বদলগাছীতে গৃহ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ

বদলগাছী (নওগাঁ)প্রতিনিধি

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় আশ্রয়ন-২ প্রকল্পের অধীনে “যার জমি আছে ঘর নেই তার নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ” কর্মসূচির আওতায় ৪শ ৯০ টি গৃহ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। উক্ত প্রকল্পের অধীন বদলগাছী উপজেলায় ১৮/১২/২০১৭ ইং তারিখে ১টি, ২৭/১২/২০১৭ ইং তারিখে ১শটি, ২২/০২/২০১৮ ইং তারিখে ১শটি, ২২/০৪/২০১৮ ইং তারিখে ২টি, ২৮/০৬/১৮ ইং তারিখে ২৩৭টি এবং ০৩/০৬/২০১৮ ইং তারিখে ৫০টি, সর্বমোট ৪শ ৯০টি গৃহ নির্মানের বিপরীতে ৪শ ৯০ জন উপকারভোগিদের নামে ৪কোটি ৯০লক্ষ টাকা বরাদ্দ আসে।

২৮/০৬/২০১৮ ইং তারিখে ১নং- ২৭০১ তারিখ ১৮/১২/২০১৭ইং ১টি ঘর নির্মানের জন্য ভাউচার বিবরনীতে রড বাবদ ৯হাজার ৮শ ২৫টাকা, পরিবহন ব্যয় ১৫০ টাকা, ইট ক্রয় বাবদ ১৪ হাজার ২শ ৪৫ টাকা, ইট পরিবহন ব্যয় ৭শ ৭৭ টাকা, ইট ভাঙ্গা ব্যয় ৭শ ৭৭ টাকা, বালু ক্রয় বাবদ ৩ হাজার ৯শ টাকা, সিমেন্ট ক্রয় ১০ হাজার ৮০ টাকা, সিমেন্ট পরিবহন ব্যয় ১৮০ টাকা, কাঠ ২২ হাজার ৬শ ৩৮ টাকা, জানালা-দরজা তৈরী ব্যয় ১হাজার ২শ টাকা, খুঁটি তৈরী ব্যয় ৩ হাজার ৯শ ৯০ টাকা, লোহা পেরেক ব্যয় ৩হাজার ১শ ৮৫ টাকা, সিআই সিট(টিন) ব্যয় ৩২ হাজার ৩৩ টাকা, টয়লেট স্লাব ব্যয় ২হাজার ৪শ টাকা, ঘর নির্মান ব্যয় ১৪ হাজার ১শ ২০ টাকা সর্বমোট ঘর প্রতি ১লক্ষ ১৯ হাজার ৫শ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। মূল্য সংযোজন কর ও আয়কর ১৯হাজার ৫শ টাকা বাদ দিয়ে প্রতি ঘর নির্মাণ ব্যয় ১লক্ষ টাকা করে দেখানো হয়। যদিও মূল্য সংযোজন কর ও আয়কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে সরকারিভাবে।

৬টি ভাউচার বিবরনীতে ৪শ ৯০টি গৃহ নির্মানের বিপরীতে ৪ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। সাড়ে ১৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও সাড়ে ১০ ফুট প্রস্থ্য বিশিষ্ট আয়তনের প্রতিটি ঘর। সরেজমিনে তদন্তকালে পাহাড়পুর ইউনিয়নের বিষপাড়া গ্রামের শ্রীমতি মৌসুমী, পন্য মন্ডল, তৃষ্ণা রানী, জহরলালসহ অন্যান্য উপকারভোগি এবং মথুরাপুর ইউপি’র ৭ নং ওয়ার্র্ডের আফজাল, মামুদপুর গ্রামের মালা সহ অন্যান্য ইউনিয়নের উপকারভোগিরা বলেন, ঘর বরাদ্দ পেতে পিআইও’র নিয়োজিত ব্যক্তিদের ৫হাজার টাকা থেকে ১০হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ দিতে হয়েছে। সাড়ে ৪শ ইট ও ১০/১২ বস্তা নিম্নমানের খোয়া, ৯ বস্তা সিমেন্ট, ১ ট্রলি বালু, ৫ইঞ্চি ইটের গাঁথুনী দিয়ে মাটি থেকে ৩/৫টি ইটের ভিত দেয়। শুধু ৩ ইঞ্চির স্থলে ১/২ ইঞ্চি ঢালায় এবং বালুর পরিমাণ বেশী দিয়ে প্লাষ্টার করে ঘর নির্মাণ করেনি ঘর প্রতি অধিকাংশের ২/৩ টি করে টিন ফেরৎ নিয়ে যায়। ঘর নির্মানে অপরিপক্ক ইউকালিপটাস গাছের অফিনিশিং কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে।

