বছরজুড়ে ধুঁকেছে পাট

আলোকিত সকাল ডেস্ক

আনুপাতিক হারে রপ্তানি আয় বাড়লেও ক্ষেত্রবিশেষে প্রচলিত কয়েকটি খাতে শঙ্কা কাটেনি পুরো বছরেও। বিশেষ করে রপ্তানি আয়ের প্রচলিত খাতগুলোর মধ্যে পাট ও চামড়ায় একসময় নির্ভরশীল ছিল রপ্তানি উন্নয়ন বু্যরো (ইপিবি)। সদ্য শেষ হওয়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বছরের পুরোটা সময়ই ভুগিয়েছে পাট ও চামড়া খাত। দুই খাতের একটিও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি বছরজুড়ে। ইপিবির তথ্য হালনাগাদ করে জানা গেছে এ পরিসংখ্যান।

ইপিবির হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, পাট খাতে গেল বছর রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অথচ জুন মাস শেষে এ খাতের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৮১ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ পিছিয়ে এ খাতের রপ্তানি আয়। আগের অর্থবছরেও যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক আয় ছিল পাটের। সে বছর এ খাতের রপ্তানি আয় ছিল ১০২ কোটি ৫৫ লাখ ৫০ হাজার ডলার। কিন্তু এ বছর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন তো দূরে থাক আগের অর্থবছরের আয়ের সমানও করতে পারেনি। অর্থাৎ সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে পিছিয়ে আছে ২০ দশমিক ৪১ শতাংশ।

অন্যদিকে বছর কয়েক ধরে ধুঁকতে থাকা চামড়া খাতও কোনো আশার বাণী শোনাতে পারেনি। ইপিবির সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য বলছে, সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে চামড়া খাতের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১২ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অথচ বছর শেষে আয় হয়েছে ১০১ কোটি ৯৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ পিছিয়ে চামড়াজাত পণ্য। আগের বছর আয় হয়েছিল ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার ডলার। সদ্য শেষ হওয়া বছরে আগের বছরের চেয়ে রপ্তানি আয়ে পিছিয়ে ৬ শতাংশ।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ জুট গুডস এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেজিইএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. লুৎফুর রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, বাংলাদেশ অনিবাযর্ভাবে পাট রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়ছে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। একটি হলো- পাট পণ্য উৎপাদনে শ্রমিক ও মেধার অদক্ষতা। আরেকটি হলো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি। যেমন- ইরান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজারগুলোর একটি। সে দেশে ট্রাম্পের অবরোধের ঘোষণার পর বাংলাদেশের পাট রপ্তানি অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আফ্রিকার বাজার ভারত ইতোমধ্যে দখল নিয়েছে। বাংলাদেশেও তারা ঢুকে পড়ছে। দেশটি প্রযুক্তিগত দিক থেকে ইতোমধ্যে অনেক এগিয়েছে। বাংলাদেশের দেশের তুলনায় অনেক কমে পণ্য বিক্রির সুযোগ পাচ্ছে। প্রতিযোগিতার বাজারে পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে ভিন্ন বাজার খুঁজছেন।

পণ্য উৎপাদনে নতুন প্রযুক্তি এনে উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতে পারলে এই খাতের পণ্য রপ্তানিতে অনিবার্য পতন থেকে উত্তরণ সম্ভব উলেস্নখ করে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সরকারের উচিত এই খাতে আরও সুযোগ দেয়া, যাতে উদ্যোক্তারা আধুনিক কারখানার মাধ্যমে কম খরচে পণ্য উৎপাদন করে রপ্তানির সুযোগ পায়। দেশের অধিকাংশ মেশিনই সেই ষাটের দশকের। কোনো আধুনিকায়ন নেই। অবশ্য, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কিছু বড় প্রতিষ্ঠান এখন আধুনিক মেশিন এনে উৎপাদনে নেমেছে। মেশিন আমদানির সক্ষমতা ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর একেবারে নেই বললেই চলে।

পাটজাত পণ্য-সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে পাট নিয়ে বিদ্যমান আইনের কোনো ব্যবহারই হয় না। দেশে পাট পণ্য ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে যে আইন হয়েছে, কোনো কোম্পানিই তা মানছে না। প্যাকেটজাত প্রক্রিয়ার জন্য পস্নাস্টিকের ওপরই নিভর্রশীল তারা। পাটজাত পণ্যের ব্যবহার প্রসারে সরকারি কোনো তদারকিও নেই।

সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রপ্তানিকারকরা দাবি করেন, অভ্যন্তরীণ বাজারে ৮০ শতাংশ বিক্রির সুযোগ রেখে ২০ শতাংশ রপ্তানির সুযোগ দেয়া উচিত। দেশের ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে তো উল্টোটা। দেশের বাজারে ৮০ শতাংশ বিক্রির সুযোগ দিলে রপ্তানিকারকরা আর বিদেশি ক্রেতাদের দিকে চেয়ে থাকতে হয় না। বাংলাদেশে এখন পাট চাষে ৪০ লাখ কৃষক সম্পৃক্ত আছেন। আর পাট কারখানায় সম্পৃক্ত আছেন এক লাখ ৫০ হাজার শ্রমিক।

বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) চেয়ারম্যান এসকে সৈয়দ আলী জানান, বাংলাদেশ বিশ্ব বাজারের বড় বড় জায়গাগুলো থেকে ক্রমাগতভাবে বাজার হারাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সংকট ও এই শিল্পের প্রতিযোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব বাজারে টিকে থাকা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও জানান, বতর্মানে পাট পণ্য রপ্তানিতে ক্রমাগত ধসের কারণে চাষি হতে শুরু করে শ্রমিক রপ্তানিকারক সবাই সংকটের মধ্যে পড়ছেন। ফলে বেশিরভাগ পাট কারখানা এখন উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশের কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা এসে দাঁড়িয়েছে ৬৬ শতাংশে। উৎপাদন কম হলে খরচ বাড়বে। ফলে সারা বিশ্বের শিল্পখাতে এই প্রভাব অনিবাযর্ভাবে পড়বে।

সৈয়দ আলী প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘এই শিল্পে উৎপাদনের বৈচিত্র্যতা আনতে হলে নতুন নতুন প্রযুক্তিকে কারখানায় সংযুক্ত করতে হবে। বিশ্বের বাজারে পাটের চাহিদা অনেক। কিন্তু উৎপাদনে পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে পারায় বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে পিছিয়েই যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষতা বাড়িয়ে পাটপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে আরও ভালো অবস্থান তৈরির সুযোগ রয়েছে। রিসার্চ অ্যান্ড মাকের্টসের এক গবেষণায় বলা হয়ছে, ২০২২ সাল নাগাদ শুধু পাটের ব্যাগের বৈশ্বিক বাজার দাঁড়াবে ২৬০ কোটি ডলারের। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) বিভিন্ন দেশে পস্নাস্টিকের ব্যাগ নিষিদ্ধের কারণে এই বাজার তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত, চীনসহ পাটপণ্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর সামনে এই বাজারে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments