ফেসবুক লাইভে ই-কমার্স মার্কেটিং, নারীদের নতুন পেশার হাতছানি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ফেসবুকে একটা বিজ্ঞপ্তি পেলাম। চাকরির বিজ্ঞপ্তি। মেয়েদের জন্য। তারা ঘরে বসেই দিনেরটা দিনে নগদ পারিশ্রমিক হিসেবে আয় করতে পারবেন ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। তবে বিজ্ঞপ্তির মধ্যে মেয়েদের কাজের ধরন সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। কাজের ধরন জানতে আগ্রহী মেয়েদের ইনবক্সে মেসেজ প্রদানের কথাটি উল্লেখ রয়েছে।

অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, মেয়েদের দিয়ে ফেসবুকে লাইভ করিয়ে বিভিন্ন পণ্যের এডভ্যাটাইজমেন্ট করা হয়। সেখান থেকে অর্ডারকৃত পণ্যের নির্দিষ্ট পারসেন্ট পান ফেসবুকের লাইভে আসা মেয়েরা। এসব লাইভে দর্শকপ্রিয়তার পাশাপাশি ক্রেতারাও ভিড়ছে দিন দিন। আসছে ঈদকে সামনে রেখে এসব ফেসবুক লাইভ ঈদশপিংয়ের ধারণাই পাল্টে দিচ্ছে। প্রায় অর্ধশতাধিক ফেসবুক পেইজ ও গ্রুপ ঘুরে দেখা যায়, খুব সহজেই অনলাইনের মাধ্যমে কেনাবেচার হাট বসাতে সক্ষম হচ্ছেন পেজ ও গ্রুপের এডমিনরা।

লাইভ স্ট্রিমিং ভিডিওগুলোতে দেখা যায় তরুণীরা একটি ঘরের ভেতরে থেকে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে একের পর এক পণ্য হাতে নিয়ে দিচ্ছেন পণ্যের গুণাগুণ, পণ্যের রঙ, নকশা, মান ও দামের বর্ণনা। পছন্দ হলে স্ক্রীনশট তুলে ইনবক্সে অর্ডার করার কথাও বলছেন।

এসব লাইভের মাধ্যমে ক্রেতারা যেমন তাদের পছন্দসই পণ্যটি বেছে নিতে পারছেন, তেমনি লাইভে আসা তরুণীরাও পাচ্ছেন বাড়তি আয়ের সুযোগ। এ কারণে বাড়তি আয়ের আশায় ফেসবুক লাইভকে পেশা হিসেবেও বেছে নিয়েছেন অনেক তরুণী। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবী নারীরাও নামছেন এ পেশায়।

ডিজিটাল বাংলাদেশ যে এখন আর স্বপ্ন নয়, নতুন পেশা ‘ফেসবুক লাইভ’ তারই প্রমাণ। বাংলাদেশ ডিজিটাল ই-কমার্স মার্কেটের ধারণাকে আরো পোক্ত করেছে ফেসবুক লাইভের নতুন এ পেশা। সম্প্রতি ই-কমার্সে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে অনলাইন শপিং। কেনাকাটা করতে এখন আর যানজট ঠেলে দোকানে গিয়ে সময় অপচয় করতে হচ্ছে না। চাইলে মানসম্মত পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে দোরগোড়ায়।

এ কারণে অনলাইনে কেনাকাটা এখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। চাল-ডাল থেকে শুরু করে জামা-কাপড়, কসমেটিক্স, ইলেকট্রনিক; সব পণ্যই এখন মিলছে অনলাইনে। অনলাইন শপিংয়ের ওপর নির্ভর করে সৃষ্টি হয়েছে নতুন পেশা ‘ফেসবুক লাইভ’।

ইতোমধ্যেই ফেসবুক লাইভ পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন অনেকে। নতুন এ পেশা সম্পর্কে সবারই প্রায় একই অভিমত। তারা খণ্ডকালীন এ পেশায় বাড়তি আয়ের আশায় কাজ করেন। অনেকে নিজেই অনলাইন ই-কমার্সের উদ্যোক্তা হয়ে লাইভে আসছেন। এমনই একজন উদ্যোক্তার সাথে কথা হলে তিনি জানান, এ পেশার ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল।

