ফের সংগঠিত হচ্ছে জঙ্গিরা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

আবারও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে জঙ্গিরা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মধ্যেও থেমে নেই জঙ্গিরা। নানা কৌশলে বিভিন্ন নামে সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে তারা। গত আড়াই মাসে রাজধানীর চারটি স্থানে বোমা ফেলে রাখা বা হামলার ঘটনা ঘটেছে। যেগুলো জঙ্গিদের কাজ বলে জানিয়েছে পুলিশ। এসব কর্মকান্ডের বাইরে কখনও সবজি বিক্রেতা, কখনও রিকশা-অটোরিকশার চালকসহ নানা লোকদেখানো পেশার আড়ালে কৌশলে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে জঙ্গিরা।

একাধিক সংস্থার গোয়েন্দারা বলছেন, এমনকি জঙ্গিদের মধ্যে তৈরি করা হচ্ছে ‘লোনুল’ গ্রৃপ। যারা কোনো টার্গেটে একাকী হামলার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। টার্গেট ব্যক্তি, স্থানে বা জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় লোনুল গ্রুপের দায়িত্বপ্রাপ্ত জঙ্গি সদস্য একাকী অ্যাটাক করার বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছে। এদিকে জঙ্গি সংগঠনের সদস্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে সক্রিয় নারী সদস্যদের নামানো হয়েছে মাঠে। অনেক ক্ষেত্রে তারা বাসা-বাড়িতে ‘তালিম’ দেওয়ার নামে একশ্রেণির মহিলার মধ্যে নানা বয়ান দিয়ে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছে। কেউ কেউ প্রেম বা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে উঠতি তরুণ-তরণীদের দলে যুক্ত করছে।

যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, জঙ্গিদের সবকিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জঙ্গিদের একেবারে মূলোৎপাটন বা নির্মূল করা যায়নি। তবে আমরা তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছি। তিনি জানান, এখানে বিদেশের কোনো জঙ্গি নেই। এরা সবাই ‘হোমগ্রাউন্ড’ জঙ্গি। কখনও জেএমবি, কখনও নিউ জেএমবি, কখনও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি), কখনও আনসার আল ইসলামসহ নানা নামে এরা কার্যক্রম চালাচ্ছে। এদের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা। বিভিন্ন স্থানে তারা বোমা রেখে চলে যাচ্ছে। তবে খুব শিগগিরই তাদের ধরে ফেলা হবে।

জঙ্গি দমনে বিশেষ ভূমিকা পালনকারী এলিট ফোর্স র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুবুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, জঙ্গিরা সংঘবদ্ধ হয়ে বড় কোনো কিছু ঘটানোর অবস্থায় নেই। বর্তমানে কোনো হুমকিও নেই। তাদের হামলার সক্ষমতাও নেই। জঙ্গিদের নেটওয়ার্কও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তবে তারা বসেও নেই, নানা কৌশলে জঙ্গিরা তৎপর রয়েছে। এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক র‌্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। জঙ্গিরা কোনো কিছু ঘটানোর চেষ্টা করলেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৭ আগস্ট ভারতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক। এই বৈঠকে সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জঙ্গিবাদ দমনে দু’দেশের আন্তঃসহযোগিতামূলক বিষয়েও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হবে। এর আগেও বিভিন্ন জঙ্গি হামলা বা তৎপরতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করেছে।

জানা গেছে, গত ২৬ জুলাই রাত দেড়টার দিকে রাজধানীর রূপনগরের ২৮ নম্বর রোডের ২৩ নম্বর বাসায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট। এ সময় সেখানে বিস্ফোরণ ও গুলির ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে সেখান থেকে আনসার আল ইসলাম নামে জঙ্গি সংগঠনের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলো আহাম্মদ আলী (৫৭), তার স্ত্রী সালমা আহাম্মদ (৫০), ছেলে আবু সালেহ মোহাম্মদ জাকারিয়া (২৪) ও আবু সালেহ মোহাম্মদ কিবরিয়া (২২) এবং মেয়ে আসমা ফেরদৌসী রিফা (২৬)। তারা বর্তমানে রিমান্ডে আছে। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতরা একই পরিবারের এবং সবাই আনসার আল ইসলামের সক্রিয় সদস্য। এর আগে গত ২৩ জুলাই রাতে রাজধানীর পল্টন ও খামারবাড়ি এলাকায় দুটি পুলিশ বক্সের পাশে একই ধরনের দুটি শক্তিশালী বোমা পাওয়ার পর সেগুলোতে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এ ঘটনার পর দিন সাইট ইন্টেলিজেন্স নামে একটি ওয়েবপোর্টালে বোমা রাখার দায় স্বীকার করে কথিত আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ‘ইসলামিক স্টেট (আইএস)। এর আগে ২৬ মে রাতে মালিবাগে পুলিশের এসবি অফিসের সামনে এসবির একটি পিকআপে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ট্রাফিক পুলিশের এএসআই রাশেদা আক্তার ও রিকশাচালক লাল মিয়া আহত হন। তার আগে ৩০ এপ্রিল গুলিস্তানে ট্রাফিক পুলিশকে লক্ষ করে বোমা হামলা হয়। দুই ট্রাফিক পুলিশ এবং কমিউনিটি পুলিশের এক সদস্যসহ এ ঘটনায় তিনজন আহত হয়। এ দুটি ঘটনায়ও জঙ্গি গোষ্ঠী কথিত আইএসের নামে দায় স্বীকারের বার্তা দেয়।

র‌্যাব সদর দফতরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার তথ্যমতে, গত ২৬ জুলাই ঢাকার মিরপুর ও দোহার থেকে জেএমবির দুজন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৮ ব্যাটালিয়ন। ২৪ জুলাই যশোরের মনিরামপুর থেকে আনসার আল ইসলামে এক সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৬। এর তিনদিন আগে এই মনিরামপুর থেকেই আনসার আল ইসলামের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব-৬। গত ১২ জুলাই র‌্যাব-১১ ব্যাটালিয়নের অভিযানে চট্টগ্রাম থেকে জেএমবির তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। গত ৯ জুলাই ঢাকা ও বরিশাল থেকে এক নারী জঙ্গিসহ আনসার আল ইসলামের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। যারা কিনা প্রেম ও বিয়ের প্রলোভন দিয়ে টার্গেটকৃত তরুণ-তরুণীদের জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত করার কাজ করছিল বলে র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান।

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর নির্জন কিছু এলাকায় বাসাভাড়া নিয়ে আস্তানা গাড়ছে জঙ্গিরা। বাসাভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের কঠোর নির্দেশনা থাকলেও বাড়িমালিকরা অনেক সময় তা মানছে না। জঙ্গিরা স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া ও অনেক অগ্রিম টাকা দিয়ে প্রলোভন সৃষ্টি করে বাসাভাড়া নিচ্ছে। ওইসব ভাড়া বাসায় সাধারণত কোনো আসবাব, টেলিভিশন রাখে না জঙ্গিরা। সব জানালা-দরজা প্রায় সময় বন্ধ থাকে। এমনকি জানালায় পর্দা নিশ্চিত করে থাকে। বাড়ির অন্য ভাড়াটিয়া বা আশপাশের কারও সঙ্গে তারা সেভাবে কথাও বলে না।

আস/এসআইসু

Facebook Comments