টিনের পালকি (ছাচ) কম দেওয়ায় ঘরের মধ্যে পানি ঢোকে। সিমেন্ট কম ও বালু বেশি দিয়ে ১/২ ইঞ্চি করে ঢালায় দেওয়ায় ভাতশাইল গ্রামের মর্জিনা বেগমের সহ অনেক ঘরের মেঝেতে ফাঁটলের সৃষ্টি হয়েছে। দরজা-জানালার মাপও কম করা হয়েছে। অধিকাংশ উপকারভোগিদের ল্যাট্রিন তৈরী করা হয়নি। প্রতিটি ঘর সাড়ে ১৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও সাড়ে ১০ ফুট প্রস্থ্য বিশিষ্ট নির্মান করার কথা থাকলেও অনেকের ঘরের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ্যও কম করা হয়েছে। ৭২/৭৫ জনের নাম বার বার ডবল করা হয়। যা ০৬/০৪/২০১৯ ইং তারিখে সংশোধনের জন্য প্রকল্প পরিচালকের নিকট পাঠানো হয়। পিআইও আব্দুল করিম তার নিজ এলাকা বগুড়া থেকে মিস্ত্রিসহ অন্যান্য লোকজন এনে ঘর নির্মান কাজ করান। এছাড়াও তিনি তার নিজ এলাকা থেকে ভাড়া করা পরিবহনে নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহ করে। তারপরও তার নিয়োজিত ব্যক্তিরা উপকারভোগিদের নিকট থেকে ২/৫শ টাকা পরিবহণ বাবদ ও মিস্ত্রিরা বকশিশ হিসেবে ১/২শ টাকা আদায় করে। এছাড়াও অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপজেলার কোলা ইউনিয়নের চকতাহের গ্রামের মৃত রজিব উদ্দীনের ছেলে মোঃ আনোয়ার হোসেন এবং ঝাড়ঘরিয়া গ্রামের মৃত জয়ধন পাহানের ছেলে যোগেন্দ্র পাহান ও বদলগাছী সদর ইউনিয়নের জিয়ল গ্রামের মোঃ হুমায়ন কবিরের স্ত্রী মোছাঃ রাশেদা বেগমের ঘর নির্মাণ না করে বিল উত্তোলন করা হয়। এই তিনজনের নাম ২৩৭টি ঘরের তালিকায় দুইবার (ডবল) থাকায় তাদের নাম সংশোধনের জন্য ০৪/০৬/২০১৯ ইং তারিখে পিডি’র নিকট পাঠানো হয়। কিন্তু পূর্বের বরাদ্দ ঠিকই থাকে। অপর দিকে অনেকের ইটের ঘর থাকায় তাদেরকে বাদ দেওয়া হলেও ৫নং কোলা ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার কেশাইল গ্রামের (হঠাৎপাড়া) মোঃ সিরাজুল ইসলামের ইটের বাড়ি থাকা সত্ত্বেও তাকে উক্ত প্রকল্পের ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, যাদের নাম দুইবার (ডবল) ছিল তা সংশোধন করে প্রতিস্থাপন করা হয় এবং ঘর বরাদ্দের জন্য কোন টাকা নেওয়া হয়নি এবং ছোট-খাটো ত্রুটি ছাড়া বিধি মোতাবেক ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুম আলী বেগ বলেন, ঘর বরাদ্দের জন্য টাকা নেওয়ার কোনো প্রশ্নই উঠে না। দুইবার (ডবল) নাম থাকা ৭২/৭৭ জনের নাম সংশোধন পূর্বক অন্যদের ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও তিনি বলেন, বিধি মোতাবেক ৪শ ৯০টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। উপরোল্লিখিত ঘটনার আলোকে উপকারভোগিসহ উপজেলার সচেতন মহলের অভিমত ঘর নির্মানে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতি করা হয়েছে। এ জন্য তারা সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box