এ পেশায় যুক্ত হতে হলে কেমন স্কিল থাকা প্রয়োজন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, যারা ফেসবুক লাইভে আসবেন তাদের ফেসকাটিং ও বাচনভঙ্গি সুন্দর হতে হবে। পাশাপাশি যারা অনলাইনে ব্যবসা করবেন তাদের পণ্যের মান যেমন ভালো হতে হবে, তেমনি ব্যবসায়ীদের সৎ থাকতে হবে। কোনোভাবেই গ্রাহকদের ঠকানো যাবে না।

ফেসবুক লাইভ যেমন ই-কমার্স মার্কেটিংকে সমৃদ্ধ করেছে, বিড়ম্বনায়ও ফেলেছে অনেককে। ফেসবুক লাইভের এ পেশায় অনেকে বিভিন্ন ধরনের কটুমন্তব্য করেন। অনেক সময় পরিচিতমণ্ডলের লোকেদের থেকেও বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় এসব নারীদের। এছাড়া গ্রাহকদের থেকে মাঝেমধ্যে নানা ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে, তারা যেমন চকচকে রঙ দেখে অর্ডার করেছিলেন, হাতে পেয়ে দেখেন ভিন্ন চিত্র।

অর্ডার দিয়েছিলেন ব্লুকালার, হাতে পেয়েছেন বেগুনী বা ফিরোজা কালার। তার উপর বিভিন্ন অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে ফেসবুকের এ পেশাটি শুরু হওয়ার আগেই প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পথে।

দেখাচ্ছে একরকম হাতে পাচ্ছে আরেক রকম। যদিও ক্যাশ অন ডেলিভারিতে পছন্দ না হলে ফেরত প্রদানের রীতি আছে, তাই কিছুটা লাগামের মধ্যে আছে কিছু অসাধু চক্র।

প্রসঙ্গত, ফেসবুক লাইভ বা ভিডিও স্ট্রিমিং ফেসবুকের একটি জনপ্রিয় সংযোজন। এতে মানুষ যেমন নানারকম সুবিধা পাচ্ছে। তেমনি এর অপব্যবহারে বিড়ম্বনায়ও পড়ছে মানুষ। নিতান্তই তুচ্ছ ব্যাপার নিয়েও কিছু মানুষ লাইভে চলে আসছে। রাতারাতি সেলিব্রেটি হওয়ার নেশা কাউকে কাউকে এতটাই পেয়ে বসেছে, অনেকে নিজেকে পর্নোতারকা বলে পরিচয় দিতেও দ্বিধা করে না।

সম্প্রতি বেশ কিছু তরুণীর অশালীন ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে, যারা নানা কথায়, নানা অঙ্গভঙ্গিতে; আবার কেউ কেউ নগ্ন হয়ে যৌন আবেদন সৃষ্টি করে থাকেন। তারা এসব অশ্লীল ভিডিওগুলো ইউটিউবে শেয়ার করে নিচ্ছেন বাণিজ্যিক সুবিধাও। আবার কেউ কেউ এসব লাইভে এসে বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজও করেন। এসব ভিডিও আবার উল্লেখযোগ্য হারে শেয়ারও হচ্ছে।

অনেকে নিজেদের পেজ ও গ্রুপকে চাঙ্গা ও স্ট্রং করে তুলতে এই নেতিবাদি প্রচারে নামছেন, বিভিন্ন অশালীন কন্টেন্ট নিয়ে ভিডিও তৈরি করে বুস্ট করছেন, পরে লাইক-ফলোয়ারের সংখ্যা বেড়ে গেলে তার নাম পরিবর্তন করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক পেজ ও গ্রুপে রূপান্তর করছেন।

অনেকে এগুলোর ঠিকাদারি দিয়ে বিভিন্ন পেজ-গ্রুপকে লাইক-ফলোয়ার বাড়িয়ে দেবার জন্য হাতিয়ে নিচ্ছেন প্রচুর টাকা। আর এই টাকা কামানোর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিচ্ছেন অশ্লীলতাকে। এসব কর্মকাণ্ড যে তরুণ প্রজন্মের ওপর কী রকম নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা বলাই বাহুল্য।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box