর সহজলভ্য নয়। তা ছাড়া যারা এই ব্যবসায় যুক্ত তারা আত্মগোপনে চলে গেছে। তারা মৃত্যু ভয়ে প্রকাশ্যে আসছে না। এখন মাদক কেনাবেচা হলেও তা খুব গোপনে ও সীমিত পর্যায়ে হচ্ছে। তিনি বলেন, এটা সম্ভব হয়েছে চলমান অভিযানের সফলতার কারণে।

এবিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক মনে করেন, সরকার যে পন্থায় মাদক নির্মূল করতে চাইছে সেটা কোনো কাজে আসছে না। এক বছরের পরিসংখ্যান তার বড় প্রমাণ। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে মানুষের আস্থা হারিয়ে যাবে, প্রতিষ্ঠানগুলোও ভেঙে পড়বে। আর এতে কোনো সুফলও আসবে না।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, প্রতিবছর মাদক সংক্রান্ত বিষয়গুলোর তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। সে অনুযায়ী দেশব্যাপী এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন তিন হাজারের মতো ব্যবসায়ী, যাদের সাড়ে তিনশ’ গডফাদার রয়েছে। এসব ব্যবসায়ী ও গডফাদার সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর তালিকাভুক্ত রয়েছে।

অপরদিকে মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণের প্রস্তাবে রাজি হয় সরকার। এ বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি ১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী কক্সবাজারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে অস্ত্র ও মাদক জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। তারা এখন কারাগারে। নতুন করে আবারও কিছু ইয়াবা ব্যবসায়ীর আত্মসমর্পণ করানো নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কক্সবাজারের দিকে সবার নজর থাকার কারণে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা রুট ও হাতবদল করছেন। এখন নতুন নতুন বিক্রেতা দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে নতুন চক্রের সক্রিয় হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া মাদকবিরোধী অভিযান চলতে থাকায় ছোট ও মাঝারি মানের মাদক ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ আত্মগোপনে চলে গেছেন।

কক্সবাজারের বাসিন্দারা বলছেন, ইয়াবা ব্যবসায়ীরা কারাগারে থাকলেও ইয়াবা কেনাবেচা ও আমদানি বন্ধ হয়নি। এপ্রিল ও মে মাসে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ২৫ লাখের মতো ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করেছে। এখনও প্রায় প্রতিদিনই ইয়াবা ধরা পড়ছে।

এবিষয়ে বিজিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, ইয়াবা ব্যবসায়ীরা এখন দেশের দক্ষিণের সীমান্ত থেকে সরে গিয়ে পশ্চিম প্রান্তের সীমান্ত দিয়ে ঢুকছেন। কিছুদিন আগে সিলেট সীমান্তে ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। এখন টেকনাফে না গিয়ে উত্তর দিকেও চলে যাচ্ছে। অনেকে ভারতের ভেতরে গিয়ে অন্য সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে শুরু করেছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box